কোথায় পণ্ডিত? কোথায় কে? কেউ কোত্থাও নেই! সব ফাঁকা!
হু হু করে একঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে যেন স্নান করিয়ে দিয়ে গেল আমোনা গ্রামের বেতালমন্দিরের সামনে একলা দাঁড়িয়ে থাকা মার্টিনেজ ভাজকে।
.
২০১৮। সাতাশে জানুয়ারি। গুইশো বিচ। পোর্তুগাল।
সি বিচে বিকেল নেমে এসেছে তখন। গুইশো পোর্তুগালের খুবই জনপ্রিয় বিচ, তাই শীতের মধ্যেও কম লোকজন ভিড় জমায়নি এখানে। বিচের এক কোণে একটা ছাতার তলায় সত্তরোর্ধ বৃদ্ধটি বসে ঝিমোচ্ছিলেন। অদূরে হাঁটাচলা করছিলেন এক চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর বয়সি সুগঠিত শরীরের পুরুষ। আর তার হাত ধরে হাঁটছিল একটি বারো বছরের ছেলে। নানা প্রশ্নে সে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিল তার বাবাকে।
তা হলে বলছ অন্যকে কষ্ট দিলে পাপ হয় পাপা?
হ্যাঁ সোনা। কখনই কাউকে কষ্ট দিতে নেই, দুঃখ দিতে নেই।
আর কেউ যদি আমাকে কষ্ট দেয়? আমার কোনো দোষ না থাকলেও?
তাহলে তুমি প্রতিবাদ করবে বাবা, অন্যায়ের জবাবে চুপ থাকাটাও অন্যায়।তবে জিসাস কী বলেছেন জানো তো? পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।
হুমম, আর যদি আমার খুব ইচ্ছে করে অন্যের কিছু নিয়ে নিতে?
সেটা অন্যায় বাবা। কখনও অন্যের জিনিসে লোভ করতে নেই, না বলে ছিনিয়ে নিতে নেই। ওতে পাপ হয়।
আচ্ছা পাপা, তুমি কি ম্যাজিক জানো?
কই, না তো।
জানো পাপা, আমাকে না দাদাই বলেছে ম্যাজিক শেখাবে। যাতে করে আমার অনেক পাওয়ার হয়, আর কেউ যেন না আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে।
অপাঙ্গে একবার বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সেই পুরুষ। তারপর হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি তার ছেলের সামনে। দুইহাত তার দুই কাঁধে রেখে বললেন, শোনো তিয়াগো। সবসময় সব্বার ভালো চাইতে হয়, সব্বাইকে ভালোবাসতে হয়। কখনো কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে নেই, কাউকে ঠকাতে নেই, কষ্ট দিতে নেই। দেখবে, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে চাইবে না। সব্বাইকে প্রয়োজনের সময় সাহায্য করবে, দেখবে তোমার দরকারের সময় ঈশ্বর ঠিক কাউকে না কাউকে জুটিয়ে দেবেন। বি গুড টু দিস ওয়ার্ল্ড, দিস ওয়ার্ল্ড উইল বি গুড টু ইউ। তার জন্যে ম্যাজিক শিখতে হবে না সোনা, ভালোবাসতে শিখলেই হবে। সবসময় মনে রাখবে, ভালোবাসাই হল সবচেয়ে বড় ম্যাজিক, সবচেয়ে বড় যাদু।
.
তথ্যঋণ :
ঠগী – শ্রীপান্থ
বিষয় বৌদ্ধধর্ম– হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
তন্ত্রকথা – চিন্তাহরণ চক্রবর্তী।
পৃথিবীর মাতৃসাধনা– নিগূঢ়ানন্দ
নরবলির ইতিহাস– দুর্গানন্দ চট্টোপাধ্যায়
বৌদ্ধদের দেবদেবী– বিনয়তোষ ভট্টাচার্য
চুরাশি সিদ্ধর কাহিনী – অলকা চট্টোপাধ্যায়
তান্ত্রিক সাধনা ও তন্ত্ৰকাহিনী– তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী
তিব্বতের রহস্যময় যোগ ও তন্ত্র– দেবদীপ
বৃহৎ তন্ত্রসার–কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।
ষটকৰ্ম্মদীপিকা রসিকমোহন চট্টোপাধ্যায়
তান্ত্রিকদের বিচিত্র কাহিনী– সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়
তন্ত্রাভিলাষী চিকিৎসক— ডঃ পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
ভোগ
মূর্তিটাকে দোকানে দেখেই ভারী পছন্দ হয়ে গেল অতীনের। কিন্তু তারপর মূর্তিটাকে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে…
পার্ক স্ট্রিটের এই কিউরিওর দোকানে প্রায়ই আসে অতীন। মালিক সুবেশ। আগরওয়ালের সঙ্গে গল্পগুজব করে কিছুক্ষণ, এটা ওটা নেড়েচেড়ে দেখে, কিছু পছন্দ হলে ঘরে নিয়ে যায়। সুবেশের সঙ্গে মাত্র এই কয়েকবছরেই বেশ একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অতীনের। দুজনেই ব্যাচেলার, বয়েসও কাছাকাছি, একত্রিশ আর তেত্রিশ। তার ওপর। সুবেশ আগরওয়াল নামেই মারোয়াড়ি, পাঁচ পুরুষের বাস কলকাতা শহরে। চট করে দেখ লে বা কথা বললে মনে হয় মানিকতলার গলি থেকে বগলে ব্যাগ নিয়ে বার হয়ে পান। চিবোতে চিবোতে গিলেন্ডার হাউসে কেরানিগিরি করতে যাওয়া বাঙালি বাবুটি বুঝি।
অতীনের সঙ্গে সুবেশের এই হৃদ্যতা দোকানদার আর খদ্দেরের সাধারণ আলাপচারিতার থেকে অনেক বেশি। ধার বাকি তো আছেই, সময় সুযোগ বুঝে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ড্যান্স বারে বসে মদ্যপান, শনিবার দেখে মাঝেমধ্যে রেস কোর্সে টু মারা, সবই চলে। সুবেশের আরো দুটি সদগুণ হচ্ছে এক, টাকার জন্যে অতীনকে মোটেও তাগাদা দেয় না; আর দুই, চার পেগের পর লোকটা ভারী উদার হয়ে পড়ে, কিছুতেই অতীনকে পয়সা দিতে হয় না।
আজ অক্টোবরের শেষ শনিবার। অফিসফেরতা আজও এসেছিল অতীন, টুকটাক গল্প করে তারপর মেট্রো ধরে নেতাজিনগরের বাসায় ফিরে যাবে, এই ছিল প্ল্যান। এমনিতেও অতীন অকৃতদার, তার ওপর প্রথম যৌবনেই মা-বাবা। দেহ রাখেন, বাড়ি যাবার তেমন তাড়া থাকে না। বুড়ি কাজের লোক পুস্পদি ছাড়া অতীনের তিনকূলে কেউ নেইও। পুষ্পরানি এ বাড়িতে সর্বক্ষণের কাজের লোক হয়ে আসেন যখন অতীন জন্মায়। সেই থেকে রয়ে গেছেন ভদ্রমহিলা, সর্বজনীন। পুস্পদি হয়ে। ফলে যখন খুশি বাড়ি ফেরার এই স্বাধীনতাটা খুব আয়েস করেই উপভোগ করে অতীন। বাপ-মা একটা দোতলা বাড়ি আর মোটা ব্যাঙ্ক ব্যালান্স রেখেই দেহ রেখেছেন, টাকার খুব একটা টানাটানি অতীনের নেই, সে নিজেও একটা কনজিউমার গুডস কম্পানির ট্রেড মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করে, মাইনে খারাপ না, তদুপরি ইন্সেন্টিভ তো আছেই। তার স্বভাবচরিত্র ভালো, পাড়াপড়শিরা। তাকে ভালোবাসেন, রাস্তায় দেখা হলে খোঁজ নেন। বার্সিলোনা, পলিটিক্স, ইস্টবেঙ্গল, সিনেমা এসব নিয়ে অতীন সুখেই আছে।
