গতকালই এদিকে এসেছিলেন কৃষ্ণানন্দ, দেখে গেছিলেন রাস্তাঘাট। গ্রামের বাইরের খুঁড়িপথটি ধরে ছোটো জঙ্গল পেরিয়ে দ্রুত পায়ে চলে এলেন মন্দিরের একেবারে সামনে।
আজ এই চত্বর একদম শুনশান। দূরে কোনো ময়দান থেকে ঢাক ঢোল আর হইচইয়ের মৃদু আওয়াজ আসছে। একটু পরেই শুরু হবে দশেরার রাবণ পোড়ানো। তারপর সারা রাত ধরে যাত্রা হবে পৌরাণিক আখ্যান নিয়ে। সমস্ত গ্রাম ঝেটিয়ে সেখানে গিয়ে তামাশা দেখতে হাজির, এইদিকে এখন দূরদূরান্ত অবধি জনমানব নেই।
মন্দিরটি ছোটোখাটো, ভারতের অগুনতি মন্দির যেমন হয় তেমনই। পোড়া ইটের মন্দির, মাথার ওপরে টালি দেওয়া। মন্দিরটা আবার দোতলা। দ্বিতীয় তলার। মাথাতেও টালির আচ্ছাদন। চারিপাশে বিভিন্ন ফুলের আর ফলের গাছ লাগানো, তার কোনোটাকেই চেনেন না মার্টিনেজ। সামনের চত্বরটা সম্পূর্ণ খালি আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
মন্দিরের প্রধান দরজা থেকে বেশ কিছু দূরে একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলেন মার্টিনেজ। সংবিৎ ফেরে সেই ব্রাহ্মণের কণ্ঠস্বরে। কৃষ্ণানন্দ ডাকছেন তাঁকে। ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন তিনি এবং একটি সাদা বস্ত্রখণ্ড তুলে দেন মার্টিনেজের হাতে। গম্ভীর গলায় বলেন, বাকি সমস্ত পোশাক ছেড়ে এই কাপড়টা পরে নাও সাহেব। আর সেই শক্তিখণ্ডটি সঙ্গে এনেছ তো? ওটিকে হাতে নিয়ে এসে বসো আমার সঙ্গে। এই বলে তিনি ফিরে যান।
আদেশ পালন করেন মার্টিনেজ। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে যান সামনের দিকে।
কৃষ্ণানন্দ তখন মন্দিরের প্রধান দরজা থেকে প্রায় কুড়ি ফুট দূরে মন্দিরের দিকে মুখ করে, দক্ষিণাস্য হয়ে একটি কুশাসনের ওপরে বসেছিলেন। পাশে আরেকটি কুশাসন রাখা ছিল। হাতের ইশারায় তিনি মার্টিনেজকে সেই আসনের ওপর পূর্বাস্য হয়ে বসতে বলেন। সামনে একটা মাটির পাত্রে আগুন জ্বলছিল, আর তার পাশে মাটিতে পেতে রাখা কাগজের ওপর স্তূপ করে রাখা ছিল কিছু গাছের ছালের গুঁড়ো।
ভয় পেও না সাহেব।আজ তুমি এমন অনেক কিছুই দেখবে, বা শুনবে যা তোমার বোধবুদ্ধিযুক্তির অতীত। তাতে কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত হবে না, ভয় পাবে না। ভয়। পেলেই কিন্তু মহাসর্বনাশ। জানবে যা দেখছ সব মায়া। কিছুই সত্যি নয়।
এই বলে পাশে রাখা পাত্র থেকে খানিকটা জল অঞ্জলিবদ্ধ হাতে নেন আগমবাগীশ, বিড়বিড় করে তিনবার মন্ত্রোচ্চারণ করেন আর তারপর জলকে ভূমিতে ফেলে দেন। এই কাজ তিনবার করার পর সামনে একটি বড় সবুজ পাতা বিছিয়ে রাখেন। কোন গাছের পাতা, সেটা চিনতে ভুল হয় না মার্টিনেজের। ব্যানানা! দিস ইজ ব্যানানা লিফ।
সেই পাতার ওপর প্রথমে গাঢ় লাল রঙের কী একটা খানিকটা লাগিয়ে রাখেন তিনি। নিশ্চয়ই ভার্মিলিয়ন পেস্ট, ভাবেন মার্টিনেজ। তারপর সাদা রঙের একটুখানি সান্দ্র তরল রাখেন। তার সুন্দর গন্ধেই প্রকাশ পায় যে সেটা কীসের মিশ্রন, চন্দন! এরপর রাখেন জলে ধোওয়া একমুঠো চাল, তিনটি শিস আছে এমন দেখতে একরকমের রাস কিছুটা, বেশ কয়েকটা রেড হিবিসকাস ফুল আর একটা মালা। মোটা করে গাথা মালা। তাতে প্রচুর রকমের ফুল আছে, যার অর্ধেক মার্টিনেজ চিনতেই পারলেন না! আর পাটির ওইপাশে নৌকার মতন দেখতে একটি তামার তৈরি জলপূর্ণ পাত্র।
শক্তিখন্ডটি এই পাতার ওপর রাখো সাহেব।
ধীরে ধীরে হাতের মুঠো খুলে সেই ঘনকৃষ্ণ শক্তিপীঠটিকে পাতার মধ্যিখানে রাখেন মার্টিনেজ। আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয় যেন তার চারপাশের পৃথিবীটা অকস্মাৎ একটু দলে উঠেই স্থির হয়ে গেল। যেন এতদিন একটা বিশাল বড় গিয়ারহুইলের একটা ছোট্ট ঘাট ঠিকঠাক লাগছিল না। এক্ষুণি যেন হাতুড়ির একটা ছোটো ধাক্কায় সেটা ঠিক বসে গেল, বহুকষ্টে যেন এক প্রাচীন যন্ত্র ধীরে, অতি ধীইইইরে চলতে শুরু করল।
শোনো সাহেব। এই আসন মন্ত্রসিদ্ধ আসন। যতক্ষণ তুমি এখানে বসে আছো কোনো মানুষ, ভূত, প্রেত, যক্ষ, রক্ষ, দানব কেউ তোমার একগাছি চুলও ছুঁতে পারবে না। যা খুশি হোক, দুনিয়া এদিক থেকে ওদিক হয়ে যাক, চন্দ্রমণ্ডল মাটিতে খসে পড়ুক, ভূমিকম্প হোক, সমুদ্র গ্রাস করতে আসুক, ধেয়ে আসুক দাবানল, কিছুতেই তুমি এই আসন ছেড়ে উঠবে না। যতক্ষণ তুমি এই আসনে বসে আছো, স্বয়ং যমরাজেরও সাহস নেই যে তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করেন। আর শোনো, এই যে দেখছ আগুন জ্বলছে, কিছুতেই যেন এ নিভে না যায়। নিভু নিভু হয়ে এলেই এই গুঁড়ো ছিটিয়ে দেবে। এই চলবে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হয়।
প্রক্রিয়া কখন শেষ হবে পণ্ডিত? এতক্ষণে কথা বলেন মার্টিনেজ। শান্ত সমাহিত কণ্ঠস্বর, কোনও আবেগের বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস নেই। ঠিক যে তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার আবেগহীন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অ্যাকশনে নামেন মার্টিনেজ, ঠিক সেরকমই ঠান্ডা মাথায়, শান্তচিত্তে, খোলা তরবারির মত শিরদাঁড়া সটান করে কুশাসনে বসে আছেন ইওরোপের ইস্পাত, কর্নেল মার্টিনেজ ভাজ!
আমরা প্রথমে কালভৈরবের আরাধনা করব সাহেব। তিনি সমস্ত ভীরুতা নাশ করেন, সমস্ত ক্ষুদ্রতার বন্ধন ছিন্ন করেন। ইনি সময়ের রক্ষাকর্তা, সৃষ্টি ও প্রলয়ের চাবিকাঠি এঁরই হাতে। কালভৈরব অজ্ঞানপাশ ভেদ করেন ও বোধিচিত্ত জাগ্রত করেন, সাধককে দান করেন বরাভয়, দেখিয়ে দেন অভীষ্ট সিদ্ধির পথ।পিনাকপাণি মহাদেবের ক্রোধ থেকে এঁর উৎপত্তি। ইনি প্রসন্ন হলে আর ভয় নেই সাহেব, দেবাদিদেব স্বয়ং প্রসন্ন হলে স্বর্গ, মর্ত্য কী পাতাল, সমস্ত ভয় থেকে তুমি মুক্ত, বেতালের প্রতিশোধস্পৃহা থেকে তুমি মুক্ত।
