খেয়াল করলে দেখা যায় হিন্দু তন্ত্রের সঙ্গে এই সব দেবদেবীদের কোথাও একটা যোগসূত্র আছেই। অনেক তন্ত্রের নামও একই, যেমন ধরো ভূতডামর। অনেক দেবদেবীদের নামও সেম, যেমন মহামায়া। কোনও কোনও জায়গায় নাম এক না হলেও মূর্তি এক, যেমন দেবী বজ্রযোগিনীর বর্ণনা একেবারে দেবী ছিন্নমস্তার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
এতটা বলে থেমে যান ভবেশ বাবু, তারপর উঠে দাঁড়ান, কিন্তু এই মূর্তিটা স্পেশাল হে। কোন ক্যাটেগরিতে ফেলব বুঝতে পারছি না। দাঁড়াও বাপু, একটু পড়াশোনা করে নিই। কোথায় যে এর রেফারেন্স পাব… বলতে বলতে দরজার দিকে এগিয়ে যান বৃদ্ধ প্রফেসর, তদ্দিন আর বিশেষ নাড়াঘাটা করো না বাপু, কোথাও একটা ক্যাচ আছে, বুঝলে। অদ্ভুত দেবীমূর্তি, দোকানদার তোমাকে এমনিই দিয়ে দিল, তাকে আবার পুরোনো জমিদারবাড়ির তান্ত্রিক পুরোহিত এমনিতেই দিয়েছে, না হে, কিছু তো একটা…
সেদিন রাতেই অতীন স্বপ্নে দেখল এক দেবীমূর্তি। অসাধারণ অপরূপা এক দেবী অতীনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন, আমাকে এভাবে রেখো না অতীন। যখন ঘরে এনেছ, আমার পূজা করো। তোমার কল্যাণ হবে।
পরপর তিনরাত ঠিক একই স্বপ্ন দেখল অতীন।
*********
কয়েকদিন বাইরে গেছিলেন ভবেশবাবু, একটা সেমিনারে যোগ দিতে।যেদিন ফিরলেন, সেইদিন সন্ধে নাগাদ অতীনের বাড়িতে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন ভবেশবাবু।
বাইরের বসার ঘর থেকেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে অতীনের স্টাডি রুমের একটা দিক সাফসুতরো করে সেখানে একটা কাঠের জলচৌকি রাখা, তার ওপর লাল চেলি বিছিয়ে সেই দেবীমূর্তি, গলায় রক্তজবার মালা। ধূপ আর গুগগুলের গন্ধ এতদর। থেকেও পাওয়া যাচ্ছে।
অতীন অফিস থেকে ফিরে স্নান করে এদিকেই আসছিল, ভবেশবাবুকে দেখে একটু সঙ্কুচিতই হয়ে পড়ে, চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে, আসুন কাকু, বসুন। বলেই পুষ্পদির উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়ে চা দিয়ে যাবার জন্যে।
ভবেশবাবু তার জন্যে নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বসেন, অতীনের পরনের লাল লুঙ্গিটি লক্ষ্য করেন, তারপর তীক্ষ্ণ চোখে অতীনকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি চা খাবে না?
অতীন একটু বিব্রত হাসি হেসে বলে, না কাকু, আমি একেবারে পুজো দিয়ে খাবো।
ভবেশবাবু অত্যন্ত বিস্মিত হন, সে কী হে? পুজো দিয়ে খাবে মানে? তোমার আবার ধম্মেকম্মে মতি হল কবে থেকে, অ্যাঁ? তুমি কলেজে এস এফ আই করতে না? তুমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় পৈতে দিয়ে জুতোর ফিতে বানিয়েছিলে না? তা হঠাৎ এখন আবার এদিকে?
অতীন খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে, তারপর স্বপ্নদেশের পুরো কথাটা খুলে বলে ভবেশবাবুকে।
ভবেশবাবু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকেন অতীনের দিকে, তারপর বলেন, দেখো অতীন, আমি একটু প্রাচীনপন্থী লোক, জানোই তো। এই নিয়ে তোমার বাবার সঙ্গে আমার কম ঝামেলা লাগত না। আমি স্বপ্নদেশ মানি বলব না, তবে এখনো যে অনেক কিছুই যুক্তি দিয়ে এক্সপ্লেইন করা যায় না সেটা মানি। বামুনের ছেলে, পুজোআচ্চায় মতি হয়েছে সে ভালোই, আমি তোমাকে আটকাবো না। তবে…।
তবে কী কাকাবাবু?
তোমার মতন বামপন্থী রাজনীতি করা ছেলে তিনদিনের স্বপ্নদেশেই একেবারে মাথা মুড়িয়ে বামাক্ষ্যাপা হয়ে গেলে, জানি না কেন বাপু, আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছে হে। এসব বুড়ো বয়সে হয় বাবা, তখন মনের জোর কমে যায়, মৃত্যুভয় আসে। তখন মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করা শুরু করে। তোমার তো সে বয়েস হয় নি বাপু। কেসটা কী খুলে বলো। দেখি– হ্যাঁ! এই বলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অতীনের দিকে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধ ভূয়োদশী। অধ্যাপকটি। অতীনের চোখদুটো একটু লাল আর অস্থির অস্থির মনে হয় ওঁর। গালে। দাড়ি, একটু অবিন্যস্ত ভাব, ডাক্তার দেখাবেন নাকি? না থাক, আজকালকার ছেলে, কী মনে করে বসবে। উনি পরের প্রসঙ্গে যান, আরো একটা কথা, বলি এই মূর্তিটাই পেলে পুজো করার জন্যে? এখনো তো জানাই গেল না ইনি কে, কার মূর্তি। প্রত্যেক দেবদেবীদের পূজাপদ্ধতি আলাদা হয় অতীন। বীজমন্ত্র আলাদা হয়, প্রাণপ্রতিষ্ঠার মন্ত্র আলাদা হয়। একের মন্ত্রে অন্যের পুজো করলে এঁরা কুপিত হন। তুমি অন্তত মোড়ের কালীমন্দিরের ঠাকুরমশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলে এই পুজো করা নিয়ে? কীভাবে কী করতে হয় জানো কিছু?
অতীন আরো বিব্রত হয়ে পড়ে, না কাকু, কারো সঙ্গেই কথা হয়নি। আমার মনে হল সব দেবীই তো শক্তির অংশ, মাতৃমূর্তি, তাহলে আর অত ইয়েমেনে চলে কী হবে? আমি নিজের মতন করে একটু পুজোটুজো করে নিই।ওই আর কী, ধূপধুনো ফুল মালা আর কিছু ফলপ্রসাদ।
ভবেশবাবু উত্তেজিত হয়ে পড়েন, ওহে তুমি কি সাধক রামপ্রসাদ না স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ, যে মা মা বলে কাদলেই মহামায়া নিজে এসে বেড়া বেঁধে দেবেন? স্পষ্ট বলছি যে এটা তান্ত্রিক মূর্তি, বৌদ্ধতন্ত্র নিয়ে সামান্যতম আইডিয়া আছে তোমার? কোথা থেকে কী হয়ে যাবে কোনও ধারণা আছে? এ কি ছেলেখেলা নাকি, অ্যাঁ? আরে আমি খোঁজ লাগাচ্ছি বাপু, বিদেশের বেশ কিছু ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের সঙ্গেও কথা চলছে এই মূর্তিটা নিয়ে। এ অত্যন্ত ইউনিক মূর্তি বাপু, এর আলাদা হিস্ট্রি আছে। সে সব না জেনেবুঝে এমন সময়ে হুটপাট করে কিছু একটা করে বসার কোনও দরকার আছে কিছু, অ্যাঁ?
