আলোর সেই উল্লাস উদযাপন কমলে সটান উঠে দাঁড়ালেন মার্টিনেজ। দেখলেন সেই ছায়াবেতাল আজ পূর্ণ! মিশে গেছে তার বুকের ক্ষত। জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতন। গভীর জিঘাংসায় জ্বলছে তার চোখদুটি। এবং সেই চোখদুটি তাকিয়ে আছে সোজা এদিকেই!
সেই রক্তলোলুপ দৃষ্টির সামনে এই প্রথম বার ভয় পেলেন মার্টিনেজ। সেই দৃষ্টি যেন জ্বলন্ত লোহার শলাকা দিয়ে তার চৈতন্যের মধ্যে, সমস্ত অনুভূতির মধ্যে অগ্নিঅক্ষরে খোদাই করে দিল একটি মাত্র শব্দ!
মৃত্যু!
এই প্রথম মৃত্যুভয় পেলেন মার্টিনেজ। জীবনে অনেক জীবন বিপন্ন করা প্রাণঘাতী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন তিনি। সেখানে মুহূর্তের ভুলচুকে নিহত হতে পারতেন তিনি, তা ছিল তার কর্তব্যের অংশ, প্রফেশনাল হ্যাঁজার্ডস! কিন্তু প্রতিবারেই তিনি উতরে। গেছেন তাঁর অসামান্য বুদ্ধিমত্তা, দুর্জয় সাহস আর অসামান্য দক্ষতা দিয়ে।
কিন্তু এই প্রথম তিনি বুঝলেন যে এর কোনোটাই আজ তার কোনো কাজে আসবে না! তার বহুপ্রশংসিত কর্মদক্ষতা আর অমানুষী সাহসের কোনো দরকারই নেই আজ। স্বয়ং মৃত্যু যদি পাশদণ্ড হাতে ঘাতকের রূপ ধরে সামনে দাঁড়ান, তা হলে আর কীসের কী?
থরহরি কাঁপতে লাগলেন মার্টিনেজ। তার হাঁটুদুটো দুর্বল বোধ হতে লাগল। দরদর করে ঘামতে লাগলেন তিনি, উজ্জ্বল গৌরবর্ণের সুগঠিত শরীর ভেসে যেতে লাগল। অবিশ্রান্ত স্বেদে। তিনি আর এক পাও এগোবার শক্তি বা সাহস কিছুই পেলেন না।
এবং ঠিক সেই সময়েই, সেই বেতালমূর্তি তার দিকে প্রথম পা ফেলল।
মার্টিনেজের মনে হল এই যেন মৃত্যু তার দিকে নিল তার প্রথম পদক্ষেপ।
প্রথমবারের মতন কৃষ্ণানন্দকে উত্তেজিত হতে দেখলেন মার্টিনেজ। সেই ব্রাহ্মণ এগিয়ে এলেন দু পা, ডান হাত তুলে সরোষে উচ্চারণ করলেন, তিষ্ঠ!
এক মুহূর্তের জন্যে হয়তো থমকাল সেই বেতালমূর্তি। তারপর যেন অনেক কষ্টে হলেও পরের পা ফেলল সে, কৃষ্ণানন্দের আদেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই।
বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করে আবার উচ্চগ্রামে চিৎকার করলেন কৃষ্ণানন্দ, তিষ্ঠ! ক্ষণকালের জন্যে ফের থমকাল সেই কালমূর্তি, তারপর পরের পদক্ষেপে মাটি কাঁপিয়ে অগ্রসর হল আরও এক পা!
চকিতে নিজের আসনে ফিরে গেলেন কৃষ্ণানন্দ। বজ্রাসনে বসে জ্বলন্ত আগুনে আহুতি দিলেন কিছু মন্ত্রপূত চাল ও সিঁদুর চর্চিত দূর্বাঘাস! দাউদাউ করে জ্বলে উঠল সেই অগ্নিকুণ্ড। বার বার মন্ত্র উচ্চারণ করে সেই আগুনে নানা উপচার আহুতি দিতে লাগলেন তিনি।
কিন্তু হায়, আজ যেন মৃত্যু তার অব্যর্থ গাণ্ডীবে অমোঘ তৃণীর সাজিয়ে বসেছে! মুক্তি নেই, মুক্তি নেই মার্টিনেজের সেই নিশ্চিত মরণের হাত থেকে। বিফল হতে লাগল কৃষ্ণানন্দের যাবতীয় মন্ত্রোচ্চারণ। ধীরে, কিন্তু আরও স্পষ্ট পদক্ষেপে সেই ধুলোছায়ার। মূর্তি এগিয়ে আসতে লাগল মার্টিনেজের দিকে।
ভয়ে সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগল মার্টিনেজের। সারা জীবনে যা মনে রাখার মুহূর্ত আছে, সবই এক এক করে সিনেমার রিলের মতন তার চোখের সামনে দিয়ে চলে যেতে লাগল। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এল তার। শুধু অস্ফুটে একবার তার মুখে উচ্চারিত হলো, তিয়াগো।
ঠিক সেই সময়েই অসম্ভব গম্ভীরকণ্ঠে উচ্চারিত এই মন্ত্রগুলো ভেসে এল তার। কানে,
সর্বরুহাম মহাভীম ঘোরদ্রংষ্ট্রম হসন্মুখীম
চতুর্ভুজম খঙ্গমুণ্ডবরং ভয়ংকর শিবম্
মুণ্ডমালা ধর দেবী লোলজিহ্বা দিগম্বরম
এবম সচ্চিস্তয়েৎ কালীম শ্মশানালয়বাসিনীম।
ক্রীং ক্রীং ক্রীং হ্রীং হ্রীং হুম্ হুম্ স্বাহা…
ওম তারেতুত্তারেতুরে সর্ব উপদ্রবেভয়ো রক্ষম কুরু স্বাহা।
ওম তারেতুত্তারেতুরে সর্ব দুঃস্বপ্নেভয়ো রক্ষম কুরু স্বাহা।
ওম তারেতুত্তারেতুরে সর্ব শত্রুভয়ো রক্ষম কুরু স্বাহা…
কোনোরকমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন মার্টিনেজ। বজ্রাসনে বসে দুই হাত দু-হাঁটুতে বিশেষ মুদ্রায় রেখে অনর্গল মন্ত্র উচ্চারণ করছেন কৃষ্ণানন্দ। ঘামে ভিজে যাচ্ছে তার। সর্বাঙ্গ, শরীরের সমস্ত মাংসপেশী ফুলে উঠেছে তার, কপালে ঘনিয়ে উঠেছে গভীর ভ্রূকুটি ও স্বেদবিন্দু।
বেতালমূর্তি নিল তার পরের পদক্ষেপ, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই কোথা থেকে যেন। ধেয়ে এল এক প্রবল তুফান! শনশন আওয়াজ তুলে হঠাৎই যেন তুমুল বাতাস ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁদের ঘিরে। দমকা হাওয়ার উড়ে গেল সেই জ্বলন্ত অগ্নিপাত্র, সমস্ত পূজার উপচার। উড়ে যেতে লাগল আশেপাশের মাটি ও ধুলোর রাশি। ভয়ংকর ভাবে মাথা দোলাতে লাগল আশেপাশের বাগানের গাছগুলো, এই যেন তাদের শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলবে কে! মার্টিনেজের মনে হল মুহূর্তে মুহূর্তে যেন বেড়ে উঠছে সেই ঝড়ের তেজ। ক্রুদ্ধা প্রকৃতি যেন প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করেছেন পৃথিবীর টুটি ধরে সব কিছু নাড়িয়ে দেবেন বলে। মার্টিনেজের মনে হল আর কিছুক্ষণ এই ঝড় চললে তাদেরই যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে এই প্রবল হাওয়ার দামাল স্রোত।
একইসঙ্গে তিনি সামনে তাকিয়ে দেখলেন, এইবার যেন কিছু ব্যত্যয় এসেছে সেই বেতালমূর্তির চালচলনে। ঝড়ের সেই উন্মত্ত প্রকোপ যেন ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চাইছে। সেই ছায়ামূর্তিকে, আর সেই বেতালমূর্তি তাতে প্রাণপণ বাধা দিয়ে চলেছে। সেই প্রবল প্রলয়ঙ্কর ঝড় যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে চাইছে সেই বেতালকে, যেভাবে ময়াল সাপ পেঁচিয়ে ধরে তার শিকারকে। সেই বেতালমূর্তিও সমস্ত শক্তি সংহত করে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে চাইছে, চাইছে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে।ক্রুদ্ধ গর্জনের সঙ্গে ঝড়ের এক একটা ছোবল যেন ছিন্নভিন্ন করতে চাইছে সেই ছায়াশরীর। আর প্রবল পরাক্রমের সঙ্গে নিজের অন্ধকারের প্রতিটি পরত যেন ধরে রাখতে চাইছে সেই বেতালমূর্তি।
