.
২০১৬। দশ অক্টোবর, অষ্টমী, মঙ্গলবার। মুম্বাই
জুহু বিচের একটা কোনায় অনেকক্ষণ বসে ছিলেন মার্টিনেজ। তার মনে বিচিত্র আলোর খেলা চলছিল, চলছিল অবশ্য কাল রাত থেকেই।
রাতেই মেয়েটিকে নিয়ে সটান নিজের কনস্যুলেটে চলে যান মার্টিনেজ। গিয়ে সেখান থেকেই পুলিশে ফোন করেন। সেই নিয়ে যথারীতি হুলুস্থুলু কাণ্ড বেঁধে যায়। কনস্যুলেটের মধ্যেই। বিভিন্ন প্রোটোকলের গেরো পেরিয়ে যখন মেয়েটিকে পুলিশের হাতে সমর্পণ করা হয়, তখন প্রায় শেষরাত বা ভোর। পুলিশ কমিশনার জয়ন্তী মুদলিয়ার কেসের গুরুত্ব বুঝে নিজে এসে উপস্থিত হন অকুস্থলে। খুব সম্ভবত নিজে মহিলা হওয়ার কারণেই খুব দ্রুত ব্যাপারটা মিটে যায়। তিনি নিজে মার্টিনেজের দু হাত কঁকিয়ে কনগ্রাচুলেট করে যান, গুড জব ডান, মিস্টার ভাজ। প্লিজ অ্যাক্সেপ্ট মাই সিনসিয়ার রিগার্ডস।
কনসাল জেনারেল বলা বাহুল্য এতে বিশেষ প্রসন্ন হননি, হওয়ার কথাও নয়। এসব ঝামেলা থেকে শতহস্ত দূরে থাকাই তাঁদের ট্রেনিং মোতাবেক শিক্ষা। মার্টিনেজ অবশ্য এসব চাপা অসন্তোষ বিশেষ পাত্তা দেন না। যা উচিত মনে করেছেন তাই করেছেন। বেশ করেছেন।
তাঁর পাশে বসে নির্বিকার মুখে ভেলপুরি নামক অত্যন্ত আনহাইজিনিক ইন্ডিয়ান স্ন্যাক্স খাচ্ছিলেন যে পাঁচ ফুট দু ইঞ্চির টেকো ভদ্রলোক, তিনিই কাল মার্টিনেজকে ট্যাক্সিতে তুলে উদ্ধার করেন। সেই থেকে তিনি কেন কে জানে, মার্টিনেজকে ছাড়তেই চাইছেন না। রাত্রে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছিলেন, সকাল হতে না হতেই ফের এসে জুটেছেন।
এমনিতে লোকটার মধ্যে বৈচিত্র্যময় কিছুই নেই। অতি সাধারণ স্থূলোদর মধ্যবয়সি ভারতীয় শরীর। বয়েস পঞ্চাশের ওপরেই। পরেন হাফ স্লিভ শার্ট আর ট্রাউজার্স, সঙ্গে পায়ে একটা লেদারের তৈরি সস্তা লোফার্স। বাঁ হাতে একটা প্রাচীন রিস্টওয়াচ আর মাথায় সুবৃহৎ টাক। মুখে সদাসর্বদাই একটা অমলিন হাসি লেগে রয়েছে সবসময়। আর চোখে….।
হ্যাঁ চোখে। লোকটার সারা বৈশিষ্ট্য ওই দুটো চোখেই যেন ফুটে উঠছে। অমন ঝকঝকে, বুদ্ধিমান, খুশিয়াল আর অতলান্ত গভীর চোখ আর দেখেননি মার্টিনেজ। মেধা আর কৌতুকে যেন ঝকমক করছে চোখের মণিদুটি। শান্ত, ধীর, স্থিতধী সেই চোখদুটির সামনে এসে নিজের অজান্তেই নম্র হয়ে পড়েন মার্টিনেজ। লোকটাকে তাই তাড়িয়ে দেবেন দেবেন করেও তাড়াতে পারেননি তিনি। অথচ লোকটার প্রায় কিছুই জানেন না মার্টিনেজ। লোকটা অত্যন্ত অদ্ভুত দেশীয় উচ্চারণে নির্ভুল ইংরেজি বলে। ব্যাকরণগত দিক থেকে এমন স্পষ্ট সঠিক ইংরেজি তিনি অদ্যাবধি গোটা ইওরোপ বা আমেরিকাতেও শোনেননি, ওভাবে কথ্য ইংরেজি আর বলাই হয় না। তার উপরে লোকটার আদবকায়দাও প্রায় প্রাচীন ব্রিটিশদের মতন, একটু নাটুকে। তবে সবমিলিয়ে লোকটাকে মোটামুটি ভালো না লেগে উপায় নেই। অল্প কিছু কথাবার্তা হয়েছে অবশ্য। লোকটা থাকে মুম্বাইতেই, যদিও এখানে ওর বাড়ি নয়। আসল বাড়ি ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন পার্টে, বেঙ্গলে।
বাডি তো অন্য জায়গায়, এখানে তা হলে কী করতে? জিজ্ঞেস না করে পারলেন মার্টিনেজ।
পেটের ধান্দায় সাহেব,অল্প হেসেছেন সেই ভদ্রলোক, চোখ দুটো ঝলসে উঠেছে। কৌতুকে, একটা ওষুধ কোম্পানির সেলসে চাকরি করি, যাকে লোকে বলে বেচুগিরি। আপাতত এখানেই পোস্টিং।
এরপর না হেসে পারা যায় না, হেসেই জিজ্ঞেস করেন মার্টিনেজ, একাই থাকো এখানে? বউ বাচ্চা?
তারা দেশে থাকে সাহেব। ইচ্ছে আছে আরও কিছু টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে যাবো। বিদেশ বিভুইতে আর ভালো লাগে না।
বোঝেন মার্টিনেজ, মাথা নাড়েন, কটি সন্তান তোমার?
চারজন একটু লজ্জিতই দেখায় নাকি লোকটাকে? চারটিই ছেলে।
হুমম, এইবারে বলো তো চাঁদ, সেইদিন তুমি ওখানে কী করতে গেছিলে? প্রশ্নটা করেই ফেলেন মার্টিনেজ, যে প্রশ্নটা তার মনে কাল থেকেই ঘোরাফেরা করছে।
সশব্দে হেসে ওঠেন ভদ্রলোক, চোখে ঝলসে ওঠে বিদ্যুৎ।জানতাম সাহেব, তুমি এই প্রশ্নটা করবেই। তাহলে শোনো, কাল যে এলাকায় গেছিলে সাহেব, তার পাশেই আছে গ্রান্ট মেডিক্যাল কলেজ।
বাকিটা গুছিয়ে বলে লোকটা। গ্রান্ট মেডিক্যাল কলেজে নানা কাজকম্মে তার সেদিন রাত হয়ে যায় অনেক। এমনিতে গ্রান্ট মেডিক্যাল কলেজ থেকে মেরিন ড্রাইভে আসার একটা অন্য রাস্তা আছে। যে রাস্তাটা শর্টকাট, সেটাই সেই কুখ্যাত বেশ্যাপল্লির মধ্যে দিয়ে যায়। সেদিন নেহাত বাধ্য হয়েই শর্টকাটটা নিয়েছিল সে আর তারপর মার্টিনেজকে ওখানে দেখে হয়তো একটু কৌতূহল ভরেই দাঁড়িয়ে যায়। কাহিনির শুরুটা প্রায় পুরোটাই চাক্ষুষ করেছে লোকটা। মারামারি শুরু হতেই সে বোঝে যে গুরুতর একটা গন্ডগোল হতে চলেছে। চট করে সে কোম্পানির টাকায় সারাদিনের জন্যে ভাড়া করা ক্যাবটা নিয়ে আড়ালে চলে যায়। তারপর পলায়মান মার্টিনেজকে অনুসরণ করে। আসতে আর কতক্ষণ?
উপস্থিত বুদ্ধি দেখে তারিফ না করে পারেন না মার্টিনেজ।তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়, তুমি তো পালিয়ে যেতে পারতে, হঠাৎ আমাকে সাহায্য করার জন্যে দাঁড়ালে কেন?
ঝকঝকে হাসিটা ধরে রেখেই মার্টিনেজের দিকে তাকায় লোকটা এবং তাতেই যেন যা বলার বলে দেয়। এই প্রথম হঠাৎ করে মার্টিনেজ আবিষ্কার করেন যে এই লোকটার সমস্ত না বলা কথাও তিনি বুঝতে পারছেন, দুজনের মধ্যে যেন একটা টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ আছে। যেন এই লোকটা তার অনেক দিনের চেনা, বা যেন তার জন্যেই। লোকটা অনেক দিন ধরে অপেক্ষায় আছে। একটু মাথাটা ঠান্ডা হল মার্টিনেজের, কোথা থেকে যেন তাঁর বিক্ষুব্ধচিত্তে একটা উদ্যমী সাহসের উদয় হল।
