ভবেশবাবু মৃদুস্বরে একবার ডাকেন, অতীন। অতীন সাড়া দেয় না। এবার এগিয়ে এসে অতীনের কাঁধে হাত রাখেন ভবেশবাবু। অতীন ঘুরে দাঁড়ায়, গাঢ় লাল চোখ। আর অদ্ভুত উজ্জ্বল দৃষ্টি, ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় অতীন বলে, কাকু, এসেছেন? দেখুন, মা আমার দেওয়া ভোগ নিয়েছেন, দেখেছেন? মা শুনেছেন আমার ডাক! কই আপনার সেই পুরুতঠাকুরকে ডাকুন, এসে দেখে যাক, ছেলের ডাকে মা সাড়া দেন কি না।
ঘরের ভিতরের দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তের মধ্যে গা গুলিয়ে উঠল ভবেশবাবুর। প্রায়ান্ধকার বন্ধ ঘরে ভ্যাপসা হাওয়ার সঙ্গে মিশেছে বাসি এঁটোকাঁটার পচা দুর্গন্ধ। এই সকালেও একটা লাল নাইট ল্যাম্প জ্বলছে, তাতে আরও ভয়াবহ দেখাচ্ছে সেই তিব্বতীয় দেবীমূর্তি। কী ভয়ানক, কী নোংরা, কী বমনোদ্রেককারী সেই দৃশ্য! ফের গ৷
গুলিয়ে ওঠে ভবেশবাবুর। অমঙ্গলের আশঙ্কায় শিউরে ওঠেন তিনি। ( দৃঢ় হাতে অতীনের কাধ ধরে বাইরে নিয়ে এসে বসান ভবেশবাবু। লক্ষ্য করেন যে অতীন এর মধ্যেই রোগা হয়ে গেছে অনেক। গাল আরও বসে গেছে, কণ্ঠার হাড় উঁচু হয়ে আছে, চোখের নীচে গাঢ় হয়ে আছে কালি, হাতের শিরা উপশিরা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।
শুধু চোখ, চোখ দুটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে আছে। এখন গাঢ় লাল থেকে আস্তে
স্থে স্বাভাবিক হচ্ছে ক্রমশ। সেই দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে রেখে জিজ্ঞেস করেন ভবেশবাবু, এসব কবে থেকে হচ্ছে অতীন?
উৎসাহ আর ঘোরের মধ্যে পুরো ঘটনা বলে যায় অতীন। কিচ্ছু বাদ দেয় না।
অনেকক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকেন ভবেশবাবু, তারপর মাথা তুলে জিজ্ঞেস করেন সবেশের দোকানটা পার্ক স্ট্রিটের ঠিক কোথায় বলতে পারবে?
*********
আজকাল মাঝেমধ্যেই বিকেলের দিকে নিমতলা শ্মশানে গিয়ে বসে থাকে অতীন। যদিও নিমতলাঘাট তার দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি থেকে অনেকদূর। কিন্তু দক্ষিণের গড়িয়া মহাশ্মশান, সিরিটি বা ক্যাওড়াতলা কোনোটাতেই এই নিমতলা বা কাশী মিত্তিরের ঘাটের মতন গঙ্গার মিঠে হাওয়াটা পাওয়া যায় না।
আজকাল শ্মশান বড় ভালো লাগে তার। শান্ত ঠান্ডা জায়গা, কেউ তাকে তার এই গত মাসদুয়েকের পরিবর্তন নিয়ে জিজ্ঞাসা করে না।একটা কোণ ধরে চুপচাপ বসে থাকে সে। কয়েকটা নেড়ি, মাতাল, পাগল আর গেজেল নেশাড়ু ছাড়া আর কেউ থাকে না। তবে থেকে থেকেই মৃদুবলহরি হরিবোল ধ্বনি ভেসে আসে।মৃতদেহের সঙ্গে দুএকজন শোকার্ত মানুষ, এবং বাকি বেশ কিছু উল্লসিত লোকজন লরি বা শববাহী গাড়ি থেকে নামে। অন্যান্য প্রথাগত কাজ চলার মধ্যে শ্মশানের একটা কোণ দেখে কিছু ছেলেপিলে রামের বোতল আর কল্কে নিয়ে বসে পড়ে। শ্মশানের গা ঘেঁষে চা, লাড়ু, সিগারেট আর লুচি তরকারি বিক্রির দোকানঘরগুলোতে বেড়ে ওঠে ব্যস্ততা।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, পরের দিন অমাবস্যা। প্রায় একমাস হয়ে গেছে পুস্পদি নেই। ভবেশকাকুও শেষ এসেছিলেন দিন পনেরো আগে। তারপর তারও আর পাত্তা নেই। গত পনেরো দিনে শরীর আরও খারাপ হয়েছে অতীনের। অফিসের লোকজন অবধি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে শরীরের এই অবস্থা দেখে। দিন পাঁচেক আগে রিজিওনাল ম্যানেজার সাহেব তো প্রায় জোর করেই বেলভিউতে পাঠাচ্ছিলেন। এইসব নামজাদা। হাসপাতালের সঙ্গে কোম্পানির বোঝাঁপড়া আছে, পয়সা লাগবে না, কোম্পানির আই কার্ড নিয়ে ভর্তি হলেই হল। বিল মেডিক্লেইম কোম্পানি মেটাবে।
কিন্তু না। অতীন জানে যে সে সুস্থ। কোনোগতিকে সেদিন পালিয়ে এসেছে সে, তারপর থেকে টানা পাঁচদিনের ছুটিতে। সবই ঠিক আছে। রোজ রোজ মা ভোগ খেয়ে যাচ্ছেন, অধভুক্ত খাবার সারা স্টাডিরুম জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু একটা জিনিস অতীনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দঁড়াচ্ছে পুস্পদির যাওয়ার পর থেকেই।
খাবার।
ডামরিই রান্না করে। নিশ্চয়ই সে রান্না খুব ভালো, নইলে মা সেই ভোগ স্বীকার করলেন কেন? কই, পুষ্পদির রান্না তো মা কোনোদিনই ভোগ হিসেবে নেননি?।
কিন্তু রান্নাটা কোনও এক অদ্ভুত কারণে অতীনের পোষাচ্ছে না। খাবারে সবসময় সে একটা কটু গন্ধ পায়। হয়তো কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই, সবই ঠিক আছে, কিন্তু খাবার মুখে দিলেই অজ্ঞাত কারণে গা গুলিয়ে ওঠে তার। মনে হয় জন্মজন্মান্তরের ভাত নাড়িভুড়ি ছিঁড়ে উঠে আসবে।
আজকাল তাই খাওয়াদাওয়া খুব কমে গেছে তার।যেটুকু পারে, ওই একটু অমলেট আর সিদ্ধ ভাত খেয়ে বেরিয়ে আসে সে। ডামরি গজগজ করে খুব। এখন এত সব। রান্না নিয়ে কী করবে সে?
আজকাল তো অতীনের বাড়ির আশেপাশে কুকুর বিড়ালও আসে না। এমন কি বাড়ির ওপর দিয়ে কাক অবধি ওড়ে না, এটাও লক্ষ করেছে সে।
আজও উদাসী মুখে একটা সিমেন্টের বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে বসে ছিল অতীন। খুব খিদে পেয়েছে তার। উঠে গিয়ে কাছের দোকানে গেছিল কিছু পাওয়া যায় কি না। দেখতে। দোকানদার খুব কাচুমাচু মুখে জানিয়েছে আজ কাস্টমার বহোত জ্যাদা হ্যায়। একটা রুটি আপাতত আছে আর দুটো জিলাবি। বাবু আপাতত এই দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করুন। আধা ঘণ্টা বাদে সে দুটো গরমাগরম রুটি দিয়ে শাম কা নাস্তার ব্যবস্থা করে দেবে।
রুটিটা তুলে হাতে নিয়েছে সবে, পাশ থেকে একটা আওয়াজ পেয়ে থমকে যায়। সে, ইয়ে, একা খাবেন নাকি? হাফ হাফ করে খেলে হত না? আমাকেও নগিন্দর। অবিশ্যি বলেছে যে আধ ঘণ্টা বাদে রোটি পাক্কা মিলেগা… হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ… তখনই না। হয় শোধ দিয়ে দেব, অ্যাঁ? এমনি অবশ্য বলি না কাউকে তেমন। কিন্তু আজ মশাই খিদেটা মোটে সহ্য হচ্ছে না।
