এতটা লিখে চুপচাপ বসে থাকে লিও। বন্ধ দরজার ওদিকে বয়ে যাচ্ছে ক্লান্তিকর জীবন, ঘরের মধ্যে ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে মাসখানেক আগেই ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ রাতের কথা মনে করে লিও।
সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর দুজনে ছোট নৌকাটি করে ফিরে আসছিল এপারে। আসার সময়ে খুবই অস্থির লাগছিল জর্জিকে, ক্রমশ ছটফটানি বেড়েই চলেছিল তার। দেখে একটু আশ্চর্যই হয়েছিল লিও, কাজ তো হয়েই গেছে। এই তো আর কিছুক্ষণ, তার পরেই তো তীরে পৌঁছবে নৌকা। এতেই এতো ভয় পাওয়ার কী আছে?
কালো ভারী সীসার মতন নিস্তরঙ্গ জল। জল শেষ হলে মাটি। মাটি শেষ হলে দিগন্ত। দিগন্তে মিশেছে তারায় ভরা আকাশ। থেকে থেকেই সেদিকে চোখ চলে যাচ্ছিল লিওর। আহা, কী অপরূপ দৃশ্য! যেন রেশমি মখমলের চাদরে কেউ অকাতরে ঢেলে দিয়েছে ছোটবড় হিরের কুচি। এই কদিনে লিওকে অনেক নক্ষত্রমণ্ডল চিনিয়েছে জর্জি। বৈঠা টানতে টানতে আকাশের দিকে তাকিয়ে সেইসব নক্ষত্রদের চিনে নেওয়াটা একবার ঝালিয়ে নিচ্ছিল লিও। তারপর কিছু একটা বলার জন্যে মুখ নামিয়ে জর্জির দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় সে।
বৈঠা টানছে বটে জর্জি, কিন্তু তার চোখেমুখে এক অসম্ভব অস্থির আতঙ্ক ছড়িয়ে। আছে যেন। এদিকেওদিকে তাকাচ্ছে বারবার, উদভ্রান্ত চোখে লিওকে দেখছে, আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। অবাক হয়ে সেদিকে চাইতেই আশেপাশে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখে আপনা থেকেই থেমে গেল লিও।
নৌকাটা তীর থেকে আর বেশি দূরে নয়, আশি নব্বই গজ হবে মাত্র। লিও তাকিয়ে দেখলো তাদের নৌকা ঘিরে ছোট বড় বিভিন্ন আকারের বুড়বুড়ি উঠতে শুরু করেছে হ্রদে। তার মধ্যে কয়েকটা রীতিমতো বড় হওয়া শুরু করেছে। সেদিকেই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল লিও। তারপর একটা জিনিস দেখে কী যেন একটা মাথায় ঘাই মারতে লাগল তার…
গাঢ় কালো রঙের তরল যেন ফুটতে ফুটতেই একটু করে সরে যাচ্ছে। আর তার যায়গায় জেগে উঠছে ছোট্টছোট্ট ঘূর্ণি। প্রথমে ধীরে এবং পরে দ্রুত সেই ঘূর্ণিগুলো বড় হয়ে উঠছে আর তৈরি করছে নানা আকারের ঘূর্ণিস্রোত!
এতক্ষণে মুখে খুললো জর্জি, বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, কঁপ দাও, এক্ষুনি জলে ঝাঁপ দাও লিও… আর সময় নেই… ঝপাও… এক্ষুনি…
হতভম্ভ হয়ে গেল লিও। সেপ্টেম্বর মাসে এই বরফঠান্ডা জলে ঝাঁপ দেওয়ার মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ডেকে আনা। জর্জি কি পাগল হয়ে গেছে? জেনেশুনে লিওকে এর মধ্যে ঠেলে দিতে চাইছে? আর হয়েছেই বা কী? এসব ছোট ছোট ঘূর্ণি নানা কারণে আসেই… নৌকা তো আর বেশি দূরে নেই, নব্বই গজ হবে বড়জোর।দুই ভাইতে মিলে জোরে বৈঠা টানলে আর কতক্ষণ… ভাবতে ভাবতেই ছোট নৌকাটা একবার সজোরে দুলে উঠল। দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো জলেই পড়ে যেত দুজনে। মনে হল জলের নীচে কে যেন দুহাতে নৌকাটা ধরে সজোরে একবার ঝাঁকিয়ে দিল। আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠলো জর্জি, ঈশ্বরের দোহাই লিও, ঝাঁপ দাও এক্ষুনি। তীরে পৌঁছাবার আগে এদিকে তাকাবে না। কথা দাও তুমি, কথা দাও।
হাঁ করে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকে লিও। ঘণ্টাখানেক আগেই মৃতদের জগৎ জাগিয়ে তুলেও কুশলী ও স্থিতধী ছিল যে লোকটা, তার সঙ্গে এই জর্জির কোনো মিলই নেই। অজানা আতঙ্কে ও উত্তেজনায় কাঁপছে লোকটা। লিওর দিকে তাকিয়েই আরেকবার চিৎকার করে উঠল সে, এই হারামজাদা, কথা শুনতে পাচ্ছিস না? ঝাঁপ মার, এক্ষুণি জলে ঝাঁপ দে তুই…
অত্যন্ত অবাক হয়ে এই রেগে যাওয়া, কুবাক্য উচ্চারণ করা অসংলগ্ন ও উত্তেজিত লোকটাকে দেখছিল লিও। না, হতে পারে না, এই লোকটা তার দাদা হতেই পারে না…
ভাবতে ভাবতেই আবারও নৌকাটা ফের ভয়াবহ ভাবে দুলে ওঠে। কোনোরকমে দুহাতে নৌকোর দুপাশ ধরে নিজেকে সামলায় লিও। তার হাত থেকে বৈঠাটি জলে পড়ে যায়, এবং মুহূর্তেই একটি বড় আকারের ঘূর্ণির মধ্যে তলিয়ে যায় । এইবার ভয় পেয়ে যায় সে, হে ভগবান, এটা আবার কী? এবার কী করে…
নাম শুয়ার, জলে ঝাঁপ দে এক্ষুনি, নইলে তোর মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বার করে দেব বেজন্মার বাচ্চা, বলতে বলতে উন্মত্তের মতো নিজের হাতের বৈঠাটি মাথার উপর ধরে তেড়ে আসে জর্জি। সেই হিংস্র লোকটাকে দেখে ভয় পেয়ে যায় লিও। বলা যায় না, সত্যিই হয়তো মাথায় মেরে দেবে লোকটা… তা ভাবতে ভাবতেই তৃতীয় ঝাঁকুনি, আরও প্রবল এবং ভয়ংকরতম। নৌকাটা প্রায়। উল্টেই যেত, জর্জিও প্রথমে বসে পড়ে। তারপর ফের পাগলের মতো উঠে দাঁড়ায় হাতে বৈঠা নিয়ে, চোখেমুখে সেই উন্মাদ আগ্রাসী ভঙ্গি। দ্বিবিধ আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে নেহাত বাধ্য হয়েই বাইরের কোটটা রেখে জলে ঝপ মারে লিওনার্দো।
এবং প্রায় জমে যায়। আর মাস দুয়েকবাদে হয়তো জল বরফ হতে শুরু করবে এই এলাকায়। সেই বরফঠান্ডা জলে প্রথম ঝাঁপটা দিতেই যেন মনে হল হাজার মোটা দাগের বল্লম দিয়ে কেউ খোঁচাচ্ছে লিওকে। কয়েক গজ সাঁতার কেটেই বুঝলো লিও, হাত পা অসাড় হয়ে আসছে তার। দাঁতে দাঁতে লেগে ঠকঠক করে কঁপছিল সে। সারা রাত ধরে যা যা হয়েছে, তাতে তার স্নায়ুকোষের ওপর যথেষ্টরও বেশি অত্যাচার হয়েছে। তার শরীরমন আর বিশেষ কিছু ধকল নিতে পারছিল না। ভেবেছিল সেসবের পালা। বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ভুল ভেবেছিল সে, এইবার তার শারীরিক ও মানসিক সহ্যশক্তির চরমতম পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়েছে।
