আর সেই ঝড়ের গগনভেদী গর্জন ছাপিয়ে ভেসে আসছে কৃষ্ণানন্দের গম্ভীর উদাত্ত আবৃত্তি,
শূলেন পাহি নো দেবি পাহি খগেন চাম্বিকে।
ঘণ্টাস্কনেন নঃ পাহি চাপজ্যানিঃস্বনেন চ।।
প্রাচ্যাং রক্ষ প্রতীচ্যাং চ চণ্ডীকে রক্ষ দক্ষিণে।
ভ্রমণেনাত্মশূলস্য উত্তরস্যাং তথেশ্বরি।।
সৌম্যানি য়ানি রূপাণি ত্রৈলোক্যে বিচরন্তি তে।
য়ানি চাত্যন্তঘোরাণি তৈ রক্ষাশ্মংস্তথা ভুবম্।।
খঙ্গশূলগদাদীনি য়ানি চাস্ত্ৰানি তেহম্বিকে।
করপল্লবসঙ্গীনি তৈরস্মাক্ষ সর্বতঃ।
সাপের চোখে চোখ রাখা ইঁদুরের মতন মোহগ্রস্ত হয়ে এই অনৈসর্গিক আসুরিক সংগ্রাম দেখছিলেন মার্টিনেজ। হঠাৎ করে পুরো দৃশ্যপটে একটি ক্ষীণ পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন তিনি। বাঁ চোখের কোনা দিয়ে তিনি দেখলেন সামনের বেতাল মন্দিরের দরজা যেন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে মন্দিরের দিকে তাকালেন তিনি আর ওই বিপুল অনৈসর্গিক শক্তিমত্ততার মধ্যেও, আসন্ন মৃত্যুর মধ্যেও চমকে উঠলেন।
বেতাল মন্দিরের দরজা গেছে খুলে, আর সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি শিশু। বালিকা!
এত আশ্চর্য জীবনে কখনও হননি মার্টিনেজ। এই বিপুল বিভীষিকার মধ্যে কোথা থেকে এল এই মেয়ে? এখনই কী তার এখানে আসতে হল? এতক্ষণ কী করছিল সে মন্দিরের ভেতর? এখন এর মধ্যে এলে যে শিশুটির সর্বনাশ হয়ে যাবে! মহাভয়ের মধ্যেও বালিকাটির জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন তিনি!
অথচ মেয়েটির কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র হুশ নেই। নয় কী দশ বছর বয়েস হবে তার, একঢাল কালো চুল হাওয়ায় উড়ছে উন্মাদিনীর মতন। দৃপ্ত পায়ে সে এসে দাঁড়াল মন্দিরের চাতালে। আর তখনই তাকে দশমীর চাঁদের আলো আঁধারিতে সামান্য দেখতে পেলেন মার্টিনেজ।
পরনে একটি লাল রঙের বস্ত্রখণ্ড শাড়ির মত করে পরেছে সে। তার গায়ের রঙ ঘোর কালো। কিন্তু আহা, কালোর মধ্যেও অমন ভুবনমোহিনী রূপ কোনোদিন দেখেননি মার্টিনেজ। চোখ দুটো যেন ধক ধক করে জ্বলছে সেই মেয়েটির। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে মাটিতে নেমে এল সেই বালিকা, আর ডান হাতটা তুলে যেন থামতে বলল সেই বেতালমূর্তিকে।
মার্টিনেজের মনে হল সেই ছায়াবেতালের মাথার মধ্যে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। দুহাত দিয়ে যেন মাথাটা চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সেই অশরীরী। তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল এইবার। ঝড়ের প্রকোপে এবার ধীরে ধীরে উড়ে যেতে লাগল তার শরীরের ছায়ার স্তর।
একটু একটু করে অন্ধকারের পরত যেন টুকরো টুকরো অভিশাপের মতই হাওয়ায়। মিশে যেতে লাগল, প্রথমে ধীরে, পরে দ্রুত! আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে উঠতে লাগল সেই বেতালশরীর। যখন শেষ ছায়ার টুকরোটিও মিশে গেল হাওয়ার সঙ্গে, একটা হাহাকারের শব্দ যেন মাটির ভেতর থেকে উঠেই আকাশের দিকে মিলিয়ে যেতে লাগল, মিশে যেতে লাগল সেই ঝড়ের মধ্যে! মাথা তুলে দেখলেন মার্টিনেজ, অন্ধকারের ছায়াপুঞ্জ ধাবিত হয়েছে ঊর্ধ্বাকাশে নক্ষত্রলোকের দিকে।
চরম বিস্ময়ে সেই শিশুটির দিকে তাকালেন মার্টিনেজ। আর একটা জিনিস দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি! মেয়েটির উন্মুক্ত করতলে খেলে যাচ্ছে লাল রঙের বিদ্যতের প্রভা। সেই কালোর মধ্যে যেন ঝিকিয়ে উঠছে দুইটি রক্তপায়ী তরবারির দীপ্তি। একইসঙ্গে বড় মায়াময় ও ভয়ানক ভীতিপ্রদ সেই আলোর খেলা।
চকিতে মনে পড়ে গেল মার্টিনেজের, লিওনার্দের ডিক্লারেশন অনুযায়ী সেই শক্তিখণ্ডটির বর্ণনার কথা!
আদিশক্তি। আদিমতম শক্তির বীজাধার। পরা ও অপরা, এই দুই শক্তি দুই রক্তবর্ণ সর্পের মতন খেলা করে সৃষ্টিবিন্দুর দেহ জুড়ে।
এ কে? কে এই মেয়ে? কোথা থেকে এল?
দু পা পিছিয়ে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়ালেন মার্টিনেজ। তারপর মুখ ফিরিয়ে দৌড়ে গেলেন যেখানে বসে কৃষ্ণানন্দ ধ্যান করছেন। কে এই মেয়ে? মৃত্যুর দেবতাকেও ফিরিয়ে দিতে পারে এমন অসামান্য অলৌকিক ক্ষমতা কী করে পেল সে? ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগলেন তিনি, পণ্ডিত ওঠো। দেখ একটি মেয়ে এসেছে কোথা থেকে, কী অসম্ভবকেই না সম্ভব করেছে সে! ওঠো পণ্ডিত, দেখো তাকে!
চোখ খুললেন না কৃষ্ণানন্দ। তার সর্বাঙ্গ থরথর কাঁপতে লাগল, দুচোখে উপচে নেমে এল অশ্রুনদী। ফিসফিস করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এসেছে? সে এসেছে সাহেব?
বিস্ময়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন মার্টিনেজ, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে আসবে পণ্ডিত? এই মেয়েটা? তুমি জানতে তার কথা? তুমি জানতে সে আসবে?
ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, ধরা গলায় বললেন, সে আসে সাহেব, ডাকার মতন ডাকলে সে যে না এসে পারে না।
কিছুই বুঝলেন না মার্টিনেজ, শুধু মূঢ়বিস্ময়ে এটুকুই জিজ্ঞেস করলেন, কার কথা বলছ? এই বাচ্চা মেয়েটির কথা? ডাকলেই এ চলে আসে? এই মেয়েটি কে? তুমি একে চেনো, পণ্ডিত?
দরবিগলিত অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে কৃষ্ণানন্দের বুক। চোখ বন্ধ করেই তিনি বহুকষ্টে ঠোঁটদুটো ফাঁক করে শুধু বললেন, চিনি সাহেব, খুব চিনি। ও আমার মেয়ে।
ঘোর অবিশ্বাসের চোখে খানিকক্ষণ কৃষ্ণানন্দের দিকে তাকিয়ে রইলেন মার্টিনেজ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মন্দিরের দিকে ঘুরলেন মেয়েটিকে আরেকবার দেখবেন বলে।
কে কোথায়? কোথায় সেই বালিকা? মন্দিরের দরজা যেমন-কে-তেমন বন্ধ। মদমন্দ বাতাস বয়ে চলেছে, পরিষ্কার আকাশে উজ্জ্বল দশমীর চাঁদ। কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। কে বলবে একটু আগে ঘটে যাচ্ছিল এক মহাপ্রলয়! সেই অলৌকিক যুদ্ধের চিহ্নমাত্র নেই।– ভারী অবাক হয়ে পিছনে ফিরলেন মার্টিনেজ। এও কি মায়া? পণ্ডিতকে এর মানে জিজ্ঞেস করতে হবে।
