খাওয়া শেষ হলে জলের বোতল এগিয়ে দেয় অতীন। ভদ্রমহিলা হাত ধুয়ে ঢকঢক। করে অনেকটা জল খান। তারপর হঠাৎ করে রাস্তায় শুয়ে অতীনের পা জড়িয়ে ধরেন। আমাকে বাঁচান বাবু, আমার তিনকুলে কেউ নেই, আমার কোথাও যাওয়ার নেই। শেয়াল কুকুরে আমাকে ছিঁড়ে খাবে বাবু। ও বাবু, আমাকে ফেলবেন না বাব। আমি সব কাজ পারি, ঘর মোছা, বাসন মাজা, জল তোলা, সব পারি বাবু। বামনের মেয়ে বটে আমি, রান্নার কাজও পারি। আমাকে ফেলে যাবেন না বাবু, ধর্মসাক্ষী বাব, দমঠে খেতে দেবেন বাবু, পরনের কাপড় একটা… বাবু, ও বাবু…
অবিবেচক বা হঠকারী বলে অতীনের কোনোদিন কোনও দুর্নাম ছিল না। কিন্তু এই অপার্থিব শীতের রাতে অতীনের চিন্তাভাবনা কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেল। পায়ের নীচে মৃত অজগরের মতন শুয়ে আছে শীতল ডায়মন্ড হারবার রোড, দুধারের খালি মাঠ থেকে ঘন ধোঁয়ার মতো উঠে আসছে শীতের অশরীরী কুয়াশা, দুরে নির্বাক হাতির পালের মতন দাঁড়িয়ে গাছপালার জঙ্গল। মাথার ওপর দিগন্ত থেকে দিগন্তে অপার হয়ে শুয়ে আছে কালচে নীল নভেম্বরের আকাশ, ওটা কি ক্যাসিওপিয়া? নিজেই ভাবে অতীন। নিচ্ছিদ্র, নিঃসীম এই পুঞ্জীভূত অন্ধকারের মধ্যে কোনও শব্দ নেই, কোনও প্রাণের সাড়া নেই, কোনও দিশা নেই, মুক্তি নেই, পাপ নেই, পুণ্য নেই, শুধু পায়ের কাছে এই রমণীর ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।
অতীনের সমগ্র চৈতন্য যেন ক্রমশ গলে যেতে থাকে। কালো লোমশ এক ছায়া যেন তার সমস্ত চিন্তা আবৃত করতে থাকে, অতীনের সব বোধ বুদ্ধি যেন নিমেষে মাথায় শিকড় পড়া সাপের মতন নুইয়ে আসতে থাকে…
এ যদি মায়ের আদেশ হয়? মা যদি এইভাবেই তার সন্তানের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন? কী করবে অতীন? নারী মাত্রেই মায়ের অংশ না? একে উপেক্ষা করে চলে যাবে? নাকি নিয়েই যাবে? কী দরকার… কোথাকার কে না কে, খায়নি অনেকক্ষণ, খাইয়ে দিয়েছে। অতীন, গাড়ি করে বেরিয়ে গেলেই হল… না কি… না থাক… রান্নার কাজে অন্তত… পুষ্পদির একজন হেল্পিং হ্যান্ড…
মহিলাটিকে উঠিয়ে দাঁড় করায় অতীন, রান্নার কাজ পার?
হ্যাঁ বাবু সংক্ষিপ্ত উত্তর।
চলো তা হলে, সঙ্গে কিছ নেবার আছে?
না বাবু।
একটা খটকা যেন অতীনের মানের দরজায় ঘা মেরেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে উড়ে যায়, কিছুই নেই নেওয়ার মতন? কিছু না? নিদেনপক্ষে একটা পুঁটুলি? লোকে এমন নিঃস্ব হয়ে ঘর ছাড়ে নাকি?
কী নাম তোমার?
সেই নিঃসীম শূন্য কালোর মধ্যে, দিগন্তবৃত্তের নীলচে আভার প্রেক্ষাপটে, উড়তে থাকা শুকনো চুলের মধ্যে ঝিকিয়ে ওঠে মহিলার শ্বদন্তদুটি, ডামরি, আমার নাম ডামরি বাবু।
*********
ডামরিকে নিয়ে রাতে ঘরে ঢুকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলেছিলেন পুষ্পদি, এ কাকে নিয়ে এলি অতু?
ডামরি জড়োসড়ো হয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়েছিল। জুতো খুলতে খুলতে পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে জানায় অতীন। তারপর পুষ্পদিকে বলে, চিলেকোঠার ঘরটা খুলে দিও পুষ্পদি। ডামরি ওখানেই থাকবে। আর হ্যাঁ, এবার থেকে রান্নাবান্নার কাজটা ওইই করবে, ওকে সব দেখিয়ে-টেখিয়ে দিও। তারপর ডামরির দিকে ঘুরে বলে, আজকের দিনটা কোনওমতে চালিয়ে নাও, কাল পুষ্পদি লোক ডেকে পরিষ্কার করে দেবে ঘরটা। যা যা লাগবে পুষ্পদিকে বলবে আর পুষ্পদির কথা মত চলবে। পুষ্পদির কথা মতোই সব কাজ হয় এ বাড়িতে।
অত্যন্ত অপ্রসন্ন মুখে ডামরিকে নিয়ে ওপরে উঠে যান পুষ্পদি। খানিকক্ষণ বাদে নেমে এসে ফেটে পড়েন অতীনের ওপর, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে অতীন? কোথাকার কে জানাশোনা নেই, কোন অজাত বেজাতের মেয়ে, পাগল না কি কিছু জানিস তুই? বলি চোর বা গুন্ডাদেরও লোক তো হতে পারে। রাস্তায় ধরল বলে নিয়ে চলে এলি? বুদ্ধি বিবেচনা সবই কি ওই মূর্তি খেয়ে নিয়েছে?
দ্রুত চোখ তুলে তাকায় অতীন, আর সেই মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে যাওয়া চোখ দেখে বুকটা ধক করে ওঠে পুষ্পদির, ভয়ে সিঁটিয়ে যান উনি, মা-ই ওকে জুটিয়ে দিয়েছেন পুষ্পদি। মায়ের আদেশ অমান্য করা যায় না, সে তো তুমি জানোই। দেখো, ওর যেন কোনও অসুবিধা না হয়। আমাকে গামছাটা দিয়ে যাও, স্নান করতে যাব। আমার খাবার আর মায়ের ভোগ রেডি করে রেখেছ তো?
এই বলে সামান্য স্থলিত পায়ে বাথরুমের দিকে চলে যায় অতীন। পুষ্পদির সঙ্গে এই বোধহয় শেষ সামনাসামনি কথা হয় অতীনের।
কারণ সকালে উঠে দেখা যায় পুষ্পদির বিছানা খালি।
পুষ্পদি নেই।
*********
পরের দিন সারা পাড়া ভেঙে পড়ল অতীনের বাড়িতে।এলাকায় তীব্র উত্তেজনা।মুখার্জি পরিবার এলাকার যথেষ্ট সম্মানীয় পরিবার। অতীনকেও লোকজন খুবই ভালোবাসে। আর পুস্পদিকেও এলাকায় সবাই চেনে মুখার্জি বাড়িরই একজন বলতে। অতীন পুরো ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেছিলো, কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না। শেষে ভবেশবাবুই এসে পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
পুলিশ তোলপাড় করে ফেলল বটে, কিন্তু পুষ্পদির কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। কোথায় গেছেন, কী হয়েছে- কেউই বলতে পারল না। পুষ্পদির গ্রামের বাড়ি হাওড়ার ডোমজুড়ের কোথায় যেন, সেখান অবধি পুলিশ খোঁজ নিয়ে এল, কিন্তু না। কোনও খবর নেই।
ভদ্রমহিলা একবস্ত্রে ঘর ছেড়ে চলে গেছেন, চপ্পল অবধি নিয়ে যাননি। একটিও। নিজের জিনিস নিয়ে যাননি, একটা টাকা অবধি না। কলকাতা শহরের সমস্ত হাসপাতাল। নার্সিং হোম, মেন্টাল অ্যাসাইলাম, থানা সব খোঁজ নেওয়া হয়ে গেল। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল, উঁহু, কোনও পাত্তাই নেই।
