এই পরীক্ষায় তাকে জিততেই হবে, দাঁতে দাঁত চেপে ভাবে সে। ভাঁজ পরিবারের। রক্ষার একমাত্র উপায় তার কাছে, এমনটাই বলেছে জর্জি। যদিও শুধু তার কাছেই কেন সেটা তখনও বোঝেনি লিও। কিন্তু এত বড় দায়িত্ব সে ছেড়ে যেতে পারে না। কিছুতেই না। এত ঠান্ডাতেও তো মানুষ বাঁচে, বাঁচে না? এই কিছুক্ষণের কষ্ট সহ্য করতে পারবে। না সে? তারই কত না পূর্বপুরুষ প্রাণ দিয়েছেন মৃত্যুর দেবতার হাতে? তাদের নামে, তাঁদের স্মরণে কিছু করতে পারবে না লিও, লিওনার্দো ভাজ?
শরীরের সমস্ত শক্তি, মনের সমস্ত ক্ষমতা, স্নায়ুর সমস্ত ইচ্ছা সংহত করে সাঁতার দেওয়া শুরু করল লিও।
প্রায় দশ মিনিট পর যখন তীরে উঠে থরহর কাঁপছে সে, ঘুরে একবার নৌকার দিকে তাকাল। তাকাল আর স্থির হয়ে গেল।
সারা দিগন্ত জুড়ে এখন ভূতুড়ে ছায়ার খেলা। হ্রদের ওপারে সেই বিশাল হোলার। চার্চ, দাঁড়িয়ে আছে স্থবির বিভীষিকার মতন। দশমীর চাঁদ সরে এসেছে অনেকটা। দিগন্তের প্রায় অন্যদিকে। তার ক্ষীণ আলোয় যা দেখল লিও, সম্ভবত শেষ বিচারের দিন অবধি তার মনে থাকবে। নৌকার চারিদিকে তৈরি হয়েছে অজস্র ছোটোবড়ো ঘূর্ণি। আর সেই ঘূর্ণি থেকে উঠে আসছে শত শত জীবন্ত লতানে কী যেন। পাতালের কোন অতল থেকে ক্রমাগত উঠে আসছে সেইসব শুকনো শিকড়ের মতো জীবন্ত লতানে অভিশাপ…
লতা? না তো… লতা কই… ওসব তো…।
সহসা শিহরিত হয়ে উঠল লিও। দেখতে পেয়েছে সে, এইবার দেখতে পেয়েছে। সে। কিন্তু যা দেখেছে সেটা তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। এই পৈশাচিক দৃশ্য তাকে দেখতে হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি!
যেগুলোকে সে ভূতুড়ে লতা ভেবেছিল, সেগুলো আসলে হাত! শত শত কালো, শীর্ণ, অস্থিসর্বস্ব সেইসব হাত, আর হাতের আঙুল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে সেই ক্ষুদ্র নৌকাটিকে, আর প্রবল আকর্ষণে চাইছে টেনে নিয়ে যেতে। নিয়ে যেতে চাইছে জলের তলায়, অতল গাঢ় নিঃসীমে।
দৃশ্যটা আমূল নাড়িয়ে দিল লিওকে। শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রার জলে সাঁতরে আসার যাবতীয় কষ্ট ভুলে গেল সে।নির্নিমেষে সে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।
যেন নরকের রসাতল থেকে উঠে আসছে প্রেতেদের সর্বগ্রাসী খিদে, উঠে আসছে। তারা সাপের মতন, অভিশপ্ত লতার মতো। শয়ে শয়ে তারা উঠে আসছে সেই কালো জলের অতল থেকে। শীর্ণ বুভুক্ষু শিকড়ের মতো তাদের আঙুলগুলো একের পর এক পেঁচিয়ে ধরছে সেই ক্ষুদ্র নৌকাটিকে। শখানেক ভৌতিক হাত উঠে এসেছে নৌকার ওপরেও, তারা মরণপাশে জড়িয়ে ধরেছে জর্জির পা, সমগ্র নিম্নাঙ্গ। ক্রমেই তাদের সেই মৃত্যুবাঁধন আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে, জড়িয়ে থাকে এমনভাবে যেন জর্জির শরীর আর সেই নৌকা এখন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা। মৃত্যুর এই নিবিড় বাঁধন থেকে রক্ষা নেই, রক্ষা নেই কারও।
আস্তে আস্তে ডুবতে থাকে সেই নৌকা। বিষাক্ত সাপের মতন হিংস্র হাতগুলো যেন আরও সজীব, আরও হিংস্র হয়ে ওঠে, যেন স্পষ্ট করে তাদের নারকীয় উল্লাসের শব্দ শুনতে পায় লিও। তার সমগ্র আত্মা থরথর করে কেঁপে ওঠে এই দৃশ্য দেখে।
আর জর্জি?
ডুবে যাওয়ার শেষ মুহূর্ত অবধি নৌকার মাঝখানে বীরের মতন দাঁড়িয়েছিল সে। সমগ্র নৌকা আর কোমর অবধি তার শরীর তখন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। হাত দুটো ওপরের দিকে তোলা ছিল তার, যেন নিজের ঈশ্বরের কাছে শেষবারের মতো প্রার্থনা জানাচ্ছে সে। প্রার্থনা জানাতে জানাতেই, দশমীর চাঁদকে সাক্ষী রেখেই, লিওর আতঙ্কিত চোখের সামনেই নৌকাশুদ্ধ জলের নীচে তলিয়ে গেল জর্জি। ভাঁজ পরিবারকে মুক্তির আলো দেখানো জর্জিনহো ভাজ।
.
২০১৬। বারো অক্টোবর, দশমী। আমোনা গ্রাম, বেতাল মন্দির, গোয়া।
গতকাল সকালেই দুজনে ফ্লাইটে করে চলে এসেছেন গোয়া।উঠেছেন উত্তর গোয়াতেই, ক্যালাঙ্গুট বিচের কাছে। পোর্তুগীজ কনস্যুলেটের একটা পার্মানেন্ট গেস্ট হাউস আছে এখানে।
কাল সারা সকাল ধরে তাঁর এই গোয়া অভিযানের যাবতীয় ইতিবৃত্ত এই পণ্ডিতকে বলেছেন মার্টিনেজ। জানিয়েছেন সব কথাই, একটা কিছু বাদ দেননি। বর্ণনা করেছেন ইনকুইজিশনের নামে মিগুয়েলের হত্যাকাণ্ডের কথা, জানিয়েছেন সেই প্রাচীন অভিশাপের ইতিবৃত্ত। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিবৃত করেছেন মিগুয়েলের ডায়েরি আর অনুতাপে দগ্ধ হওয়ার কথা বলেছেন মিগুয়েলের শয়তান আরাধনার কথাও। লিওনার্দোর ডিক্লারেশন প্রায় হুবহু বিবৃত করেছেন, জানিয়েছেন ফার্নান্দোর সঙ্গে মার্টিনেজের এই বিষয়ে বিশদ আলোচনার ইতিকথা। সব কথাই খুলে বলেছেন তিনি, কিছুই গোপন করেননি।
আর বলেছেন তিয়াগোর কথা। তার ধুঁকতে থাকা হৃৎপিণ্ডটার কথা, যাকে তিনি সেই সুদূর লিসবনে মিজেরিকদিয়া হাসপাতালের বিছানায় রেখে এসেছেন।
আশ্চর্য জীবনীশক্তি এই ভারতীয় ব্রাহ্মণের, অবাক হয়ে ভাবেন মার্টিনেজ। কাল এসে দুপুরের পরেই তিনি উধাও হয়ে গেলেন কোথায়। তারপর এসে উদয় হলেন বিকেল নাগাদ। নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে কী সব যেন করেন, ফের কোথায় বেরিয়ে যান তিনি। ফিরেছেন অনেক রাত করে, ততক্ষণে মার্টিনেজ ঘুমিয়ে কাদা।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই পণ্ডিতের ঘরে ডাক পড়ে মার্টিনেজের। সেখানেই আজকের রাতের এই অভিযানের প্ল্যান চূড়ান্ত করা হয়। এ জায়গাটা ক্যালাঙ্গুট থেকে একটু দূর, প্রায় ঘণ্টাদেড়েকের রাস্তা। সময়টাও সন্ধের শেষের দিকে। গাড়িটা বেশ খানিকটা দূরেই রেখে আসতে হয়েছে, কারণ গ্রামের মধ্যে গাড়ি নিয়ে ঢুকে অযথা লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মানেই হয় না। ড্রাইভার অবশ্য মৃদু আপত্তি তুলেছিল, ওদিকে বিশেষ কিছুই দেখার নেই– এই ছিল তার বক্তব্য। তাকে কিছু এক্সট্রা পয়সা দেওয়ার কড়ারে চুপ করিয়ে রেখে দুজনে পায়ে হেঁটে এসেছেন এতটা।
