হঠাৎ করে একটা কাটা মাথা তার কোলে এসে পড়তে চমকে উঠলেন মার্টিনেজ। আরে… এ যে রডরিগোর মাথা! সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ, যা তিনি শেষ দেখেছিলেন। অ্যাভেনিদা দ্য লিবারদাদের রাস্তায়, এক মহার্ঘ রেস্তোরাঁর পেছনের গলিতে।
স্থির হয়ে বসেছিলেন মার্টিনেজ, তার বুকটা মুচড়ে যাচ্ছিল। রডসি…রডসি…কত কষ্ট পেয়েছিলে তুমি? কে এসেছিল সেদিন তোমার মৃত্যুদূত হয়ে?
মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করেছিলেন মার্টিনেজ, চোখ খুলে দেখলেন কোথায় কী? সব ভো ভা! অবাক হয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন তিনি, এমন সময় ডানদিকের কাঁধে একটা শীতল স্পর্শ পেয়ে ঘাড় ঘোরাতেই স্থির হয়ে গেলেন তিনি।
একটা মোটা মতন সাপ তার ঘাড়ে বেয়ে মাথায় ওঠার চেষ্টা করছে। সাপটাকেও বিলক্ষণ চেনেন তিনি, কিং কোবরা, বিষধর সাপেদের রাজা! এদেশে বলে শঙ্খচূড়! এর এক ছোবলে হাতি পর্যন্ত মারা যায়! ( নিঃশ্বাস বন্ধ নিবাত নিষ্কম্পদীপশিখার মতন স্থির হয়ে রইলেন মার্টিনেজ। তারপর অনুভব করলেন যে তাঁর ডানহাঁটুতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে কিছু একটা।
অতিসাবধানে নীচে তাকালেন মার্টিনেজ।
অন্তত শতখানেক সাপ তাকে ঘিরে!সবকটাই দীর্ঘ ও ভয়ানক বিষধর!অগ্নিকুণ্ডের আলোয় এর মধ্যে ব্ল্যাক মাম্বা আর রাসেল ভাইপার চিনতে পারলেন মার্টিনেজ। তার বাঁ হাত পেচিয়ে উঠছে কালোতে-হলুদ ওটা কি? সর্বনাশ, ও যে ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ডেড ক্রেইট! যমের দোসর! শাঁখামুটি।
দাঁতে দাঁত চিপে নিজেকে স্থির রাখলেন মার্টিনেজ। মায়া, সবই মায়া… বিড়বিড় করলেন তিনি। যতক্ষণ এই আসনে বসে আছেন… ভাবতে ভাবতেই শরীরে দুনো বল। এল তার। পেশী আলগা করে হাত বাড়িয়ে সেই আগুনে কিছু গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলেন তিনি।
ম্যাজিকের মতন সমস্ত সাপ উধাও!
এরপর শুরু হল চারিদিকে কান্না, চাবুক আর শিকলের শব্দ। একের পর এক মূঢ়, মুক, ম্লান মুখের ছায়াশরীর তার সামনে দিয়ে চলে ফিরে বেড়াতে লাগল। তাদের পিছনে ভয়ালদর্শন একেকটা লোক, তারা চাবুকের সাঁই সাঁই আওয়াজ তুলে এদের পিঠে মারছে। আর ঝনঝনে শেকল জড়ানো হাত তুলে নিজেদের বাঁচাবার জন্যে সে কী আকুতিবিকুতি সেই হতভাগ্যদের! সেই অসহায় কান্নার শব্দ, ফেঁপানো আর্তির আওয়াজ, করুণ অনুনয় বিনয় যেন মার্টিনেজের কানের ভেতরে কেউ ঢেলে দিতে। লাগল গরম সীসের মতন। খরদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইলেন তিনি, সারা শরীর ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতন টানটান হয়ে রইল… একবার, শুধু একবার আজ্ঞা মিলুক এই ব্রাহ্মণের কাছ থেকে… ।
দেখতে দেখতে তারা কোথায় উধাও হয়ে গেল, চারিদিক এক অপার্থিব অলৌকিক কান্নার শব্দে আর্ত হয়ে উঠল।মার্টিনেজের সামনে কয়েক ফুট দূরে যেন মাটি খুঁড়ে উদয় হল তিনটে মানুষের মূর্তির। দুটো সম্পূর্ণ উলঙ্গ পুরুষ যেন মারতে মারতে একটি উলঙ্গ নারীকে এদিকে নিয়ে আসছে। মেয়েটির করুণ কান্নায় চারিদিক ভেসে যেতে লাগল। অমন ভীষণ মারের থেকে মুহূর্তের পরিত্রাণ চাইছে মেয়েটি, একফোঁটা জল ভিক্ষা চাইছে। জবাবে সে ভীষণদর্শন উলঙ্গ পুরুষদুটি বারবার তার মাথায় ডাঙ্গশ মারছে।
ধীরে ধীরে তারা সেই আগুনের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতে রক্তাক্ত, নগ্ন মেয়েটিকে চিনতে পারলেন মার্টিনেজ! হা ঈশ্বর। এ যে সিসিলিয়া!
চোখ বুঝলেন মার্টিনেজ। মায়া। সবই মায়া।
চোখ খুললেন তিনি। সামনে কিছু নেই। কেউ নেই।
তারপর খটখট শব্দে ভরে গেল চারিদিক। কাদের যেন উল্লাসের খলখল হাসিতে চারিপাশ শিউরে উঠতে লাগল। সভয়ে চারিদিক চেয়ে দেখলেন মার্টিনেজ, রাশি রাশি কঙ্কাল যেন করতালি দিয়ে বেরিয়ে এল অন্ধকারের গর্ভ থেকে। ছায়ায় মেশানো তাদের অবয়ব, তারা করতালি দিয়ে নাচতে লাগল এই দুইজনকে ঘিরে। কে যেন একটা অশুভ খনখনে শব্দে হেসে উঠল, হাড়ের খটাখট শব্দে কান পাতা দায়। অসম্ভব বিশ্রী পূতিগন্ধে মার্টিনেজের পেটের নাড়িভূড়ি অবধি উঠে আসার জোগাড়!
এমন সময় তিনি দেখলেন মন্দিরের দিক থেকে ধীর পায়ে কে যেন একজন আসছে। তার দিকে। তার প্রসারিত দুই হাতে কী যেন একটা রাখা! আগুনের কাছাকাছি আসতে লোকটিকে চিনতে পারলেন তিনি, ফার্নান্দো! তার দুহাতে কী তুলে এনেছেন ফার্নান্দো?
লাশ। তিয়াগোর লাশ!
এইবার আর পারলেন না মার্টিনেজ। স্তম্ভিত চোখে চেয়ে রইলেন সামনে। তার। সমগ্র চৈতন্য ঘুরপাক খেতে লাগল। দুনিয়াটা তার চোখের সামনে দুলতে লাগল ছেঁড়া পর্দার মতন। হল না? এত কাছে এসেও হল না? থরথর কঁপতে লাগলেন তিনি, বুকটা। মনে হল ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। ফার্নান্দোও তার দিকে সজল চোখে চেয়ে আছেন, যেন বলতে চাইছেন যে পারলেন না, তিনিও শেষ পর্যন্ত পারলেন না।
আর বসে থাকতে পারলেন না মার্টিনেজ, ভুলে গেলেন কৃষ্ণানন্দের সতর্কবার্তা। একটিবার, শেষবারের মতন প্রিয়তম পুত্রের মৃতদেহ ছোঁয়ার জন্যে উদগ্রীব হলেন। মার্টিনেজ। আসন ছেড়ে উঠতে যাবেন, এমন সময় চোখ খুলে হুংকার দিয়ে উঠলেন কৃষ্ণানন্দ, সব কিছু ভোজবাজির ছায়ার মতন মিলিয়ে গেল।
এরপর আকাশবাতাস জুড়ে একটা হাহাকার উঠল। একটা করুণ কান্না যেন চারিদিক থেকে গলে গলে পড়তে লাগল তাদের ঘিরে। মার্টিনেজ খেয়াল করলেন। একটা ক্ষীণ ধুলোর আলোড়ন যেন সাপের মতই পাকিয়ে উঠতে শুরু করেছে মন্দিরের ঠিক সামনে। ঠিক তখনই কৃষ্ণানন্দ ফিসফিস করে, অথচ গম্ভীর গলায় বললেন, আসছেন, তিনি আসছেন।
