অনেকক্ষণ চুপ রইলেন দুজনে। সামনে তখন ম্লান সূর্য জুহু বিচের ঘোলাটে জলে সিঁদুর গুলে দিয়ে অস্ত যাচ্ছেন। মুম্বাইতে সন্ধে নামে চট করে। দ্রুতই বিচে নেমে এল। শত শহুরে রোশনাইতে ঝলমলানো সাঁঝ। তারই মাঝে সেই স্তব্ধতা পেরিয়ে লোকটার পরের কথাটা যখন বরফের শান্ত ছুরির মতন আছড়ে পড়ল, ইওরোপের ইস্পাতের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা অবিশ্বাস্য শিরশিরানিই নেমে চলে গেল যেন।
এইবার ঠিকঠাক করে বলো তো সাহেব, কে তুমি? আর কেনই বা এখানে। এসেছ? আর তোমার মাথার পেছনে কেনই বা মৃত্যুর কালো ছায়া ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সবসময়? তোমার শরীরের বাইরে তোমার আরেকটা ছায়াশরীর হাঁটছে, কে সে? আসলে কে তুমি?
স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকেন মার্টিনেজ, কে এই লোক? এসব কথা কী করে বলছে? অভিশাপ, মৃত্যু, এসব তো এর জানার কথা নয়! তিনি তো কাউকে বলেননি। তার এদেশে আসার উদ্দেশ্য, এক ফার্নান্দো ছাড়া। কোনো প্রাচ্যদেশীয় মহাপুরুষ-এর খোঁজও করেননি, জুটলে নিজেই জুটবে ভেবে। কী বলছে এ লোকটা? তারপরেই তার সন্দেহ হল, লোকটা বুজরুক, ধাপ্পাবাজ নয় তো? ভাবলেন, দেখা যাক, দেখাই যাক একটা চান্স নিয়ে, কতদূর এর দৌড়!
কী করে জানলে এসব তুমি? কে বলেছে তোমাকে?
মৃদু হাসলেন ভদ্রলোক, আমি জানি সাহেব। আমি স্পষ্ট দেখছি মৃত্যুর বাজপাখি তোমার মাথার ওপর উড়ছে, যে কোনো মুহূর্তে তোমাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে। একটা কালো অভিশাপের ছায়া সবসময় তোমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। এবং এ জিনিস বড় সহজ জিনিস নয় সাহেব। হাজার বছরে একবার কারও ওপরে এই অভিশাপ নেমে আসে।
তুমি,তুমি কি তান্ত্রিক? ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান?
বলতে পারো, সাহেব। প্রকৃতির মধ্যে ওতপ্রোত ভাবে যে শক্তি জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে লতায়, পাতায় ও ফুলে, বাতাসে ও বৃক্ষে, জড়িয়ে আছে নদীতে ও পাহাড়ে, জড়িয়ে আছে প্রাণীজগৎ ঘিরে, তারই আরাধনা করি। তাকে তুমি তন্ত্র বললে আমি তান্ত্রিক তো বটেই। শোনো সাহেব, ওসব থাক, একটা কথা বলি মন দিয়ে শোনো। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তোমার সঙ্গে আমার থাকা দরকার খুব দরকার। আমাকে তুমি চলে যেতে বোলো না সাহেব, আখেরে তোমার মঙ্গলই হবে। এখন তুমি কে, কেন এসেছ সব কিছু খুলে বলো তো দেখি।
লোকটার বলার মধ্যে কী ছিল কে জানে, মার্টিনেজ চুপ করে রইলেন। না বলার কথা তার মাথাতেই এল না। কিছুক্ষণ বাদে যদিও আগের প্রশ্নটাই ফের করলেন তিনি, কিন্তু কেন ব্রাদার, আমার এপর এত দয়া কেন? আমাকে সাহায্য করার জন্যে এত উৎসাহ কেন তোমার?
অন্ধকারে মুখ দেখা গেল না লোকটার, তারপর খানিকটা তিক্ত গলায় ভেসে এল এই কথাগুলো, আমাদের দেশ বড় আজব দেশ সাহেব। আমরা একদিকে নারীকে দেবী বলে পূজা করি, অন্যদিকে টাকার জন্যে তাদের পুড়িয়ে মারতে আমাদের হাত কাঁপে না।একদিকে নারীভ্রণ হত্যা করতে আমরা দ্বিতীয়বার ভাবি না, আবার আমরাই আবার অন্য বাড়ি থেকে বাচ্চা মেয়েদের চেয়ে আনি কুমারীপুজো করার জন্যে। কাল তুমি বাচ্চা মেয়েটাকে উদ্ধার করে যা করেছ সাহেব, সে মহাপুণ্যের কাজ। এখন আমাদের দেশজুড়ে দেবীপক্ষ চলছে সাহেব, জগন্মাতার বোধন চলছে। আমরা বলি দুর্গাপূজা। মায়ের পুজোর দিনে তুমি আরেক মাকে নিজের জীবন বাজি রেখে উদ্ধার করেছ। মায়ের আশীবাদ তোমার ওপর থাকবে সাহেব, দেখে নিও। আর আমি যদি তন্ত্রবিদ্যা কিছুমাত্র শিখে থাকি, যদি পিতৃপুরুষের সামান্যতম আশীবাদও আমার সঙ্গে থাকে, যদি মহামায়া আমার ওপর বিন্দুমাত্র কৃপা করে থাকেন তবে আমি কথা দিচ্ছি–এই ব্রাহ্মণের শরীরে বিন্দুমাত্র প্রাণ থাকতে এই অভিশাপের ছায়া তোমার অঙ্গস্পর্শ করতে পারবে না।
স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন মার্টিনেজ। এই কি সেই? সব কি মিলে যাচ্ছে? মিলে যাচ্ছে। মিগুয়েলের ডায়েরির ভবিষ্যৎবাণী? লিওনার্দোর ডিক্লারেশনের সতর্কবার্তা? তবুও একবার বাজিয়ে দেখা দরকার, দরকার আরও সতর্ক হওয়ার।
কিন্তু কেন? তুমি আমার জন্যে এতবড় ঝুঁকি নেবেই বা কেন ব্রাদার?
নিয়তি সাহেব,নিয়তি। ধরে নাও আমার তন্ত্রজ্ঞান আমাকে সেই শিক্ষাই দিয়েছে সাহেব।আজ সেই জন্যেই নিয়তি আমাদের দুজনকে একত্রে মিলিয়ে দিয়েছে। আরেকটা ব্যাপার কী জানো সাহেব?
আর কী?
একটা শিশুর জন্যে যে এতবড় ঝুঁকিটা নিতে পারে, তার বুকটা কত বিশাল সে আমি বুঝি। আমি এও বুঝি সেখানে কতটা ভালোবাসা থইথই করছে। জেনে রেখো সাহেব, ভালোবাসাই হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র, সবচেয়ে বড় যাদু।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন মার্টিনেজ, এত কথা হল, তোমার নামটা কিন্তু জানা হল না এখনও যে।
ক্ষণমুহূর্তের নৈঃশব্দ ভেঙে জবাব দিল লোকটা, তুমি আমাকে কৃষ্ণা বলেই ডেকো সাহেব। আমার নাম কে এন মৈত্র, পুরো নাম কৃষ্ণানন্দ মৈত্র।
বলে খানিকক্ষণ বাদে ফের মুখ খোলেন ভদ্রলোক, অবশ্য আমার আরেকটা নামও আছে। লোকে ডাকে আগমবাগীশ বলে, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।
.
১৭৫৫। সেপ্টেম্বর। প্রাচীন হোলার চার্চ, হোলার, আইসল্যান্ড।
ভয় পেও না লিও। যা দেখবে, যা শুনবে তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হবে না, ভয়। পাবে না। ভয় পেলেই কিন্তু মহাসর্বনাশ।
শুকনো পাতা মাড়িয়ে চার্চের চৌহদ্দিতে ঢোকার সময় লিওকে সতর্ক করে দিচ্ছিল। জর্জি। তাতে যে লিও খুব ভরসা পাচ্ছিল তা নয়। কাঁপা গলায় সে জিজ্ঞেস করে জর্জিকে, সর্বনাশ হতে পারে জর্জি? দেখতে পারি?
