জর্জি বাইবেল আওড়াচ্ছে বটে, কিন্তু সে অন্য বাইবেল! বাইবেলে শ্লোকে যেখানে যেখানে ঈশ্বরের প্রশংসা আছে, সেখানে সেখানে সে ঈশ্বরের জায়গায় শয়তানের উল্লেখ করছে। ঈশ্বরের আরাধনাকে জর্জি শয়তানের আরাধনার মন্ত্রে পরিণত করছে!
সাপ যেমন বেদের বাঁশি শুনে স্থির হয়ে থাকে, ঠিক সেই ভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল লিও। আস্তে আস্তে সমগ্র দৃশ্যপটের মধ্যে কী যেন একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ করে লিও। কী সেটা ঠিক করে বোঝে না সে, শুধু মনে হয় চারিপাশ যেন সামান্য ঘোলাটে হয়ে গেছে, যেন একটু অপরিষ্কার। মনে হয় চারিপাশে যে পরিষ্কার দৃশ্যমান এতক্ষণ বজায় ছিল, তাতে যেন সামান্য অন্ধকারের পোঁচ লেগেছে। মানে আশেপাশের দৃশ্যগুলি আগের মতন অত উজ্জ্বল বা ধারালো নয়। শীতের মধ্যেও যেন খুব সামান্য হলেও সোঁদা জলীয়ভাব এসেছে চারিপাশে। আকাশের তারাগুলোও আগের মতন অত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না।
এই ব্যাপারটা ক্রমে একটু করে বাড়তেই থাকে। ক্রমশই যেন একটা বদ্ধ সোঁদা। গন্ধ ছেয়ে ফেলে চারিদিক। দৃষ্টি যেন আরও অপরিষ্কার হয়ে আসতে থাকে লিওর, সব কিছু খুব ঘোলাটে মনে হয়। শুধু দূরে সেই অগ্নিকুণ্ড এখনও জ্বলছে আর জর্জির প্রদক্ষিণরত অবয়ব এখনও নজরে পড়ছে লিওর…।
ভাবতে ভাবতেই তার সামনে ঠিক তিন থেকে চারফুট দূরে একটা সমাধিফলক নীচের থেকে সামান্য নড়ে ওঠে!
পাথরের মূর্তির মতন আস্তে আস্তে ঘাড়টা ওপরে তোলে লিও। এতক্ষণ দেখেনি সে, মাটি থেকে দশ বারো ফুট ওপর থেকে একটা কালো পর্দার মতন ছায়াপুঞ্জ সমস্ত সমাধিক্ষেত্রের আকাশ দখল করে রেখেছে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার যে সেই ছায়াপুঞ্জ বড় সচল, মুহুর্মুহু তার আকার আকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। বড়ই প্রাণবান ও চঞ্চল সেই ছায়াশরীর, যেন তার সক্রিয় চৈতন্য আছে, আছে রিরংসুএকটি সত্তা। মাঝেমধ্যে সাপের ছোবলের মতন খানিকটা ছায়া বিদ্যুদবেগে নেমে আসছে জর্জির দিকে, কিন্তু বার বার সেই মশালের আগুন দেখে ফিরে যাচ্ছে ব্যর্থকাম হয়ে। আরও অনুভব করে লিও, যে সেই ছায়াপুঞ্জ ক্রোধে ফুটছে। অব্যক্ত ক্ষোভে রি রি করছে তারা। সেই হাহাকার করা নিষ্ফল ক্রোধে গুমরে গুমরে তারা কাতরাচ্ছে, চাইছে মৃত্যুর বিষ ঢেলে দিতে অব্যর্থ ছোবলে।কিন্তু প্রতিটি ব্যর্থ আক্রমণ বাড়িয়ে দিচ্ছে তার রোষ। তাদের সমস্ত স্নায়ু, সমস্ত অস্তিত্ব থেকে যেন ঝরে পড়ছে তীব্র বিষের নিঃশ্বাস…
মন্দ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে উঠলো জর্জি, হে ইওরোপের শ্রেষ্ঠতম তন্ত্রশাস্ত্রজ্ঞ মহান গটস্কলখ, শয়তানেরও প্রভু জ্ঞানী গটস্কলখ, আপনি কি আমাদের মধ্যে উপস্থিত?
উত্তরে লিওর সমস্ত চৈতন্য শিউরে তুলে, সেই ক্রুদ্ধ ছায়াপুঞ্জ থেকে ভেসে এল এক অশরীরী কর্কশ আওয়াজ, ফিরে যা রে মূর্খ, সম্রাট ঘুমিয়ে আছেন।তাকে জাগাসনা।
জবাবে পোশাকের ভেতর থেকে কিছু গুঁড়ো বার করে আগুনের ওপর ছড়িয়ে দেয় জর্জি, তারপর আরও সোচ্চারে আওড়াতে থাকে বাইবেলের সেই বিকৃত শ্লোক।
আকাশটা যেন লাল হয়ে আসে, রাতের অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পায় লিও। ঝড় আসছে না কি? আশেপাশে একটি ঘাসও নড়ছে না। লিওর সঙ্গে প্রকৃতিও যেন দমবন্ধ করে দেখছে এই অত্যাশ্চর্য লড়াই। সেই ছায়াপুঞ্জ থেকে যেন জেগে ওঠে আর্ত কোলাহল, সহস্র কান্নার আওয়াজ যেন এই স্থানটিকে ঘিরে নাচতে থাকে। মার্বেল পাথরের গায়ে ছুরি দিয়ে আঁচড়ানোর মতন আওয়াজ তুলে হাহাকার ভেসে আসে, ফিরে যা রে মূর্খ পথিক, সম্রাটকে জাগাস না। তিনি অনন্তশয্যায় শুয়ে আছেন, তাকে জাগাস না, জাগাস না, জাগাস না…।
এমন সময়ে পায়ের তলার মাটি বীভৎসভাবে কেঁপে ওঠে। লিও পড়েই যেত, কুয়োর পাড় ধরে বসে পড়ে সে। তীরে ধাক্কা খেয়ে গর্জন করে ওঠে স্বিনভান লেকের জল, চার্চের গা থেকে খসে পড়ে কিছু পাথর আর টালি। পাঁচিলের একপাশ ধসে। ভগ্নস্তূপ হয়ে যায়।
আর ঠিক সেই সেই সময় একটা বিকট গম্ভীর গং শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে চারিদিক।
হোলার চার্চের শতাব্দী প্রাচীন ঘণ্টা এই ভূমিকম্পের ধাক্কায় বেজে উঠেছে!
ঠিক পনেরো সেকেন্ডের মাথায় ভূমিকম্প থামলে উঠে দাঁড়ায় লিও, এখন সে। সমস্ত ভয় বা আতঙ্কের ঊর্ধ্বে। তার সমস্ত অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গিয়েছে।
সে দেখতে পেল ইতোমধ্যে এক রক্তবর্ণ ধূম্রপুঞ্জ আবির্ভূত হয়েছে; আবির্ভূত হয়েছে সেই কালো ছায়াশরীরের পিণ্ডগুলির মাঝখানে। আর তার দিকে দুহাত উঁচু করে বলছে জর্জি, হে মহান তন্ত্রবেত্তা গটস্কলখ, অন্ধকারের সম্রাট গটস্কলখ, এই অধমের অভিবাদন গ্রহণ করুন।
জবাবে যেন যেই মেঘপুঞ্জের মধ্যে থেকেই কর্কশগম্ভীর স্বর ভেসে এল, হে মানবসন্তান, তোমার ধীশক্তি ও মেধায় আমি প্রসন্ন। আজ অবধি এতদূর না কেউ পৌঁছতে পেরেছে, আর না কেউ পারবে। তন্ত্রের জগতে অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করেছ তুমি। বলো হে মানবপুত্র, কী জানতে চাও?
.
১৭৫৫। অক্টোবর। ভাঁজ পালাসেতে।
প্রবল শীতের কামড়ে এইবার পুরো ইওরোপ জবুথবু। স্তব্ধ দুপুরে চিলেকোঠার ঘরে বসে একাগ্রচিত্তে পার্চমেন্ট পেপারের ওপর খাগের কলম দিয়ে লিখে যাচ্ছিল লিওনার্দো।
একমাসও হয়নি হোলার চার্চের সেই অভিযান থেকে ফিরেছে সে। ফিরেই অবশ্য ঘোরতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সপ্তাহ দুয়েক যমে মানুষে প্রাণান্তকর টানাটানি গেছে। আজ তুলনায় একটু সুস্থ বোধ করছে সে। আর সেইজন্যেই আজই বসেছে কাগজ কলম নিয়ে। স্মৃতিতে জাগরূক থাকতে থাকতে লিখে ফেলতে হবে, লিখে ফেলতে হবে সেদিন যা যা ঘটতে দেখেছে লিও। তারপর তাকে যত্নসহকারে লুকিয়ে রাখতে। হবে যেখানে মিগুয়েলের ডায়েরি রাখা আছে সেখানে। ভবিষ্যতে যে উদ্ধার করতে আসবে ভাঁজ পরিবারকে, সেই বংশধরটির জন্যে সযত্নে সাজিয়ে রেখে যেতে হবে সব। নিজের উত্তরপুরুষদের প্রতি এই দায়িত্বটাই তাকে দিয়েছে জর্জি।
