ভবেশবাবু যখন প্রশ্নটা করেন, তখন অতীন স্নান করে এসে তোয়ালে দিয়ে মাথা ঘষছিল। হাসিমুখে বলে, মূর্তিটা ভালো না কাকু? সুবেশের দোকান থেকে কাল নিয়ে এলাম। আরে আমার ওই বন্ধু যার কিউরিওর দোকান আছে। আপনি দেখেছেন ওকে বেশ কয়েকবার।
ভবেশবাবু মূর্তিটাকে দেখছিলেন, চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞাসা করলেন, কত পড়ল?
অতীন হেসে ফেলে, এখন অবশ্য এমনিতেই দিয়েছে, পরে পয়সা নেবে যদিও। কী করে ও মূর্তিটা পেল সেটা কিন্তু একটা বেশ ইন্টারেস্টিং কিস্যা, শুনবেন নাকি? জবাবে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়েন ভবেশবাবু। অতীনও বেশ গুছিয়ে পুরো ঘটনাটি বিবৃত করে।
ততক্ষণে চায়ের তলানিটুকু অবধি খেয়ে মূর্তির কাছে গিয়ে অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে হাঁটু গেড়ে বসেছেন ভবেশবাবু। খানিকক্ষণ বাদে উঠে এসে নিজের চেয়ারে গম্ভীর মুখে বসে তারপর বলেন, দেখো অতীন, যতটুকু বুঝলাম, এই মূর্তি কোনো সাধারণ দেবীমূর্তি নয়। সম্ভবত ইনি কোনো তান্ত্রিকমতের দেবী। স্যার, মানে তোমার দাদু তন্ত্রমন্ত্র নিয়েও যথেষ্ট উৎসাহী ছিলেন, জানো নিশ্চয়ই। তোমার বাবা অবশ্য কমিউনিস্ট হয়ে গিয়ে এসব আর বিশ্বাস করত না। স্যার আমাকেও কিছু কিছু শিখিয়েছেন, যদি সেসব আমার বিশেষ মনে নেই, তবে…বলে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে এক অন্যমনস্কই হয়ে গেলেন ভবেশবাবু। তারপর খেই ফিরে পেয়ে বললেন, যদ্দর মনে হচ্ছে, বুঝলে, এটা তিব্বতের জিনিস, থারটিন্থ সেঞ্চুরির বা আশেপাশের। তখন ভারতে ইসলামিক আক্রমণ শুরু হয়েছে, তার চাপে বৌদ্ধরা বেশ কোণঠাসা। বৌদ্ধ গুরুত্ব যাবতীয় পুথিপত্র নিয়ে পালালেন তিব্বতে। তিব্বতি বুদ্ধধর্ম, বা বজ্রযান শাখা নত ইন্ধন পেয়ে আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠল। এটা ওই সময়েরই, কারণ এর মধ্যে কিচ হিন্দু ইনফ্লুয়েন্স দেখতে পাচ্ছি। তার আগেকার বজ্রযান মূর্তিতে এত হিন্দু ইনফ্লুয়েন্স। উঁহু, এটা ওই থার্টিন্থ বা ফোর্টিন্থ সেঞ্চুরিরই জিনিস হে। কিন্তু ইনফ্লুয়েন্সটা কী, সেটাই ধরতে পারছি না! বেশ চিন্তিত দেখায় ভবেশ বাবুকে।
একটা টিশার্ট গলাতে গলাতে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করে অতীন, বজয়ান বলতে?
ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক দৃশ্যতই ভারী খুশি হয়ে ওঠেন, বলি বুদ্ধধর্মের ইতিহাসটা মনে আছে তো? ফোর্থ সেঞ্চুরি বিসিতেই বৌদ্ধধর্ম দুটো ভাগ হয়ে গেল, হীনযান অ্যান্ড মহাযান। অনেকে আবার এই হীনযান না বলে থেরবাদী বুদ্ধিজম বলেন, যদিও দুটো আলাদা, বুঝলে? তা বৌদ্ধধর্ম তো তারপর এশিয়াতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। যখন, ধরো থার্ড বা ফোর্থ সেঞ্চুরিতে বৌদ্ধধর্ম তিব্বতে প্রবেশ করল, তখন তার সঙ্গে স্থানীয় বঁ বা বন উপজাতির শামানিস্ট ধর্মগুরুদের সঙ্গে লাগল লড়াই। এরপর নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, তরাই, উত্তর বিহার অ্যান্ড উত্তর বেঙ্গল, সিকিম ইত্যাদি জায়গায় প্রচলিত বিভিন্ন তান্ত্রিকরিচুয়ালস আত্মীকরণ করে তিব্বতে মহাযানের নতুন রূপ হয়, নাম হয় বজ্রযান। এই বুদ্ধমত কিন্তু সম্পূর্ণভাবে তান্ত্রিক বৌদ্ধমত। বিচিত্র সব দেবদেবীর পূজা, মুদ্রা, মন্ত্র ও মণ্ডল নিয়ে নানা গোপন রিচুয়ালস, এই হল এদের মুখ্য ধর্মাচরণ। বজ অর্থে কিন্তু এখানে ডায়মন্ড বা হীরে, ভাবার্থে ঈশ্বরপ্রাপ্তির পক্ষে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং শক্তপোক্ত যান বা বাহন। ওদের ভাষায় বলে দোরজে।
বজ্রযান যাকে বলে সত্যিকারের স্টেট রিলিজিয়ন হয়ে ওঠে সিক্স ফিফটি নাগাদ, তিব্বতের তেত্রিশতম রাজা সং-শেন-গাম্পোর সময়ে, যিনি দুইজন বৌদ্ধ প্রিন্সেসকে বিয়ে করেন, একজন চায়নার, একজন নেপালের। এরপর আটশো সতেরো নাগাদ তিব্বতে আসেন তিব্বতীয় বুদ্ধিজমের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র গুরু পদ্মসম্ভব। ওরা বলে গুরু রিনপেপাচে। তান্ত্রিক বুদ্ধিজম নেভার হ্যাড টু লুক ব্যাকফ্রম দেন। বাংলা আর। বিহারে তখন পালরাজাদের আমল।
মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছিল অতীন। ভবেশবাবু থামলে বলে উঠল, আরে ইয়ে, অতীশ দীপঙ্কর বলে আরো কে একজনও যেন গেছিলেন না?
মোটা চশমার ওপর দিয়ে ভবেশবাবু খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে অতীনকে নিরীক্ষণ করেন, তারপর রুমাল বের করে কপালের ঘাম মোছেন, অতীশ দীপঙ্কর কে একজন। বলছ অতীন? আমাদের বাঙালিদের দুর্ভাগ্য, আমরা পৃথিবীর খবর রেখে বিশ্বনাগরিক সাজতে ভালোবাসি, কিন্তু নিজেদের ইতিহাস জানি না। বা জানলেও বলতে লজ্জা পাই। বলি বাঙালিদের মধ্যে অমন মেধাসম্পন্ন, ধীশক্তির লোক খুব কমই জন্মেছেন, সেটা জানো কি? হ্যাঁ, উনিও তিব্বতে যান ধর্মপ্রচার করতে, খুব সম্ভবত হাজার বেয়াল্লিশ সাল নাগাদ।
অতীন একটু মিইয়ে গেছিল। ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বলে, তা এর সঙ্গে এই মূর্তির সম্পর্ক?
ভবেশবাবু একটু গম্ভীর হয়ে যান। তান্ত্রিক বুদ্ধিজম বিশাল শাস্ত্র হে। উড্ডীয়ান, কামাখ্যা, শ্রীহট্ট অর্থাৎ সিলেট ও পূর্ণগিরি, এই চারটি হচ্ছে তান্ত্রিক বুদ্ধিজমের সবচেয়ে রেসপেকটেড প্লেস। এইমতে তথাগত বুদ্ধের অবদান যতটা, ততটাই অবদান বাংলার তন্ত্রসাধনার ঐতিহ্যের। বাংলার মাতৃসাধনাকেন্দ্রিক তন্ত্রাচারে যেমন অনেক ভয়ানক ও শক্তিশালী দেবদেবীদের নাম শুনেছ, এখানেও একই কেস। এই মতে আদিবুদ্ধের পাঁচটি ধ্যানমূর্তি আছে, বৈরোচন, রত্নসম্ভব, অমিতাভ, অমোঘসিদ্ধি ও অক্ষোভ্য। এঁদের প্রত্যেকের আবার বিভিন্ন মন্ত্রপদ, মুদ্রা, বাহন ও প্রতীকচিহ্ন আছে। আর বিভিন্ন মূর্তির জন্য আছেন বিভিন্ন শক্তি, মানে দেবীরা। এঁদের অনেকেই খুব রাগী ও ভয়ংকর। যেমন বজ্রবারাহী, হেরুক বা তার বিভিন্ন রূপ যেমন বুদ্ধকপাল সম্বর, এছাড়া যমারি, বজ্ৰচর্চিকা ইত্যাদি।
