ভীত মুখে মাথা নাড়ায় লিও। সেই দিকে খানিকক্ষণ স্নেহভরে তাকিয়ে থাকে জর্জি। তারপর খানিকটা যেন জোর করেই এগিয়ে যায় সামনে। লিও স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।
খানিকটা এগিয়ে একটু পরিষ্কার জায়গায় দাঁড়ায় জর্জি। তারপর কিছু শুকনো কাঠি আর গাছের ডাল একত্র করে এবং সেই শকুনের পা দিয়ে একটা বর্গাকার ক্ষেত্র আঁকে মাটিতে। তারপর সেই কাঠকুটো গুলো স্তূপ করে রাখে সেই বর্গাকার ক্ষেত্রের। ঠিক মধ্যিখানেই।
শুধু যে রাখে তা নয়।রাখে এক বিশেষ পদ্ধতিতে। প্রথমে তিনটি কাঠি দিয়ে একটি ত্রিকোণ বানায়। তার ওপরে একটি উলটো ত্রিকোণ বানায় আরও তিনটি কাঠি দিয়ে।এই প্রক্রিয়া ঠিক তিনবার করে সে। তারপর তার চারিপাশে একটি বৃত্ত আঁকে, এমন ভাবে আঁকে যেন ওপর থেকে দেখলে মনে হয় ত্রিভুজের কোণগুলি বৃত্তের পরিধি ছুঁয়ে আছে।
এরপর নিজের পোশাকের ভেতর থেকে আরও বেশ কিছু সামগ্রী বার করে আনে। জর্জি। শুকনো গাছের ডাল ছিল দুটি, তাদের ভেঙে সেই ত্রিভুজের মাঝখানে রাখে। তারপর বার করে আনে একটি ছোট বাক্স, খুলে কিছু গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয় সেই গাছের ডালের মধ্যে। বাক্স রেখে বার করে আনে আরেকটি রুপোর তৈরি ছোট লম্বাটে শিশি। তার মধ্যেকার তরল পুরোটাই ঢেলে দেয় সে সেই কাঠকুটোর মধ্যে।
আর তারপরে যেটা বার করল জর্জি, সেটাকে বলে স্ট্রাইকিং ফ্লিন্ট। এই দিয়েই এখন আগুন জ্বালানো হয়। অনেক কষ্টে সেই ফ্লিন্টের দুটো অগ্রভাগ ঘষে ঘষে আগুনের ফুলকি ফেলতেই জ্বলে উঠল সেই কাঠ ও ডালপালার স্তূপ।এরপর জর্জি দাঁড়িয়ে উঠে প্রদক্ষিণ করতে থাকে সেই অগ্নিকুণ্ড, আর বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকে। এরপর তাতে আহুতি দেয় শকুনের পা। তারপর তাতে ভেঙে কালো রঙের একটা ছোট। ডিমের মতন কিছু একটা।
এরপর যেটা করে জর্জি, তাতে ভয়ে বুকটা ঠান্ডা হয়ে যায় লিওর। হঠাৎ করে যেদিকে লিও আছে সেদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পড়ে জর্জি, আর মুখ দিয়ে একটা উৎকট শিসের মত আওয়াজ করে দুহাত বাড়িয়ে কাকে যেন ডাকতে থাকে। করুণ কান্নার। মতন সেই তীক্ষ্ণ আওয়াজ কে যেন লিওর কানের মধ্যে উগ্র চিতিসাপের বিষের মতই। ঢেলে দেয়। কী যেন একটা অপার্থিব ঘোর অমঙ্গল আছে ওই ডাকের মধ্যে। একজন। মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ আর্তনাদ যেন ঘুরে বেড়াতে লাগল সমস্ত জায়গাটা জুড়ে। ঘাড়ের। সমস্ত রোঁয়া দাঁড়িয়ে যায় লিওর, বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথা থেকে যেন একটা কমন র্যাভেন উড়তে উড়তে আসে এদিকে, তারপর আগুনের ওপরে পাক খেতে খেতে ঘুরতে থাকে। দেখে অসম্ভব বিস্মিত হয় লিও। এত রাতে কমন র্যাভেনের তার বাসা ছেড়ে আসার কথাই নয়!
এদিকে দুটো হাত দুদিকে বিছিয়ে দিয়েছে জর্জি। আর সেই শিস দিয়ে করুণ মৃত্যুর গান চলতেই থাকে। আস্তে আস্তে র্যাভেনটা ওড়ার বৃত্ত ছোট করতে করতে নীচে নেমে আসে এবং শেষে জর্জির মাথার ওপর উড়তে উড়তে এক পর্যায়ে তার বাঁ হাতে এসে বসে।
আর ঠিক তক্ষুনি ডান হাত দিয়ে ব্যাভেনটাকে ধরে জর্জি। দ্রুতবেগে মন্ত্রোচ্চারণ। করতে করতে বাঁ হাত দিয়ে অমানুষিক শক্তিতে র্যাভেনের মুন্ডুটা একটানে মুচড়ে ছিঁড়ে আনে সে, আর রক্তটা ঢেলে দিতে থাকে সেই আগুনের মধ্যে।
কাজটা ঘটতে লাগে এক মিনিটের একটু কম সময়, আর এই নৃশংস দৃশ্যটা দেখে। সাদা হয়ে যায় লিওর মুখ, ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে সে। এই কি জর্জিনতো? তার দাদা জর্জিনহো? আগুনের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে সম্পূর্ণ অচেনা লাগে। জর্জির।এই নৃশংস, নিষ্ঠুর, ভাবলেশহীন চোখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওটা কে?নিজের দাদার এমন ভয়ংকর রক্তখেকো রূপ দেখবে, স্বপ্নেও ভাবেনি সে।
সে বেচারা জানত না–এখানেই শেষ নয়। তার আতঙ্কের সবে শুরু হয়েছে।
এরপর জর্জি পকেট থেকে একটা দীর্ঘ ছুরি বার করে।বাঁ হাতটা তুলে ধরে আগুনের। ওপর, আর তারপর দীর্ঘ ছুরিটা চালিয়ে দেয় তালু বরাবর। টপটপ করে রক্ত পড়তে থাকে আগুনের মধ্যে আর সঙ্গে চলতে থাকে সেই অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ।
আর দেখতে পারে না লিও। হাঁটু দুটো দুর্বল লাগে তার। মাটিতে বসে পড়ে সে।
খনিকক্ষণ পর আবার উঠে দাঁড়ায় সে। জর্জি বলেছে পুরোটা আজ তাকে দেখতে হবে, হুবহু গেঁথে রাখতে হবে স্মৃতিতে। তার হাতেই নাকি ভাঁজ পরিবারের এই অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায়। আর আজ সে হেরে যাবে? পিছিয়ে যাবে লিও? সেই জন্যেই কি জর্জি ভরসা করে তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে এই দুরূহ কাজে? এই তার বকের খাঁচা? জর্জির বিশ্বাসের প্রতিদান দেবে না লিও?
দেবে। অবশ্যই দেবে। উঠে দাঁড়ায় লিও।
ততক্ষণে আরও কতগুলো কাঠকুটো জুটিয়েছে জর্জি, তার মাথায় জড়িয়েছে একটা কাপড়ের টুকরো। তাই দিয়ে সেই অগ্নিকুণ্ড থেকে আগুন জ্বালিয়ে মশাল বানিয়ে জর্জি শুরু করে সেই সমাধিক্ষেত্রকে প্রদক্ষিণ করা! সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্র আবৃত্তি করা তো আছেই।
কিন্তু এবার শব্দগুলো এমন চেনা চেনা লাগছে কেন? আগেরবারের উচ্চারণ গুলো শুনে তো কিছুই বোঝেনি লিও!
আরও খানিকক্ষণ শুনতেই লিও স্পষ্ট বুঝতে পারে কী আওড়াচ্ছে জর্জি।
বাইবেল!
এত ভয়ের আর আতঙ্কের মধ্যেও প্রথমে খুব অবাক হয়ে যায় লিও। এত তন্ত্রমন্ত্র অভ্যাস তা হলে কীসের জন্যে, যদি বাইবেলের শ্লোকই আওড়াতে হবে শেষে? জর্জি কি পাগল হয়ে গেল? আরও মন দিয়ে শোনে সে। তারপরই বিস্ময়ে আর ভয়ে তার হাতের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে পড়ে!
