হেসে ফেলে জর্জি, মৃতদের জগৎ জাগাতে এসেছি লিও, খুব সাধারণ কিছু দেখবে বা শুনবে বলে আশা করছো কি? তবে তোমার ভয় নেই। আজ আমার দিন, গটস্কলখের আত্মার সঙ্গে আমার বোঝাঁপড়ার দিন। তুমি শুধু সতর্ক থেকো। আর যা দেখবে যা শুনবে, মাথায় গেঁথে নিও।
ঢোকার মুখেই বাঁদিকে একটা উঁচু মিনার। তার মাথায় চার্চের ভারী ঘণ্টা ঝোলানো থাকার কথা, কারণ ওটা বেল টাওয়ার। এখন টাওয়ারের সারা গা বেয়ে হাজারো সাপের মতন নেমে এসেছে লতাপাতা ও জংলি গাছ। ঘণ্টার অবস্থাও নিশ্চয়ই সেরকমই ভাবে লিও।
আকারে বিশাল এই হোলার চার্চ, যদিও স্থাপত্যের দিক দিয়ে লিসবনের পাড়ার চার্চও এর থেকে অনেক বেশি জাঁকজমকের। চারিদিকে পাথরের স্ল্যাব দিয়ে তৈরি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, তার উচ্চতা ফুট দুয়েকের বেশি হবে না। মাঝখানে চার্চের মূল বাড়ি, পেছন দিকে লম্বাটে হয়ে গেছে। প্রধান গেটের মাথায় বিশাল একটি ক্রুশ। আর দুদিকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ছাদ। সব মিলিয়ে এই।
চার্চের ভেতর ঢুকলই না জর্জি। লিওর হাত ধরে সোজা চার্চের দেওয়াল ঘেঁষে এগিয়ে যেতে লাগল পেছন দিকে। যেতে যেতে চারিদিক লক্ষ করছিল লিও। ডানদিকে দূরদূরান্ত অবধি পাথরের ছোট ছোট টিলা ছাড়া আর কিছু নেই। মাঝেমাঝে সেখান থেকে বয়ে আসা শিরশিরে হাওয়া তীক্ষ্ণ বল্লমের মত বুকে বিঁধছিল তার। নজরটা সে এবার বাঁদিকে ঘোরায়।
চার্চের পাথুরে দেওয়ালে এখন জংলি বুনো ঘাস আর লতাপাতার রাজত্ব। অযত্নে আর অবহেলায় শেষ হয়ে গেছে গটস্কলখ গ্রিমি নিকুলাসনের সাধের হোলার চার্চ। মাঝে মাঝে উঁচু জানালা, তার মধ্যে দিয়ে চার্চের ভেতরের ঘন অন্ধকার যেন নিষিদ্ধ তরলের মতন বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
চার্চের দেওয়াল শেষ হতেই, ম্যাজিক!
জায়গাটা যে একটা সমাধিক্ষেত্র সে বোঝাই যাচ্ছে। সামনে রয়েছে ধাপেধাপে উঠে যাওয়া একটা ছোট পাহাড়। দশমীর চাঁদের আলোয় বোঝা যাচ্ছে যে, লিওনারে ও জর্জিনতোর পায়ের নিচ থেকে শুরু করে পাহাড়ের প্রায় মাথা অবধি ছেয়ে আছে গোড়ালি অবধি ডুবে থাকা নরম ঘাসে। আর তার মাঝে মাঝে মাথা তুলে আছে। ঐশকাঠ আর ছোট ছোট সমাধিফলক। এই এলাকায় বড় গাছ তেমন নেই। মাথার ওপর সেপ্টেম্বরের পরিষ্কার গাঢ় নীল আর কালোয় মেশানো আকাশ, ঝলমল করছে। তারাদের জগৎ।যেন রাতের চাদোয়া ঝালরে হাজার হাজার হীরের কুচি বিছিয়ে দিয়েছে। কেউ। ভারী মায়াময় নরম দশমীর চাঁদ পাহাড়ের প্রায় মাথা ঘেঁষে ঝুলে আছে। সামনে পিছনে আর কেউ নেই, কিছু নেই, কোথাও নেই। আহা, কী অনাবিল শান্তির মধ্যে। মাটির নীচে ঘুমিয়ে আছে মৃতদের দল।
চার্চের ঠিক পেছনে একটা কুয়ো ছিল, বেশ উঁচু গোছের।তার মাথায় ছোট্ট একটা ছাউনি, তাতে কপিকল লাগানো। এত কাছে অত বড় হ্রদ থাকতে কুয়োর দরকারটা কী ভাবছিল লিও। এমন সময় জর্জির গলা ভেসে আসে, যেন লিওর মনের কথা ভেবেই বলে ওঠে সে, তন্ত্রসাধনায় সচরাচর মৃত্তিকাগর্ভের জলই ব্যবহার করা হয় লিও, বৃষ্টির। জলের জন্যে অনেক বাড়তি শোধনপ্রক্রিয়া দরকার হয়। গটস্কলখ নিজে এই কুয়ো খুঁড়িয়েছিলেন বলেই আমার বিশ্বাস। যদিও এসবের কোনো লিখিত প্রমাণ নেই, থাকার কথাও নয়। সে যাই হোক, এইবার তোমার কাজ লিও।ভালো করে দেখো কী করছি।
এই বলে পোশাকের ভেতর হাত চালিয়ে একটা ছোট শিশির মতন কী একটা বার করে আনে জর্জি। তারপর বার করে আনে আরেকটা কালো মতন বিশ্রী দেখতে একটা কিছু।
ওটা কি জর্জি?
শকুনের পা।
লিও আর কিছু বলতে সাহস পেল না।
এরপর জর্জি যেটা করল, সেটা অদ্ভুত। কুয়োর চারদিকে মাটিতে চারটে কী যেন আঁকল, আঁকল সেই শকুনের পা দিয়ে। আর প্রত্যেকবারই বিড়বিড় করে কী যেন মন্ত্র আবৃত্তি করল। তারপর উঠে দাঁড়ায়, তাকায় সেই দশমীর চাঁদের দিকে। দুহাত ধরে সেই শিশিটা তুলে ধরে উচ্চৈঃস্বরে কী যেন বলতে থাকে সে, যার বিন্দুবিসর্গ লিওর। বোধগম্য হয় না।
খানিকক্ষণ পর হাত দুটো নামিয়ে আনে সে। তারপর শিশিটা খুলে ভেতরকার। তরলটা খানিক হাতে নেয়, আর ফের বিড়বিড় করতে করতে কুয়োর চারিদিকেছিটোতে থাকে। ফুরিয়ে গেলে আবার ঢেলে নেয়, আর এই কাজ চলতেই থাকে যতক্ষণ না। শিশির ভেতরের সমস্ত তরল ফুরিয়ে যায়। এইভাবে কুয়ো থেকে প্রায় ফুট চারেক দূরত্বে সমকেন্দ্রিক একটি অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি করে সে।
তারপর চারিদিক থেকে খুঁজে পেতে কতগুলো শুকনো কাঠি আনে জর্জি। চারটে কাঠি প্রথমে কুয়োর চারিদিকে পুঁতে দেয়, ঠিক যেখানে শকুনের পা দিয়ে কিছু এঁকেছিল সে। তারপর বাকি কাঠিগুলো কুয়োর চারিপাশে বৃত্তাকারে গুঁজে দেয়, ঠিক যে বৃত্ত ধরে সেই মন্ত্রপূত তরল ছিটিয়েছিল সে।
একটা রাতচরা পাখি কর্কশ আওয়াজ করে উড়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে।
এদিকে এস লিও, গম্ভীর গলায় ডাকে জর্জি। পায়ে পায়ে সেদিকে এগোতেই লিওকে দৃঢ়মুষ্ঠিতে ধরে কুয়োর কাছাকাছি টেনে নেয় সে।
এই যে বৃত্ত দেখলে, এর বাইরে যাবে না। যা খুশি হোক, দুনিয়া এদিক থেকে ওদিক হয়ে যায়, আকাশ খসে পড়ুক, হ্রদের জল ভীমবেগে জমিতে উঠে আসুক, ভূমিকম্প হোক, ধেয়ে আসুক দাবানল, কিছুতেই তুমি এই বৃত্ত ছেড়ে বেরোবে না। যতক্ষণ তুমি এর মধ্যে আছো, স্বয়ং শয়তানেরও সাহস নেই তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করে। যত ভয়ঙ্কর কিছুই তুমি দেখো না কেন– নড়বে না, আর এই সীমানার বাইরে পা রাখবে না। এই যে দেখছ চাঁদের আলোয় মাটিতে অল্প ছায়া পড়েছে কুয়োর, চেষ্টা করবে এই ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে। ছায়া সরে গেলে তুমিও সরে যাবে। যা। বললাম মনে থাকবে তো?
