খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে থেকে চোখ তোলে অতীন।ভবেশবাবুর বুকটা ধক করে ওঠে, মিনিটের মধ্যে ওর চোখ দুটো অত লাল হয়ে গেল কী করে? চোখের মণি দুটো অত ওপরের দিকে ওঠা কেন?
অপরিচিত একটা ঘষা গলায় অতীন বলে, মায়ের পুজোয় বাধা দেবেন না কাকু, প্লিজ! মা আমাকে ডাকেন, ভালোবাসেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, মা আমার ভালো চান, আমাকে দেখেন, আমার সেবাযত্ন নেন, মা আমাকে চান, মা আমার সব বোঝেন, মা আমাকে ভালোবাসেন, মা আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন, আপনি বুঝবেন না কাকু…
সেই স্বগত প্রলাপোক্তির মধ্যে ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়ান ভবেশ ভট্টাচার্য। নিজে অকৃতদার হলে কী হবে, অতীন ওঁর নিজের সন্তানতুল্য। আসন্ন অমঙ্গলের একটা আবছায়া আভাস পেলেন ভবেশবাবু, তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন।
ভালো না! ভয়ংকর একটা কালো ঝড় ধেয়ে আসছে, স্পষ্ট বুঝতে পারলেন সেই বৃদ্ধ প্রফেসর। তারপর চোয়ালটা শক্ত করলেন। ঠিকহ্যায়, দেখা যাক কে জেতে, উদ্ভট এই মূর্তির উৎকট মাতৃস্নেহ না উদ্বাস্তু বাঙালের জেদ।
বেরিয়ে আসার সময় ভবেশবাবু দেখলেন যে পুষ্পদি উদ্বিগ্নমুখে তার জনেই অপেক্ষা করছেন দরজার কাছে, ফিসফিস করে বলেন, ও দাদা, অতুকে একটা ভালো দেখে ডাক্তার দেখাও না গো। ছেলেটা কেমন করছে কদিন থেকে। ভালো করে খায় না, ঘুমায় না। রাতদিন বিড়বিড় করে। আমি তো বাইরের ঘরে শুই, মাঝেমাঝে ঘুম থেকে উঠে শুনি কেমন অদ্ভুত গলায় মা মা বলে কাঁদছে। আমার বুকটা ধড়ফড করে গো, ভয় লাগে। তখন না, ডাকলে সাড়া অবধি দেয় না। ছেলেটা কি পাগল হয়ে গেল দাদা, হ্যাঁ? ওর মা যে মরে যাবার সময় আমার হাত ধরে বলে গেল, ছেলেটাকে। দেখো পুষ্প। অতুর যদি কিছু হয়ে যায়? মরে গিয়ে দিদিকে কী জবাব দেব দাদা? ও দাদা, আমার বলার মতন আর কেউ নেই গো, তুমিই কিছু করো না গো। বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন সেই প্রৌঢ়া।
সন্তানহীনা, রক্তের সম্পর্কে অনাত্মীয়া সেই স্নেহশীলা মহিলাটির মাথায় একবার হাত রাখলেন ভবেশবাবু, তারপর বেরিয়ে গেলেন।
সেই রাতেই ফের স্বপ্নদেশ পেল অতীন। সেই অপরূপ নারীমূর্তি অতীনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, বড় খিদে পেয়েছে অতীন, কিছু খেতে দাও, আমাকে কিছু খেতে দাও।
সাপের শিসের মত সেই আর্তকামনার মধ্যে মিশে ছিল কিছু কি বিপজ্জনক বিষশিখা? অতীন দেখল যে, সে নিজে মূর্তির পায়ের কাছে সাপের মতন আকৃতি নিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে মাটিতে শুয়ে, ফণার মতন নিজের মাথার ওপরে দুহাত জড়ো করে বলছে, কী খাবেন মা? যা চাইবেন, আমি তাই এনে দেব, একবার শুধু বলুন, কী। খাবেন মা?
সেই অপরূপা নারীমূর্তি অদ্ভুত হেসে বললেন, খাবার খাব অতীন। যে সে খাবার নয়, মহাক্ষুধা আমার। আমাকে জাগিয়েছ অনেক কাল পরে, তবুও জিজ্ঞেস করছ অতীন? আমার শরীর দেখোনি অতীন?
কী চাই মা আপনার?
ভোগ, মহাভোগ!
*********
এর কয়েকদিন বাদে যেদিন ডামরিকে ঘরে নিয়ে এল অতীন, সেদিনটা ছিল মঙ্গলবার, তার ওপর অমাবস্যা। ভোরের দিকে আংশিক সূর্যগ্রহণও ছিল।
নাহ, অতীনের চরিত্র যথেষ্ট পরিষ্কার। তা সত্ত্বেও এই ঘটনাটা কী করে ঘটে গেল। সেটা পুষ্পদি বা ভবেশবাবু কেউই বুঝে উঠতে পারলেন না।
রায়চকর্যাডিসন ফোর্টে অতীনের কোম্পানির একটা কনফারেন্স চলছিল। দুদিনের প্রোগ্রাম, দ্বিতীয় দিনের শেষে গালা ককটেল ডিনার। সেলসের ছেলেগুলো এমনিতেই মালখোর পাবলিক, তার ওপর কোম্পানির পয়সায় দামি স্কচ ফ্রিতে পেয়ে কপাল। অবধি মদ খায়। তারপর মাঝরাত্তির অবধি হুল্লোড় করে পরের দিন সকালে ফেরা। প্রতি বছরেই এই হয়, গত বছর অবধি অতীন এদের সঙ্গে সারা রাত হুল্লোড় করেছে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ রিজিওনাল ম্যানেজার সাহেব নিজের হাতে সবাইকে স্কচের পেগ বানিয়ে দিয়েছেন, তারপর ডিজে চালিয়ে সমবেত উল্লাসনৃত্য।
কিন্তু কয়েকমাস ধরে অতীনের এসব ভালো লাগে না। কিছুই ভালো লাগে না। ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে না, কথা বলতে ভালো লাগে না, রেসের মাঠে যেতে ইচ্ছে করে না, সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করে না, আড্ডা দিতে ভালো লাগে না, সুবেশের দোকানে যেতে ভালো লাগে না, মানুষের সঙ্গে মিশতে ইচ্ছে করে না, হাসতে ইচ্ছে করে না, আনন্দ করতে ইচ্ছে করে না, এমন কী দুঃখ পেতেও ইচ্ছে করে না!
তার সমগ্র চৈতন্য, সত্তা জুড়ে সেই মূর্তি। মা খেয়েছেন? মা কি খুশি? মা তৃপ্ত হয়েছেন? আজ মা কখন ঘুমাতে যাবেন? মায়ের কি আজকের ভোগ পছন্দ হয়নি? মা কেন আজও গ্রহণ করলেন না?
তার কাজে মন নেই। তার পারিপার্শ্বিক কিছুতে কোনও উৎসাহ নেই। সদাসর্বদা সেই দেবীমূর্তি তার সমস্ত অস্তিত্ব অধিকার করে নিয়েছে, এই একমাসের মধ্যেই। তার বেশভূষা বেশ শৌখিন ছিল এককালে। একই শার্ট সে পরপর দুদিন পরেনি কখনো, কাঁচা ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট ছাড়া তার চলত না।এখন তাকে চেনাপরিচিত কেউ দেখলে চমকে ওঠে। অনেকদিনের না কামানো দাড়ি, গাল গেছে ভেঙে। উলোঝুলো চুলগুলোকে কোনোমতে শান্ত করে রাখার চেষ্টা। জামাকাপড় কাঁচাকুচি বা ইস্ত্রির বালাই বিশেষ নেই, গা থেকে পুরোনো ঘামের টকপচা গন্ধ ছাড়ে। অফিস না যেতে হলে জুতোর বদলে হাওয়াই চপ্পলই চলে। কোনও দিকে কোনও হুঁশ নেই, কোনও খেয়াল নেই, কোনও বন্ধন বা আসক্তি নেই, ভালোবাসা নেই, ঘৃণা নেই, জীবনের স্বাদ নেই, মৃত্যুর ভয়ও নেই!
