দিয়েছে নয়, দিয়ে গেছে!
ধক করে বুকের ব্যথাটা আবার চাগাড় দেয় লিওর, কিন্তু দমে না সে। কালির দোয়াতে খাগের কলমটা ডুবিয়ে তরতর করে লিখে যেতে থাকে।
দুপুরের গায়ে নেমে আসে বিকেলের আঁচল। সোনালি নরম রোদ লুটিয়ে পড়ল ভাঁজ পালাসেতের বাগানে, বারান্দায়। আকাশের নীল থেকে চোখ সরে না, এতই মায়া জড়িয়ে আছে সেখানে। মাঝে মাঝেই লেখা থামিয়ে সেদিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকছিল লিওনার্দো।
সন্ধের মুখে পরিচারক এসে ফায়ারপ্লেসে আগুন দিয়ে যেতেই একটু ওম বাড়ে তাতে বেশ আরাম বোধ করে লিও। লিখতে লিখতেই থেমে যায় মাঝে একবার, তারপর ফের চালু হয় তার কলম,
অতঃপর সেই রক্তবর্ণ মেঘপুঞ্জ থেকে উচ্চারিত হইল, হে মানবপুত্র, বলো কী জানিতে চাও? জর্জিনহো আভূমি প্রণত হইয়া অভিবাদন করিয়া কহিল, হে প্রভো। সবই তো আপনার অবগত। ইহাও আপনার অবিদিত নহে যে কোন নিয়তি কর্তক আদিষ্ট হইয়া এক্ষণে উপস্থিত হইয়াছি। হে প্রভু, অদ্য অনুরোধ এই যে, দুইশত বৎসর। ব্যাপী যে অভিশাপ আমাদিগের পরিবারের উপর পক্ষ বিস্তার করিয়া আছে, উহার স্বরূপ বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করিয়া অধমকে বাধিত করুন। অতঃপর উহা হইতে পরিত্রাণের পথ নির্দেশ করিয়া এই অধমকে চিরন্তন কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করুন।
সেই মেঘপুঞ্জ হইতে ধ্বনি নির্গত হইল, শোন হে মানব। যাঁহাকে সপরিবারে ধ্বংস করিয়া তোমার পূর্বপুরুষ এই অভিশাপের করালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন, তিনি ঈশ্বরের অনুগৃহীত এক মহাশক্তিধর পুরুষ ছিলেন। তাহার কাছে রক্ষিত যে বস্তুটির জন্যে এত বীভৎস রক্তপাত, এত অমানুষিক নিষ্ঠুরতা, সেটি একটি অসামান্য দৈবী। শক্তির আধার, উহার নাম সৃষ্টিবিন্দু।উহা পৃথিবীর আদিতম শক্তির ভাণ্ডার, আদিমতম শক্তির জন্মচিহ্ন। উহার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, আদি নাই, অন্ত নাই, সৃষ্টি নাই, লয় নাই। সৃষ্টির প্রথমে যখন স্থান ও কাল কিছুই ছিল না, চৈতন্যের আদি ও অন্ত ছিল না, তৎকালে ঈশ্বরীয় ইচ্ছায় অকস্মাৎ সময় ও শক্তির উদ্ভব ঘটে। সেই আদিশক্তির উৎস বীজাকারে এই সৃষ্টিবিন্দুতে সন্নিহিত আছে।যে পরাশক্তি ও অপরাশক্তি যুগ্মভাবে এই সৃষ্টির প্রাণ ও চৈতন্য আনয়ন করিয়াছে, উহারা দুইটি ক্ষুদ্র রক্তবর্ণ সর্পের আকারে এই দৈবী খণ্ডের মধ্যে যোগনিদ্রায় শায়িত। উহাদের জাগ্রত করিলে মহাপ্রলয় উপস্থিত হয়, ঈশ্বরীয় ত্রাসদল সংহারমূর্তি ধরিয়া এই জগতকে গ্রাস করেন।
আদিকাল হইতে জ্ঞানী ঋষিরা ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ প্রাপ্তিপূর্বক এই শক্তিবিন্দুটিকে লোকচক্ষু হইতে সুরক্ষিত রাখিবার প্রযত্ন করেন। সেই হেতু শতাব্দীপ্রাচীন আধিদৈবিক তন্ত্রমন্ত্রাদি দ্বারা উহাকে আচ্ছাদিত করেন, উহাকে স্থায়ী যোগস্থিতিতে নিবিষ্ট করেন। তোমাদিগের সেই পূর্বপুরুষ স্বীয় ক্ষুদ্র বাসনাপূরণের নিমিত্ত এই যোগস্থিতি বিনষ্ট করিতে উদ্যত হয়েন, অকারণ নিষ্ঠুরতার সহিত কয়েকটি নিরীহ মানুষকে বধ করেন। সেই হেতু অসহ ক্রোধাগ্নিতে উন্মত্ত হইয়া এই ভয়ানক নরকাভিশাপ প্রদান করেন সেই অসামান্য শক্তিধর পুরোহিত। অভিশাপ প্রদানকালে অন্য কোনও আধার অনুপস্থিত থাকিতে তিনি নিজ পুত্রহননসঞ্জাত যাবতীয় ক্রোধ উপস্থিত নরকরাজ বেতালের মধ্যে। সঞ্চারিত করেন। সেই হইতে মৃত্যুর রাজা অদ্যাবধি তোমার পরিবারের প্রথম পুরুষদের সংহার করিয়া ফিরিতেছে।
শুনিয়া ভয় ও আতঙ্কে আমার অন্তর শীতল পাষাণবৎ স্থবির হইয়া আসিতেছিল। জর্জি কিঞ্চিদধিক কাল স্থাণু রহিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, এই মহাশাপ খণ্ডনের উপায় কী প্রভু?
সেই মেঘপুঞ্জ হইতে সেই গম্ভীর এবং অলৌকিক স্বর ধ্বনিত হইল, অদ্য হইতে আনুমানিক তিনশত বৎসর পশ্চাৎ তোমার পরিবারে এক অসীম সাহসী, জিতেন্দ্রিয়, পরোপকারী, অদ্ভুতকর্মা বীরশ্রেষ্ঠর আবির্ভাব হইবে। সেই পুণ্যকর্মা বীর নিজ সন্তানের প্রাণহানির শঙ্কাহেতু এই বিশালকর্মে ব্রতী হইবে। তৎকালে এক বিশেষ ক্ষণে পাঁচশত বৎসর পূর্বেকার নক্ষত্রাদি পুনরায় একত্রিত হইবে, পৃথিবী হইতে মহাকাশ অবধি স্থাপিত হইবে অদৃশ্য আধিভৌতিক যোগাযোগ। শিকারের সন্ধানে প্রাচীন প্রেতের দল নরক হইতে উঠিয়া আসিবে। নক্ষত্রমালা উৎক্ষিপ্ত হইবার উপক্রম হইবে, পাতালের রক্ত ও বসাপায়ী লোলুপ আত্মাদের অস্থি ও মাংস পুনর্বার জাগ্রত হইবে। জাগ্রত হইবে দশদিকের দিকপালের দল, মূর্তি পরিগ্রহ করিবে মৃত্তিকাসঞ্জাত পাপসমূহ। সেই রাত্রে আকাশ হইবে রক্তচক্ষু, বাতাস হইবে পূতিগন্ধময়।
তকালে সেই সাহসী পুরুষের সম্মুখে স্বয়ং মৃত্যুর দেবতা জাগ্রত হইবেন। সেই বিশেষ নক্ষত্রকালে যদি তোদের উত্তরপুরুষ যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে সৃষ্টিবিন্দুটি প্রত্যর্পণ করিতে পারে, তবেই সেই অভিশাপ প্রত্যাহৃত হইবে, তৎপরবর্তী উত্তরপুরুষেরা পাপমুক্ত হইবে।তদনন্তর, সেই মৃত্যুর দেবতা তোদের সেই পুরুষের প্রাণহরণ করিবেন, উহাই হইবে এই মৃত্যুপূজার শেষ বলি।
কিয়ৎক্ষণের স্তব্ধতার পর পুনরায় উচ্চারিত হইল,
কিন্তু ইহা একমাত্র তখনই সম্ভব হইবে, যখন ঈশ্বরী শক্তিতে বলীয়ান কোনও তন্ত্রসাধক তোর সেই উত্তরপুরুষের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইবেন। ইহা ভিন্ন পাতাল হইতে নক্ষত্রলোকের পথ উন্মুক্ত করিবার আর কোনো উপায় নাই। একমাত্র কোনো সিদ্ধ সাধকই তাঁহার দৈবী ক্ষমতার প্রয়োগ করিয়া মৃত্যুর দেবতাকে আহ্বান করিতে পারেন। ইহা ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নাই, নাই, নাই।
