কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যেন মন্দিরের সামনের জমিতে সেই ক্ষীণ নীলবর্ণ স্থির বিদ্যুতাটিকে ঘিরে ধুলোর ঝড় ক্রমশ আরও বেড়ে উঠল। ক্ষুধার্ত অজগরের মতন হাওয়ার স্রোত, ধুলোর রাশি এসে যোগ দিল সেই দুরন্ত ঘূর্ণিতে। চারিদিকের আকাশ বাতাস প্রকৃতি যেন গলে গলে মিশতে লাগল সেই ঝড়ে। স্থির চোখে তাকে দেখতে লাগলেন মার্টিনেজ। সেই করুণ আর্তি যেন, খেয়াল করলেন মার্টিনেজ, ধীরে ধীরে সেই আর্তস্বর যেন বদলে যাচ্ছে গর্জনে।
হ্যাঁ, গর্জন। যেটাকে হাহাকার বলে ভুল করেছিলেন মার্টিনেজ, সেটা আস্তে আস্তে ক্রুদ্ধ গর্জনের আকার নিতে লাগল। স্পষ্ট শুনতে পেলেন তিনি, একটা অব্যক্ত রুদ্ধ হতাশা যেন ক্রমশই মূর্তিমান হয়ে উঠতে লেগেছে তাদের সামনে। আরও লক্ষ করলেন মার্টিনেজ, সেই ধুলোর ঝড় যেন একটা মূর্তি পরিগ্রহ করার চেষ্টা করছে। না, চেষ্টা কই, ওই তো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে তার হিংস্র অবয়ব। ক্রুর আক্রোশে দুই ঝোড়ো হাত দিয়ে প্রবল হাওয়াকে মুঠির মধ্যে ধরতে চাইছে সেই মূর্তি। ধুলো আর ঝড়ে বানানো। তার শরীর, আর সেই উলঙ্গতা যেন আরও বাড়িয়ে তুলেছে এই ছায়াময় বিভীষিকা। অসম্ভব নোংরা মড়াপচা গন্ধে ভরে গেল চারিদিক। ক্রুদ্ধ অথচ হতাশ গর্জনে যেন। জেগে উঠলেন মৃতদের জগতের রাজা!
আরেকটা জিনিস খেয়াল করলেন মাটিনেজ। এই মূর্তি রোষে উন্মত্ত, অথচ অন্ধ। সে ক্রোধে হাতড়াচ্ছে চারিদিক, কিন্তু তাতে তার গতিবিধিতে যতটা ক্রোধোন্মত্ত ভাব আছে, ততটাই মিশে আছে অসহায়তা।
কারণটা বুঝতে দেরি হল না মার্টিনেজের! তিনি দেখলেন যে মূর্তির বুকের কাছটা ফাঁকা! কে যেন হিংস্র আক্রোশে এই অমানুষী ছায়ামূর্তির বুকের ভেতর থেকে উপড়ে এনেছে তার হৃৎপিণ্ডটা। ওটাই যেন তার চোখ, তার অস্তিত্ব, তার চৈতন্য! যেন তারই খোঁজ সে দিশেহারা, তার অভাবেই সে বুঝতে পারছে না যে সে কোথায়!
কার মতন এই মূর্তি? কোথায় যেন পড়েছেন মার্টিনেজ বুক চিরে হৃৎপিণ্ড উপড়ে নেওয়ার কথা? খুব চেনা চেনা লাগছে অথচ… এ চকিতে মার্টিনেজের মনে পড়ে গেল মিগুয়েলের ডায়ারির কথা। সেই হিন্দু প্রিস্টের ছেলেকেও খুন করা হয়েছিল জ্যান্ত অবস্থায় তার বুকের থেকে হৃৎপিণ্ড উপড়ে এনে!
চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা যেন সরে গেল মার্টিনেজের। পাঁচশো, পাঁচশো। বছর ধরে সেই নিহত হিন্দু পুরোহিতের খুন হওয়া ছেলের আত্মার দায়ভার বহন করে চলেছে এই বেতাল, সেই অভিশাপই দিয়ে গেছিলেন সেই পুরোহিত। এই বেতালই সেই মৃত্যুর দেবতা, কয়েক শতাব্দী ধরে এই বেতালের বুভুক্ষু আত্মাই ভাঁজ পরিবারের প্রতিটি জ্যেষ্ঠ সন্তানের প্রাণহরণ করে এসেছে। তাই কখনোই বোঝা যায়নি আততায়ী কে, মরণকালে কে উপস্থিত হয় সেই হতভাগ্যদের সামনে। লিওনার্দোর ডিক্লারেশনের প্রতিটি বাক্য যেন সজীব হয়ে অগ্নিআখরে ফুটে উঠল তার চোখের সামনে।
আজ পাঁচশো বছর পর সেই নির্দয় অমানুষিকতা যেন আরও বীভৎসতা বহন করে আনল মার্টিনেজের কাছে! আজ তার অন্তিম প্রতিশোধের সময়, আজ সেই ছায়াময় অশরীরীর শেষ হিসেব বুঝে নেওয়ার দিন।
সেই শক্তিপিণ্ডটি হাতে নিয়ে ভূতগ্রস্তের মতন উঠে দাঁড়ালেন মার্টিনেজ। আসনে বসে থাকার সময় শেষ হয়ে গেছে তার। তিনি তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মধ্যে ধরে সেই শক্তিপিণ্ডটি ধূলিময় বেতালমূর্তির দিকে তুলে ধরলেন।
সঙ্গে সঙ্গে মার্টিনেজের মনে হল কী যেন এক মহাশক্তিশালী চৌম্বক আকর্ষণ। স্থাপিত হল এই শক্তিপীঠ ও বেতালের মধ্যে। ক্রুদ্ধ রিরংসায় মত্ত বেতাল যেন হঠাৎই এদিকে মুখ করে স্থির হয়ে গেল। হিংস্র পশু যেমন শিকারের গন্ধ পেলে স্থির হয়ে যায়, বাতাসে কীসের যেন অশরীরী স্পন্দন এসে সমস্ত মনোযোগ আকর্ষণ করে নিল। সেই বেতালমূর্তির। আরও অনুভব করলেন মার্টিনেজ, তার হাতে ধরা শক্তিপীঠটি হঠাৎ করেই অসম্ভব গরম হয়ে উঠতে লাগল। এত গরম যে তাকে হাতে ধরে রাখা। যায় না। দু-আঙুলে তাকে ধরে রাখতে কষ্ট হতে লাগল মার্টিনেজের। কে যেন অমোঘ। আকর্ষণে টানছে সেই শক্তিপীঠটিকে, টানছে সেই বেতালমূর্তির দিকে। সেই ছায়ামূর্তি সতর্কতার সঙ্গে ওদিক-সেদিক মুখ ঘুরিয়ে শেষে এদিকে তাকাতেই দেখলেন মার্টিনেজ, অবয়বহীন সেই কালমূর্তিতে দপ করে জ্বলে উঠেছে দুটি চোখ! আর সেই আগুনে দষ্টি মেলে এদিকেই তাকিয়ে আছে সে।
বেতাল!
তারপর সেই বেতালের দুই হাত যেন উঠে এল এদিকে। সেই শরীরী ভাষা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না মার্টিনেজের। আর পারলেন না তিনি, সেই অলৌকিক শক্তিখণ্ডটি সজোরে ছুঁড়ে মারলেন বেতালের দিকে।
যেন একটা আলোর বিস্ফোরণ ঘটে গেল মার্টিনেজ আর কৃষ্ণানন্দের চোখের সামনে। দপ করে যেন জ্বলে উঠল বিশ্বচরাচর। চোখে ধাঁধানো আলোর হাজার। খানেকশব্দহীন রোশনাই যেন একসঙ্গে ফেটে পড়ল দুজনের চোখেমুখে। আকাশ জুড়ে একটা সুগভীর উল্লাসের স্বর যেন মহাসর্পের মতই নেমে এল সেই জায়গাকে বেষ্টন। করে, আকাশ থেকে যেন আতশবাজির মতই খসে পড়তে লাগল নক্ষত্রমন্ডল, অশ্লীল। আনন্দের উন্মত্ত গর্জন বধির করে দিতে লাগল এই বিশ্বচরাচরকে…
সেই আলোর নৃশংস উল্লাসে নিচু হয়ে বসে পড়লেন দুজনেই। আর তখনই কে যেন মার্টিনেজের বুকের ভেতর বলে উঠল, পেরেছেন। তিনি পেরেছেন ফিরিয়ে দিতে সেই অভিশপ্ত শক্তিখণ্ডটিকে। পেরেছেন তিনি সেই শতাব্দীব্যাপী পাপের দায় খণ্ডন। করতে! পেরেছেন তার পরিবারকে মুক্তির পথ দেখাতে, পেরেছেন পাঁচশো বছর ধরে। চলে আসা একটি বৃত্তকে সম্পূর্ণ করতে। মুক্ত, আজ তিনি মুক্ত! মিগুয়েল থেকে শুরু করে জর্জিনহো, ফ্রান্সিসকো হয়ে রডরিগো… ভাঁজ পরিবারের প্রতিটি অকালমৃতের আত্মা আজ শান্তি পাবে। শান্তি পাবেন বুড়ো ফার্নান্দোও…।
