পুলিশ এসে পাড়াপড়শিদের দুদিন জিজ্ঞাসাবাদ করল। অতীন আর ভবেশবাবুর কাছ থেকে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করল, কিন্তু দুজনের যথাসাধ্য চেষ্টা সত্ত্বেও কোনও সূত্রই উদ্ধার করা গেল না। ডামরিকে অবশ্য পুলিশ প্রথম দিনই ক্লিনচিট দিয়ে দেয়। কেউ কাউকে চেনে না, কয়েক ঘণ্টার আলাপ। আর ক্রমাগত হাপুস নয়নে ক্রন্দনরত গ্রাম্য মহিলাকে কতক্ষণই বা জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়?
ভদ্রমহিলা যেন জাস্ট ভ্যানিশ করে গেলেন!
ভবেশবাবু ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিলেন। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে কিছু একটা অলৌকিক অশনিসংকেত আছে বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু সে কথা পুলিশকে বলা চলে না, ওরা হেসেই উড়িয়ে দেবে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, প্রথমদিককার ধাক্কা সামলে, অতীন কিন্তু খুব শান্ত ভাবেই ব্যাপারটা দেখছে। ঠান্ডা মাথায় পুলিশকে সাহায্য করা থেকে খবরের কাগজের অফিসে দৌড়াদৌড়ি করা সবই সে করছে নিরাসক্ত দক্ষতার সঙ্গে।
তার কোনও বিকার নেই, যেন খুবই সহজচিত্তে মেনে নিয়েছে যে পুষ্পদি আর আসবে না, আর ফিরবে না, আর খেতে ডাকবে না, আর জামাকাপড় গুছিয়ে রাখবে। না, আর অতীনের শরীর খারাপহলে পাগলের মত করবেনা।নিঃসহায় বিধবা মাতৃসমা। প্রৌঢ়াটির প্রতি সমস্ত দায়িত্ব যেন অতীন তার উদাসীন কর্তব্যকর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। তার মন যেন অন্য এক প্রাপ্তির পূর্ণতায় মশগুল, সেখানে পুষ্পদির অস্তিত্বটাই অপ্রয়োজনীয়।
হায়, ভবেশবাবু যদি জানতেন, এর পেছনের কারণ! পুষ্প হারিয়ে যাবার পরাদন থেকেই এ বাড়িতে প্রাত্যহিক চা-পানের আসরটি ত্যাগ করেছেন তিনি। ফলে এই শোকহীনতার কারণ জানে শুধু দুজন। অতীন আর ডামরি।
* ** ** ** * *
মা ভোগ স্বীকার করেছেন!
অতীন স্বীকার করতে বাধ্য, ডামরি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মহিলা। এই চূড়ান্ত ডামাডোলের মধ্যেও সে বাড়ির সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে, তাকে রান্নাঘরের বা বাড়ির কোনও কাজই দেখিয়ে দিতে হয়নি। সে যেন সবই জানত, যেন এ বাড়িতে সে বহুকাল ধরেই আছে। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে কাজ করতে পারে সে। অতীনকে মুখ ফুটে কিছু চাইতেই হয় না, সবই যেন তার নখদর্পণে।
পুষ্পদি যেদিন হারিয়ে যান, সেদিন রান্না করেছিল ডামরি। অতীন স্নান করে পূজায় বসে, তারপর ভোগ উৎসর্গ করে মাকে। তারপর অভ্যেসমতন বাইরে বেরিয়ে এসে স্টাডিরুমের দরজায় তালা দিয়ে দেয়।
রাতে খেতে বসে রান্নার স্বাদ একটু অন্যরকম লাগে অতীনের, কী ধরনের অন্যরকম সেটা যদিও বলা মুশকিল। অবশ্য হতেই পারে, পুষ্পদির হাতের রান্না খেয়ে অভ্যস্ত অতীন। একে নতুন হাতের রান্না, তার ওপর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার রান্নার স্টাইলটাই হয়তো অন্যরকম। তা ছাড়া সেইদিন রান্নার স্বাদ নিয়ে মাথা ঘামানোর অবস্থাতেই ছিল অতীন। দ্রুত খাবার খেয়ে শুতে চলে যায়।
রাতে চুড়ির কিছু হালকা রিনিরিনি আওয়াজ এসেছিল কি অতীনের কানে? তারপর ছমছম করে নুপূরের শব্দ, কে যেন ছাদ থেকে নীচে নেমে আসছে আর উঠে যাচ্ছে… সেটাও কি ভুলই শুনল নাকি অতীন? খিলখিল হাসির শব্দও শুনতে পেল কি একটা? কিন্তু সারাদিনের ঝোড়ো ক্লান্তির পর অতীনের দুচোখে ঘুম নেমে আসতে দেরি হয়নি বিশেষ।
পরের দিন সকালে স্টাডি রুমের দরজা খোলে অতীন, আর তীব্র বিস্ময়, আনন্দে ছিটকে যায়। বুকের মধ্যে আছড়ে পড়ে একসমুদ্র আবেগ, মা শুনেছেন! মা শুনেছেন! শেষ পর্যন্ত, শেষ পর্যন্ত ছেলের ভালোবাসার কাছে মা ধরা দিয়েছেন! অস্ফুটে মা মা গো বলে দরজা ধরে থরোথরো কাঁপতে থাকে অতীন।
সেই দেবীমূর্তির সামনে সমস্ত খাবার ছড়ানো ছিটানো। কে যে দুহাতে খাবারগুলোর খানিকটা খেয়েছে, বাকিটা স্টাডিরুমের মেঝে জুড়ে ছড়িয়েছে। দুয়েকটা দানা মূর্তির মুখেও লেগে। সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করে অতীন। ডামরিও দৌড়ে এসেছিল, সেও গলবস্ত্র হয়ে নমস্কার করতে থাকে।
সেই থেকে একই জিনিস রোজ ঘটে যাচ্ছে। রোজ রাতে পূজা করে, ডামরির। রান্না ভোগ হিসেবে সেই দেবীমূর্তির সামনে সাজিয়ে, নিজে খেয়ে ঘুমোতে যায় অতীন। আজকাল বড় গাঢ় ঘুম হয় তার।নিঃসীম চেতনাহীন গাঢ় ঘুম। কখনো কখনো মগ্নচৈতন্য ঘা দিয়ে যায় কিছু খলখল হাসির শব্দ, বা কাঁচের চুড়ির শব্দ। সেই ঘুম। ভাঙলে সকালে উঠে নিজের হাতে স্টাডি রুমের দরজা খোলে সে, সেই একই দৃশ্য। সমস্ত অর্ধভুক্ত, বাকিটা ঘরের মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো। মূর্তির মুখে দুএকটা দানা লেগে থাকে। অতীনের চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসে, তার প্রতি মায়ের এই নিঃসীম করুণার কথা ভেবে।
মাসখানেক বাদে একদিন সকালের দিকে অতীনের বাড়ি আসেন ভবেশবাবু। আগের দিন সন্ধেবেলা থানায় গেছিলেন তিনি। পুলিশ পুষ্পর কোন খোঁজ বা সূত্র না পেয়ে কেস ক্লোজ করে দিচ্ছে। সেটাই জানাতে মধ্য ডিসেম্বরের সেই সকালে অতীনের বাড়ি আসছিলেন উনি। পুষ্প চলে যাবার পর রোজকার আসাটা বন্ধ করে দিয়েছেন ভবেশবাবু। কিন্তু এই খবরটা না দিলেই নয়।
সদর দরজা খোলাই ছিল, বোধহয় দুধ বা খবরের কাগজ নেওয়ার জন্যে। ঢুকেই থমকে গেলেন ভবেশবাবু।
স্টাডি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে অতীন, কোমরে প্রায় খসে পরোপরো ছোট গামছা একটা, প্রায় উলঙ্গ অতীনের দু হাত প্রণামের ভঙ্গিতে বুকের কাছে জড়ো করা, অস্ফুট মা মা ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পেছনে ডামরি দাঁড়িয়ে। সে কিন্তু ঠিক তার ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝেছে কেউ এসেছে ঘরে। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে শ্বাপদের ক্ষিপ্রতায় রান্নাঘরে ঢুকে যায় সে।
