তা প্রেজেন্ট জেনারেশনের যিনি মালিক, নারায়ণ চক্রবর্তী, তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে থাকে ইউ এস এ তে । ছেলে সফটওয়্যারে আছে, হেবি উঁচু পোস্ট আর সেইরকম মাইনে। সাউথ সিটিতে পনেরোশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, বুঝলি? দুই ভাই বোনে হেব্বি ভাব মাইরি, না দেখলে বিশ্বাস হয় না শালা, আমাদের ফ্যামিলিতে তো ভাবাই যায় না।
সে যাক গে। তা এই চক্কোত্তি মশাই তো গত মাসে পটোল তুলেছেন। ইউ এস থেকে মেয়ে জামাই, কলকাতা থেকে ছেলে বউ, দুই পক্ষের একগাদা বাচ্চাকাচ্চা মিলে এসে হাজির। প্রচুর খরচাপাতি করে, আশেপাশের দশগ্রামের লোক খাইয়ে তারা চক্কোত্তি ফ্যামিলির নাম রাখল। তারপরেই তো চিত্তির। অত বড় প্রপার্টি দেখবে কে? দুদিনে পার্টির পেটে যাওয়া তো নিশ্চিত। তা ছেলে আর জামাই বুদ্ধি করে বামনগাছি আসার আগেই দালাল লাগিয়ে এসেছিল। খাঁটি ঘি দুধ খাওয়া ব্রেন ভাই, তোর আমার মতন নাকি?
তা শ্রাদ্ধশান্তি শেষ, দালাল তো খুবই চটপটে লোক, কেনার লোক এনে হাজির। দুদিনের মধ্যে সইসাবুদও শেষ। শোনা যায় কোটি টাকার কাছাকাছি ডিল, গ্রামের হাওয়া তাই নিয়ে দেখলাম খুব গরম।
তা এই যে দালাল, বুঝলি, আমারই জাতভাই, নাম রাজকমল গিলরা, সেই আমাকে নিয়ে যায় জমিদারবাড়িতে। তোকে তো আর বলতে হবে না, বেঙ্গলের এইসব পুরোনো জমিদারবাড়ি এক একটা অ্যান্টিক আর কিউরিওর ডিপো। পুরোনো বই থেকে শুরু করে ঝাড়লণ্ঠন, ওয়াল ক্লক, পেন্টিং, সেজবাতি, এমনকি রাইটিং ডেক্স আর থালাবাসন অবধি!
তা আমিও দালালের দেশওয়ালি ভাই হবার সুবাদে বেশ কিছু জিনিস ভালো। জিনিস বেশ সস্তা দরেই পেয়ে গেলাম, বুঝলি? তারপর টাকা পয়সা মিটিয়ে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় ওদের যে পুজো করার ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক, তিনি এসে এইটে রাখলেন আমার সামনে, বললেন, এইটে নিয়ে যান, পয়সা দিতে হবে না।
এতটা বলে একটু থামল সুবেশ। অতীন বলে উঠল, সে কি রে, ওদের জিনিস, পুরুত মশাই এসে বিলিয়ে দিলেন? ওরা কিছু বলল না?
ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবল সুবেশ, তারপর বলল, যেটা বুঝলাম, এই পূজারি ব্রাহ্মণটি অনেক দিন ধরে এই জমিদারবাড়ির সঙ্গে যুক্ত। খুব সম্ভবত জেনারেশন ধরে এরা পুজো করে এসেছে। বুঝিসই তো, এইসব জায়গায় একটা জোর এসেই যায়। জামাই বোধহয় একবার বলতে গেছিল যে অমন অ্যান্টিক মূর্তি ফ্রিতে দিয়ে দেওয়াটা ঠিক কি না। মেয়ে তো দাবড়েই থামিয়ে দিল, বলে জেঠু যা করছে নিশ্চয়ই ভালোর জন্যেই করছেন। বুঝলাম, এই ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকটিকে ওরা খুব রেসপেক্ট দেয়।
আবার থামলো সুবেশ। সেই সুযোগে সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে। অতীন বলল, তা ফোকটে পেয়েছিস ভালো কথা। এখন কথা হচ্ছে নিশ্চয়ই এটা পুজো। করা হত না, কারণ পুজো করা মূর্তি কেউ বিক্রিও করে না, কাউকে এই ভাবে দেয়ও না । দিলে মন্দিরে দেয় বা কারো বাড়িতে দেয়, যাতে পুজোটা চালু থাকে, তাই না? তা এই অ্যান্টিক জিনিসটা তোকে এমন ফ্রিতে বিলিয়ে দেওয়ার কারণটা জিজ্ঞেস করিসনি?
বেশ খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবল সুবেশ, একটা কথা কী মনে হল। জানিস? হয়তো বা মনের ভুলই হবে, বাকি কাজের লোকজনকে দেখলাম মূর্তিটাকে এড়িয়ে চলতে। ইন ফ্যাক্ট বাড়ির লোকজনেরও দেখলাম, মূর্তিটার প্রতি একটা ভয় বা দূরে রাখার প্রবণতা আছে। পুরুতমশাই ছাড়া কেউ ছোঁয়নি ওটা। উনি এসে রাখলেন, আমিও তুলে নিয়ে এলাম। যখন নিয়ে আসছি, ঠাকুরমশাইকে দেখলাম। বিড়বিড় করে কী একটা মন্ত্র পড়তে। কী জানি, নিয়ে আসার সময় একটু অস্বস্তিই হচ্ছিল আমার জানিস?
দু মিনিট কী একটা ভাবল অতীন, তারপর বলল, আসলে একটু বিটকেল দেখতে। তো, তাই বোধহয়… গ্রামের দিকের লোকজন সব, এমনিতেই সুপারস্টিশনের ডিপো। তুই আমাকে দে তো। আমি নিয়েই যাই। পয়সাকড়ি না হয় তুই যা বলবি সেরকম দিয়ে দেবখন পরে, কেমন?
হেসে ফেললাম সুবেশ, আরে তুই নিয়ে যা তো। তোর সঙ্গে কি টাকার সম্পর্ক নাকি রে আমার? যখন যা মনে হয় দিস। তবে সাবধানে রাখিস ভাই। আমারই একটু কেমন কেমন লাগে মূর্তিটার দিকে তাকালে।
এবার অতীনও হেসে ফেলল, এই বয়সে কি তোর ভীমরতি ধরল সুবেশ, দিস ইজ জাস্ট আ স্ট্যাচু ইয়ার।
সুবেশ একটু সিরিয়াস হয়ে যায়, তবুও, তুই একটু নিজের পুরুতঠাকুরকে দিয়ে দেখিয়ে নিস, বুঝলি? এই, জাস্ট মনে পড়ে গেল একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা। ওদের ওই পূজারি ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক কিন্তু সাধারণ অং বং চং আওড়ানো পুরুত নয়। এটা আসার সময় আমার কাজিন রাজকমল বলেছিল, উনি কিন্তু ওদিককার একজন বিশিষ্ট ইয়ে, বুঝলি? শুধু উনি কেন, ওঁর বাপ, দাদা, মানে ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন অনুযায়ী ওঁরা খুব বিখ্যাত ইয়ে।
আহ, ইয়েটা আবার কী? অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে অতীন।
কাছে এসে, কাউন্টারের ওপর মুখ নামিয়ে খুব গোপন খবর দেবার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলে সুবেশ, তান্ত্রিক, ওঁরা ওদিককার খুবই বিখ্যাত তান্ত্রিক, বুঝলি?
*********
পরের দিন সকালে ভবেশবাবু অভ্যেসমতন এককাপ চা খেতে এসে ঘরের কোণে রাখা মূর্তিটাকে দেখে কুঁচকে ফেললেন, এটা আবার কোত্থেকে জোটালে অতীন?
ভবেশ ভট্টাচার্য অতীনের বাবা অজয় মুখুজ্জের বাল্যবন্ধু, প্রায় ঘুনসি পরার সময়কার ইয়ারি আর কী! সেই থেকে ভদ্রলোক অতীনের বাড়ির একজন হয়ে গেছেন। ইতিহাসের প্রফেসর ছিলেন, সদ্য রিটায়ার করেছেন। অকৃতদার, গোঁড়া ব্রাহ্মণ এই ভদ্রলোকের একমাত্র নেশা বই। অতীনের মা এঁকে খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন, দাদা বলে ডাকতেন ও মান্য করতেন। তবে এ বাড়িতে এঁর সবচেয়ে বড় পরিচিতি হচ্ছে যে ইনি অতীনের ঠাকুদা, বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আশুতোষ মুখার্জির প্রিয়তম শিষ্য। দরিদ্র উদ্বাস্তু পরিবারের এই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রটিকে আশুতোষবাবু প্রায় বুকে তুলে মানুষ করেছেন। শোনা যায় এককালে কিশোর ভবেশের খাওয়াপরার খরচাও আশুতোষবাবু নিজের পকেট থেকে দিতেন। ভবেশবাবু অবশ্য নিরাশ করেননি শিক্ষাগুরুকে, বিএ, এমএ, দুটোতেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে এলাকার মুখোজ্জ্বল করেন। আধা খ্যাপাটে, আজীবন ব্যাচেলর এই ইতিহাসের প্রফেসরটি এলাকাতে যুগপৎ ভীতি ও সম্মানের উদ্রেক করে থাকেন। তবে মুখুজ্জে পরিবারের প্রতি এঁর আজন্মলালিত টান আজও যায়নি। রোজ সকালে আসেন, এককাপ চা খান, অতীনের কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করেন, তারপর পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে বসেন। এঁর জন্যেই অতীনের মনে হয় মাথার ওপর একটা ছাদ এখনো যেতে যেতেও যায়নি।
