অতীনের শখ বলতে শুধু একটিই, অ্যান্টিক কিউরিও কেনা। তার মাসিক হাতখরচের বেশিটাই চলে যায় টুকটাক পুরোনো জিনিস কিনতে। অবশ্য খুব বেশি দামি কিছু না, এই একটা টেবিলঘড়ি কী পুরোনো আফ্রিকান মুখোশ, এই আর কী। আজকাল আবার ঝুঁকেছে মূর্তি কেনার দিকে। ঘরের একটা কোণ ফাঁকা আছে। তক্কেতক্কে আছে, ভালো দাওতে একটা মূর্তি পেলে কিনে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখবে।
তাই মূর্তিটাকে দোকানে দেখেই ভারী পছন্দ হয়ে গেল অতীনের। ফুট তিনেক মতন লম্বা, পিতলের তৈরি দেবীমূর্তি। সারা মূর্তিটা সবজেটে নীল রঙের। মুকুট ও অন্যান্য অলঙ্কারের ডিজাইন দেখে মনে হয় তিব্বতীয় বৌদ্ধমূর্তি। আরেকটু ভালো করে দেখবে বলে মূর্তির কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে দেখতে লাগল অতীন।
দেবীমূর্তিই বটে। পদ্মের ওপর বসে আছেন দেবী, ডান পা নীচে নামানো, বাঁ পা। ভাঁজ করে ডানপায়ের হাঁটুর ভাজে ঢোকানো। দেবীর চার হাত, নিচের বাঁ হাতে বীণা ধরে আছেন, ডান হাতে অভয়মুদ্রা। বৌদ্ধদের মধ্যে সরস্বতীপুজোর প্রচলন ছিল। নাকি? ধন্দে পড়ে গেলো অতীন। আস্তে আস্তে চোখদুটো ওপরে তুলল অতীন, আর ওপরের হাত দুটোর দিকে নজর পড়তেই থমকে গেল, ওপরে ডানহাতে খঙ্গ, আর বাঁ হাতে নরকরোটি!
আজ অবধি এমন অদ্ভুত কম্বিনেশনের মূর্তি একটিও দেখেনি অতীন। একই সঙ্গে খঙ্গ, করোটি আর বীণা? দেবীর মুখে স্তিমিত প্রসন্ন হাসি, নেশাতুর নয়ন। আর অত্যন্ত আবেদনময়ী শরীর। সারা মূর্তি জুড়ে আঁটোসাঁটো যৌনতা ফেটে পড়ছে যেন। পীনোন্নত স্তনযুগল, তার ওপর চওড়া কাপড়ের পট্টি বাঁধা আছে কঁচুলি হিসেবে, যদিও এই মদোন্মত্ত যৌবনকে আটকে রাখা তার সাধ্য নয়। সরু কোমর, একটা কটিবন্ধনী দিয়ে আবৃত। একটি স্নিগ্ধ রম্যশ্রী সমগ্র মূর্তি জুড়ে লেগে আছে, শান্ত শৃঙ্গাররসের এমন গ্রেসফুল প্রকাশ আর দেখেনি অতীন। সে আরো মুগ্ধ হল মূর্তিকারের হাতের কারুকাজ দেখে। নাভি থেকে স্তনযুগলের মাঝ অবধি যে লোমরাজি উঠে এসেছে, সেটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটে উঠেছে মূর্তির মধ্যে। এমন সূক্ষ্ম হাতের কাজ অতীন শেষ কবে দেখেছে নিজেই মনে করতে পারল না।
বাহ, সুন্দর তো! তৃপ্ত মুখে উঠে দাঁড়াল অতীন, মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে মূর্তিটি বিলক্ষণ পছন্দ হয়েছে তার। মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে গলা তোলে সে, বাবা সুবেশ, কী রকম দাম রেখেছিস এটার? দেখিস, গলা কাটিস না কিন্তু ভাই, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।
সুবেশ খিঁচিয়ে ওঠে, হ্যাঁ রে শালা, তোর গলা কেটে তো হেব্বি পয়সা পাব কি না, চিপ্পস কঁহিকা। শালা, নিবি তো একটা কথা কী ভাঙা ঘড়ি, তার জন্যে আবার দরাদরি কীসের অ্যাঁ? দ্যাখ ভাই, পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি, ভালো মাল দেখলে কিন্তু ছাড়াছাড়ি নেই, যেমন গুড় ঢালবে… বলতে বলতে এদিকেই এগিয়ে আসছিল সুবেশ। হঠাৎ করে মুর্তিটার দিকে চোখ পড়তে থমকে যায়, ওহ, ইয়ে, মানে এইটাই পচন হল নাকি তোর?
হ্যাঁ, আপত্তি আছে তোর? হাসতে হাসতেই বলে অতীন, কিন্তু পরক্ষণেই সুবেশের মুখ দেখে একটু সিরিয়াস হয়ে পড়ে, কী রে, কী হল রে? গম্ভীর হয়ে গেলি কেন? এনিথিং রং উইথ দ্যাট স্ট্যাচু?
সুবেশ কিছু কথা না বলে পকেট থেকে একটা গোল্ড ফ্লেক কিং সাইজ বার করে অতীনকে দেয়, নিজেও একটা বার করে,তারপর তার ফিল্টারের দিকটা অন্যমনস্কের মতন দোকানের কাউন্টারের ওপর ঠুকতে থাকে।
সিগারেটটা ধরাতে ধরাতে সরু চাউনিতে সুবেশকে একবার মেপে নেয় অতীন। যথেষ্ট প্র্যাকটিক্যাল চালু জিনিস এই সুবেশ আগরওয়াল। এসব নাটক করে দাম বাড়াচ্ছে না তো?
মূর্তিটা তুই এমনিই নিয়ে যা। আসলে ওটা আমি কিনিনি, একজন দিয়ে দিয়েছে, বুঝলি।এমনিই দিয়েছে, ফ্রি-তে, একপয়সা নেয়নি। শালা কীসের কার মূর্তি আমি নিজেও জানি না। ভাবলাম একবার প্রফেসর বিনয়তোষ ভট্টাচার্যর কাছে নিয়ে যাই। তিব্বতি মূর্তিটুর্তি-র লাইনে উনিই অথেনটিক কি না। তারপর তো খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি উনি অনেক দিন আগেই অফ হয়ে গেছেন। এখন ভাবছি কার কাছে যাই। ভালো করে না জেনে শালা দামও হাঁকতে…
আহহ, বড় বাজে বকিস তুই সুবেশ, ধমক দেয় অতীন, মালটা পেলি কী করে আগে সেইটা বল।
ওহ, হ্যাঁ, দাঁড়া বলছি, বলে সিগারেটটা ধরিয়ে একটা সুখটান দেয় সুবেশ, তারপর শুরু করে, লাস্ট উইকে, বুঝলি, বামনগাছি গেছি।চিনিস তো?বনগাঁ লাইনে। খবর ছিল এক পুরোনো জমিদারবাড়ি ভাঙা পড়ছে। পুরোনো মানে প্রায় ছশো বছরের পুরোনো স্ট্রাকচার। প্রতি একশো দেড়শো বছর অন্তর অন্তর রিমডেলিং আর সারাই করে। জমিদার ফ্যামিলি ওখানেই আছে ছশশা বছর ধরে। লাস্ট মেজর রিস্ট্রাকচারিং নাকি সিপাই বিদ্রোহের পরের বছর হয়, প্রায় একশো সত্তর বছর আগে। বাড়ির তখনকার মালিক নাকি নুনের আর কাটা কাপড়ের ট্রেডিং করে প্রচুর পয়সা কামায়। প্রচুর মানে প্রচুর। পরের সাত জেনারেশন বসে খেতে পারে এমন। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে আর পাঁচটা বাঙালি জমিদারবাড়ির মতন এদের মধ্যে কোনও শরিকি বিবাদ দেখা দেয়নি। যার আলাদা হবার কথা, নির্বিবাদে নিজের পাওনাটা নিয়ে চুপচাপ কেটে পড়েছে। নো মামলা মোকদ্দমা, নো হাঙ্গাম।
