অথচ এইব্রাহ্মণ পণ্ডিতের কোনো হুশই নেই! তিনি সুরেলা গলায় গেয়ে চলেছেন,
ভানুকোটিভাস্বরম ভবাধ্বিতারকং পরম
নীলকণ্ঠমীপ্সিতার্থদায়কং ত্রিলোচনম।
কালকালমংবুজাক্ষমক্ষশূলমক্ষরং
কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবম ভজে।।
ধীরে ধীরে মার্টিনেজের মনে হল তিনি যেন চারিপাশ থেকে আস্তে আস্তে বিযুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর চৈতন্য আর বোধ যেন তার অস্তিত্ব থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, পরতে পরতে কী যেন উঠে আসছে তার শরীর থেকে। তিনি যেন তার দেহের বাইরে জেগে থাকা অন্য একটি সত্তা। পুরো দৃশ্যটাই যেন তিনি স্বপ্নে দেখছেন, তিনি আসলে এখানে নেই। আসলে তিনি ভাঁজ পালাসেতের চিলেকোঠার ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। একটু পরে তার দাদা রডরিগো তাঁকে ডাকতে আসবে, দুই ভাই মিলে আজ ঠিক করেছেন যে পিছনের বাগানে খেলতে যাবেন। ওই তো সিসিলিয়া, কিশোরী সিসিলিয়া। তাঁর দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসছে, যেমন হাসত আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। হাত নাড়ছে তার দিকে তাকিয়ে, তারপর একটি শিশুকে কোলে তুলে নিল… আরে ওই তো তিয়াগো… তিয়াগো তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, হাত নাড়ছে…।
হঠাৎ করে ঝটকা মেরে উঠে বসলেন তিনি। তিনি কি পাগল হয়ে গেলেন? এ সব কী উলটোপালটা ভাবছেন তিনি? কোথায় রডরিগো? কোথায় সিসিলিয়া? তিয়াগোর জন্যে কোন মুল্লুকে এসে বিচিত্র সব তন্ত্রসাধনার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। সেই কুকুরগুলো… উফ কী ভয়ংকর সব কুকুরগুলো…
চোখ রগড়ান তিনি, কোথায় কুকুর? কোথায় কী? সেই আগুনের কুণ্ড জ্বলছে সমানে। আর তার দিকেই সটান তাকিয়ে আছেন কৃষ্ণানন্দ। তাকিয়ে আছেন সাগ্রহে, সাহেব কী হল তোমার?
কুকুরগুলো কোথায় গেল? হতভম্বের মতন বলেন মার্টিনেজ, আর চারিপাশে তাকাতে থাকেন, সেই ভয়ংকর ছটা কুকুর? উফ, কী বীভৎস ছটা জন্তু। কোথায় গেল তারা?
ছটা কুকুর? ঠিক দেখেছো তুমি সাহেব? আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন কৃষ্ণানন্দ।
কী বলছ পণ্ডিত? দেখেছি মানে? তোমাকে যেমন দেখেছি, তেমনই তাদেরও দেখলাম যে। ছটা কুকুর, কী ভয়ংকর, কী বীভৎস বাপ রে… যেন নরক থেকে উঠে এসেছে… উফ…
দুহাত তুলে কপালে ঠেকালেন সেই ভূয়োদর্শী ব্রাহ্মণ, তার গলা উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে, ধন্য তুমি সাহেব। ধন্য তোমার পুণ্যকর্ম। যাদের দেখেছ তারা কুকুর নয় সাহেব, তারা মানুষের ষড়রিপুর রক্ষক, নিয়ন্তা। জাগতিক বন্ধনের প্রতীক তারা। তাদের দেখা পাওয়া মানে এই জীবনে তুমি উদ্ধার হয়ে গেলে সাহেব, তোমার যাবতীয় মোহপাশ ছিন্ন হয়ে গেল। তোমার যাবতীয় বিচারবুদ্ধি, মায়াবন্ধন, আজ শুদ্ধ হয়ে গেল। জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে যা পাপ করেছ, স্বয়ং কালভৈরব আজ নিজে এসে সেই পাপরাশি ধ্বংস করেছেন, তোমায় আশীর্বাদ করেছেন সাহেব। হা ঈশ্বর, কতই না। হতভাগ্য আমি। এতদিন জপতপ ভজনপূজন করেও যে সৌভাগ্যের কণামাত্র পাইনি, তুমি আজ অশেষ পুণ্যবলে তার অধিকারী হলে, আমি ঈর্ষা করি তোমার ভাগ্যকে সাহেব। ব্রাহ্মণের প্রশংসা শেষই হতে চায় না। সংকুচিত হয়ে পড়েন মার্টিনেজ, কিন্তু পণ্ডিত, আমি তো ক্রিশ্চিয়ান। তোমার হিন্দু গড কি…
একশোটা বাচ্চাকে প্রাণের বাজি রেখে উদ্ধার করার সময় ভেবেছিলে সাহেব, ওরা কোন ধর্মের? সেদিন যে বাচ্চা মেয়েটার জন্যে অতগুলো অমানুষের সঙ্গে খালি হাতে লড়ে গেলে, জিজ্ঞেস করেছিলে মেয়েটা খ্রিস্টান কি না? কীসের ধর্ম সাহেব? কে কার ভগবান? পাপের যদি ধর্মাধর্ম না থাকে সাহেব, পুণ্যের কেন হবে?
চুপ করে থাকেন মার্টিনেজ। এখানে আসার আগে ফার্নান্দোও এমনই কিছু বলছিলেন।
এর পর মোটা মালাটি তিনি পরিয়ে দেন মার্টিনেজের গলায়, এইবারে আসল কাজ সাহেব। আমি সেই বেতালকে আহ্বান করব। তিনি আসবেন, তার হাতে তুমি এই শক্তিখণ্ড তুলে দিও। তারপর দেখি কে জেতে, শয়তানের ভবিষৎবাণী না আমার গুরুর আশীর্বাদ। তুমি কিন্তু এই আসন ছেড়ে উঠবে না, যতক্ষণ না বেতালের আবির্ভাব। ঘটে। বলে নিজে আসন থেকে উঠে দাঁড়ান।
এরপর দক্ষিণ দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন, থমকে দাঁড়ালেন, তারপর মৃদুকণ্ঠে। কয়েকটি মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। এরপর ফিরে এসে আসনে বসে আরও কিছু মন্ত্র বলতে বলতে আগুনের মধ্যে কিছু গুঁড়ো নিক্ষেপ করলেন। এরপর ফের উঠে দাঁড়িয়ে। পূর্বদিকে গেলেন, একই কাজের পুনরাবৃত্তি করলেন, ফের ফিরে এসে আসনে বসলেন।
এইভাবে চারদিকের জন্যে চারবার উঠলেন তিনি। এরপর এসে বসে, ঐং হী? ক্লীং শ্রীং ফট স্বাহা বলে মেরুদণ্ড ঋজু করে ধ্যানে বসলেন। নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা। করতে লাগলেন মার্টিনেজ, এরপর কী হবে?
আধঘণ্টা বাদে দূরে একটা বিদ্যুৎশিখা দেখতে পেলেন মার্টিনেজ। ঘননীল দীপ্তিময়। সেই শিখা, মনে হল যেন মন্দিরের সামনে নেমে এসেছে। কৃষ্ণানন্দ তৎক্ষণাৎ তার দিকে আঙুল তুলে বললেন তিষ্ঠ।আশ্চর্যের বিষয়, সেই আলোকশিখা যেন থিরবিজুরী হয়ে। সেখানেই অধিষ্ঠান করতে লাগল!
অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছেন মার্টিনেজ, হঠাৎ তিনি গুরুগুরু ডাকে সচকিত হয়ে উঠলেন। এ কী! বৃষ্টি হবে নাকি? এ তো মেঘের ডাক! ভাবতে ভাবতেই যেন আকাশ থেকে তার হাঁটু ঘেঁষে কী একটা গড়িয়ে পড়ল, মার্টিনেজ সভয়ে তাকিয়ে দেখলেন, একটা মানুষের পায়ের হাড়! এরপর শুরু হল হাড়বৃষ্টি! কাঁচা হাড়, শুকনো হাড়, কাটা আঙুল, মাথার খুলি, কানের টুকরো, কিছুরই আর কোনো বাছবিচার রইল না। একের পর এক সদ্যকাটা দেহাংশ মার্টিনেজের দেহের বিভিন্ন অংশে পড়তে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি সহ্য করতে লাগলেন। তার সারা দেহ রক্তে লাল হয়ে উঠল।
