সুবেশ এসেছিল এ বাড়িতে, অনেকদিন অতীন ওর দোকানে যায়নি বলে খবর নিতে এসেছিল। কথা বলাবার অনেক চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে উঠে গেছে। যাওয়ার সময় পুষ্পদিকে আলাদা করে ডেকে নিজের নাম্বার দিয়ে গেছে, বলে গেছে দরকার হলে ফোন করতে।
অফিসেও এই নিয়ে কথা চলছে কলিগদের মধ্যে, বোঝে অতীন। হাসিখ ছেলেটার এই আকস্মিক পরিবর্তন কারোরই নজর এড়ায়নি। রিজিওনাল ম্যানেজার সাহেব বাঙালি, খুবই মাই ডিয়ার মানুষ। তিনিও কেবিনে ডেকে জানার চেষ্টা করেছে। হঠাৎ এই হাল কেন। অতীন জবাব দিয়ে দিয়েক্লান্ত, রিক্ত, বিরক্ত।এই অকারণ জগতে অহৈতুকী কর্মব্যস্ততা, কৌতূহল, এসব নিয়ে সে সম্পূর্ণ উদাসীন।
তার চালচলন বদলে যায় শুধু রাত্রিবেলায়। চোখে আসে উজ্জ্বল দীপ্তি। তখন সে স্নান করে একাগ্রচিত্তে পূজায় বসে। অনেক রাত অবধি পূজাপাঠ করে সে নিজে খেতে যায়, তার আগে সেই দেবীমূর্তির সামনে সযত্নে সাজিয়ে দিয়ে যায় ভোগ।
বিশেষ কিছুই না, যা যা তার বাড়িতে রান্না হয়, ঠিক তাই তাই সে সাজিয়ে দিয়ে যায় থালায়। তার বিশ্বাস ছেলে যা খায়, মাও তাই-ই খাবেন নিশ্চয়ই।
পরের দিন সকালে উঠে দেখে ভোগ যেমনকার তেমনই, দেখে সে মুষড়ে পড়ে। আজও মা তার ভোগ গ্রহণ করলেন না? আর কতদিন মা তার সন্তানের পরীক্ষা। নেবেন?
তারপর সেই মহাপ্রসাদ খেয়ে সে অফিসে যায়।
.
ভবেশবাবু পাড়ার মোড়ের পুরোহিত মশাইকে ডেকে এনেছিলেন একদিন, তিনি তো মূর্তি চিনতে পারলেনই না, উলটে অতীনের কার্যকলাপ দেখে স্তম্ভিত। প্রবীণ পুরোহিত, বহুদিন এ পাড়াতে পুজো করেন, অতীনকে চোখের সামনে বড়ো হতে দেখেছেন। তিনি ব্যাকুল হয়ে অতীনের হাত চেপে ধরলেন, বাবা, একাজ কোরো, নিষেধ করছি। ইনি কে চিনতে পারছি না, এঁর বীজমন্ত্র জানা নেই। এভাবে দেবীর পূজা করতে নেই বাবা, ওঁরা কুপিত হন। ইনি দশমহাবিদ্যার কেউ, নাকি অষ্টদেবীর, নাকি চৌষট্টি যোগিনীদের মধ্যে একজন, তার কিছুই জানা নেই। তার ওপর তিব্বতীয় মূর্তি, ওদের তান্ত্রিকপন্থা বড় সাংঘাতিক বাবা। অনেক অপদেবী, ডাকিনীবিদ্যার উল্লেখ আছে, আলাদা পুজোপকরণ লাগে, বিভিন্ন মুদ্রা আছে, যৌগিক মণ্ডল আছে। লক্ষ্মী বাবা, তুমি এঁকে সসম্মানে ফিরিয়ে দিয়ে এসো। কোথা থেকে কী অনর্থ হয়ে যাবে…
.
খিলখিল করে হেসে উঠেছিল অতীন, সেই অপার্থিব হাসি শুনে থমকে গেছিলেন প্রবীণ পুরোহিত।হাসতে হাসতে অতীন বলেছিল, মায়েপোয়ের ব্যাপার কাকু, টেনশন নেবেন না। মা আমার সঙ্গে কথা বলেন, হাসেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, ভালোবাসেন। খাবেন, মা একদিন নিশ্চয়ই খাবেন আমার বেড়ে দেওয়া ভোগ, আমি আপনাকে দেখাবো কাকু। আপনি শুনতে পাচ্ছেন মায়ের ডাক? শুনতে পাচ্ছেন?
বৃদ্ধ পুরোহিত প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন, তুমি শান্ত হও বাবা। এভাবে হয় না। ওভাবে খাবার বেড়ে দিলে দেবী তা গ্রহণ করেন না। ভোগ নিবেদনের পদ্ধতি আছে, মন্ত্র আছে, নিয়ম আছে…
পুরোহিতকে টেনে বাইরে এনেছিলেন ভবেশবাবু। কিছু কথা হয়, কেউ জানে না তার ব্যাপারে বিশেষ।
তা অনেক জোরাজুরি সত্ত্বেও মিটিং শেষ হতেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল অতীন। রাতে মাকে ভোগ না দিলে তার খাওয়া, ঘুম এসব হয় না। ফলে বেশ দ্রুতই গাড়ি চালিয়ে আসছিল সে।মধ্য নভেম্বরের সন্ধ্যা, গ্রামগঞ্জ এলাকা; ঘন কুয়াশা ছেয়ে। আছে রাস্তায়, তার ওপর অমাবস্যার অন্ধকার। দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে বেশ ঠান্ডা পড়েছে। রাস্তাঘাট জনশূন্য, কুকুর অব্দি দেখা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে রাস্তার পাশের বন্ধ দোকানঘরের শাটারের নিচ থেকে আলোর আর মৃদু গুঞ্জনের আভাস পাওয়া যায়, বোঝা যায় দেশি মৌতাতের আসর বসেছে।
সরিষা পেরিয়ে শিরাকোল-শেরপুর রোডের মোড় থেকে বাঁদিক বেঁকে খানিকটা এসেই গাড়ি স্লো করতে বাধ্য হল অতীন। রাস্তার মাঝখানে এক মহিলা অসহায়ের মতন হাত তুলে গাড়িটাকে থামতে বলছেন।
অন্য সময় হলে অতীন স্রেফ গাড়ি না থামিয়ে বেরিয়ে যেত, হাইওয়ে ডাকাতির জন্যে খুবই কুখ্যাত এই অঞ্চল। অনেক তরিকা আছে এইসব গ্যাঙেদের লুটতরাজ চালাবার জন্যে।
কিন্তু কিছু একটা ভেবে মহিলার কাছে এসে গাড়ি থামায় অতীন, কী হয়েছে? গাড়ি থামালেন কেন?
মহিলা ড্রাইভারের দিকে উইন্ডোর পাশে আসেন। কাঁচ নামায় অতীন। কাঁদতে কাঁদতে মহিলাটি বলেন, আমার খুব বিপদ বাবু, আমাকে বাঁচান। আমার কেউ নেই, কোথাও যাওয়ার নেই, দেওররা এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সারাদিন কিছু খাইনি বাবু। আমাকে বাঁচান বাবু।
গাড়ি লক করে নেমে আসে অতীন, কোম্পানি থেকে রাতের খাবার প্যাক করে দিয়েছিল, সেটা তুলে দেয় মহিলাটির হাতে। মহিলা গোগ্রাসে বুভুক্ষুর মতন গিলতে থাকেন খাবার, বোঝাই যায় যে অনেকক্ষণ বা সারাদিনই হয়তো কিছু খাননি। বেশসায় দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। চাপা গায়ের রঙ, উসকোখুসকো চুল, ম্লান বৈধব্যবেশ সত্ত্বেও মধ্যবয়স্কা মহিলাটির আঁটোসাঁটো গড়নটির দিকে অতীনের চোখ চলেই যায়। যৌবনকালে বেশ সুশ্রী ছিলেন মনে হয়। এখন বোধহয় সহায়হীনা মহিলাটির দেখভাল করার কেউ নেই। দুমুঠো ভাতের দায় ঝেড়ে ফেলেছে পরিবার পরিজন।
