কালভৈরবকে প্রসন্ন করে আমরা সেই মহান বেতালকে আহ্বান করব সাহেব। তুমি প্রস্তুত থেকো।
এই বলে ব্রাহ্মণ প্রথমে নিজের হাতের আঙুলগুলিকে বিচিত্র মুদ্রায় ধারণ করলেন। তারপর বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে সেই তামার পাত্র থেকে জল নিয়ে ছিটোতে লাগলেন চারিদিকে। তারপর তর্জনীর ডগায় লাল রঙের আর চন্দনের মিশ্রণ একসঙ্গে নেন তিনি। মধ্যমা আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে খানিকটা সেই চালের দানা আর তিনটে শিসওয়ালা ঘাসের টুকরো তুলে ধরেন। তারপর সেই মিশ্রণটি শক্তিখণ্ডটির মাথায় লাগিয়ে দেন, ছিটিয়ে দেন চাল ও ঘাসের টুকরো। তারপর গম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ। করতে থাকেন,
ভ্রাজচ্চণ্ডজটাধারং ত্রিনয়নং নীলাঞ্জনাদিপ্রভং,
দোর্দণ্ডাত্তগদাকপাল মরুণস্রদ্বগবস্ত্রোজ্জ্বলম।
ঘণ্টামেখলঘর্ঘরধ্বনিমিলজঝঙ্কারভীমং…
স্থির বসেছিলেন মার্টিনেজ। শরতের নির্মেঘ আকাশ। চারিদিকে ঝিরঝিরানি হাওয়া, গাছের পাতাগুলোয় ঝুমুরের আওয়াজ তুলছে। দূরদূরান্ত অবধি কেউ নেই। আকাশে দশমীর চাঁদ, অনেকটাই বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আলো বলতে চাঁদের মায়াবী নরম আলো আর সামনের এই অগ্নিকুণ্ডে জ্বলতে থাকা আগুন, যাতে মাঝেমধ্যে গাছের ছালের গুঁড়ো ফেলতে হচ্ছে মার্টিনেজকে। সামনে বসে থাকা লোকটি চোখ বুজে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করে চলেছে বিজাতীয় মন্ত্র সমূহ। লোকটিকে লক্ষ্য করেন মার্টিনেজ। এ তাঁর কেউ নয়, সম্পূর্ণ অনাত্মীয় একটি লোক। কে জানে কীসের কোন টানে তার বিপদকে নিজের বিপদ বলে টেনে নিয়েছে।
আধ ঘণ্টাটাক পর মার্টিনেজের মনে হয় চারিপাশে সামান্য ধোঁয়াটে অস্বচ্ছতার সৃষ্টি হয়েছে যেন। যেখানে তারা বসে আছেন, সেখান থেকে চার পাঁচ ফুট দূরে যেন। ধীরে ধীরে নেমে আসছে ভারী ধোঁওয়ার পর্দা। পরতে পরতে তার ঘনত্ব বেড়েই চলেছে। এত ধোঁওয়া এল কোথা থেকে? আশ্চর্য হলেন মার্টিনেজ। আশেপাশে কিছুই আর দেখা যায় না ঠিকঠাক, মন্দিরের অবয়বও এখন অস্পষ্ট… মাথার ওপর তাকালেন মার্টিনেজ… আকাশও প্রায় ঢেকে এসেছে… হঠাৎ হলটা কী? ভাবতে ভাবতেই মাথা নামালেন তিনি, আর তার হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে এল!
এই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অলৌকিক ভাবে তাদের মধ্যে আবির্ভাব হয়েছে এক প্রাণীর। একটি বিশালদেহী কুকুরের!
এই জীবনে ভয়ংকর কুকুর কম দেখেননি মার্টিনেজ। তিনি একজন আদ্যন্ত কুকুরপ্রেমী মানুষ। তার নিজের বাড়িতেই পাহারা দেয় দুটো ভয়ালদর্শন রটওয়েলার। এ ছাড়াও ব্যানডগ, ম্যাস্টিনো, ক্যানারিয়ান ম্যাস্টিফ, বুলম্যাস্টিফ, বা জাগুয়ার শিকার। করা ব্রাজিলিয়ান কুকুর ফিলা ব্রাজিলিয়েরো, কুকুর কম ঘাঁটেননি তিনি।এরা প্রত্যেকেই হিংস্র প্রজাতির কুকুর বলে অত্যন্ত কুখ্যাত। ডেঞ্জারাস ব্রিডের কুকুর ট্রেইন করে আনন্দ পান তিনি। কিন্তু তার সামনে যেটি বসে আছে, সেটি এতই ভয়ংকর দেখতে, এতই ভয়াবহ তার উপস্থিতি, যে একটু ভয় পেতে শুরু করলেন মার্টিনেজ।
কুকুরটা উচ্চতায় চার ফুটের কম হবে না, দৈর্ঘ্যে প্রায় ছয়ের কাছাকাছি–অনুমান করলেন মার্টিনেজ। কুচকুচে কালো গা আর চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল। সারা মুখে একটা উগ্র, জান্তব ক্রোধ ও ক্রুরতা মেশানো আছে। কুকুরটার মুখের দুপাশ দিয়ে একটু একটু করে লালা ঝরছে। এ কুকুর যদি পাগল হয়, ভাবতেই একফোঁটা ঘাম শিরদাঁড়া বরাবর নেমে গেল মার্টিনেজের! প্রাণীটার প্রতিটি নিঃশ্বাসে কাঁচা মাংস ও রক্তের গন্ধ! উহ, কী বীভৎস! যেন নরক থেকে উঠে এসেছে এই ভীতিপ্রদ জন্তুটা।
অথচ কুকুরটা কিন্তু কিছু করছে না। চুপ করে কৃষ্ণানন্দের সামনে থাবা পেতে বসে স্থির ভাবে লাল চোখ মেলে তাকিয়ে আছে সেই ব্রাহ্মণের দিকে। যেন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে গম্ভীর গলায় উচ্চারিত সেই সুরেলা আবৃত্তি।
ঠিক সেই সময় আরেকটা!
হুবহু অবিকল একইরকম আরও একটা ভয়ালদর্শন কুকুর ধোয়ার পর্দার মধ্যে থেকে এসে প্রথমটার থেকে একটু দূরে থাবা পেতে বসল। সেই এক দৃষ্টি, খরশান চোখে তাকিয়ে পণ্ডিতের দিকে!
এইবার সর্তক হয়ে উঠলেন মার্টিনেজ। যেটা ঘটছে, সেটা ঠিক স্বাভাবিক বুদ্ধির এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না, সেই নিয়ে সন্দেহ হতে থাকল তার। তিনি খেয়াল করলেন যে কুকুরদুটির নজর র ওপর একদমই নেই। তারা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। মন্ত্রকর্তার দিকে। [ এবং আরেকটা! আবার ধোঁওয়ার কুণ্ডলী থেকে আরেকটি কালান্তকদর্শন কুকুর এসে পণ্ডিতের পাশে বসল, পণ্ডিতের দিকে মুখ করেই।
এইবার ঘটনাটার অতিপ্রাকৃতিক দিক নিয়ে আর সন্দেহ রইল না মার্টিনেজের। তিন তিনটে এইরকম যমপুরীর প্রহরীর মতন ভয়াবহদর্শন কুকুর এখানে আসা আর চুপ করে বসে থাকা কিছুতেই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। উত্তেজনায় এবং বেশ কিছুটা ভয়ে তিনি স্থির কাষ্ঠপুত্তলিবৎ বসে রইলেন।
ওদিকে কৃষ্ণানন্দের কোনো হুশই নেই। তিনি চোখ বুজে উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করে যাচ্ছেন,
দেবরাজসেব্যমানপাবনাঙ্ঘ্রিপঙ্কজম
ভালযজ্ঞসূত্রমিন্দুশেখরং কুপাকরম।
নারদাদিযোগীবৃন্দবন্দিতং দিগম্বরং
কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবম ভজে।।
এর পরে আরও একটা!
একাদিক্রমে ছটা সেই বিশাল আকারের ভয়ালদর্শন কুকুর তাদের ঘিরে বসল। তাদের নিঃশ্বাসের আওয়াজ প্রতি মুহূর্তে ভয় ধরিয়ে দিতে লাগল মার্টিনেজের মতন শক্ত স্নায়ুর লোককেও। কাঁচা রক্ত মাংসের বমনোদ্রেককারী গন্ধে ভরে উঠেছে চারিপাশ। তাদের শ্বাসের ভারী শব্দে যেন চারিপাশের আবহাওয়াও ভয়ে সিটিয়ে আছে। মার্টিনেজ বসে আছেন চিত্রার্পিতের মতন, খুব সাবধানে শ্বাস নিচ্ছেন। ভয়ে ও উত্তেজনায় তার শরীর থেকে স্বেদবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে নীচের দিকে, ঘামে জবজবে ভিজে যাচ্ছেন তিনি। আড়চোখে নিজের হাতের দিকে তাকান তিনি, প্রতিটি রোম দাঁড়িয়ে আছে!
