গটস্কলখ ছিলেন আইসল্যান্ডের তো বটেই, সে যুগে ইওরোপের শ্রেষ্ঠতম তন্ত্রসিদ্ধ অঘোরী উপাসক।এ যুগেও তাঁর মতন প্রতিভা নিয়ে খুব কম লোকই জন্মেছে। হোলার চার্চের বিশপ ছিলেন তিনি। একজন খ্রিস্টীয় উপাসক হয়ে তিনি কী করে যে মন্ত্রসাধনা আর তন্ত্রবিদ্যায় আসক্ত হয়ে পড়লেন কে জানে! লোকে বলত তিনি নাকি যে কোনও পশু বা প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারতেন, পারতেন কিছুক্ষণের জন্যে কাউকে মেরে ফেলতে ও আবার বাঁচিয়ে তুলতে। লোকে বলে চার্চে তার অধীনে যত শিষ্য ছিলেন, সবাইকেই তিনি তন্ত্রসাধনায় দীক্ষা দেন। ধীরে ধীরে হোলার চার্চে লোকজন প্রার্থনা করতে আসা বন্ধ করে দেয়, লোকজনের যাতায়াত কমে আসে।এখনও লোকে যেমন অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ভয় পায়, তখনও পেত; ফলে লোকটার নামে উলটোপালটা প্রচুর বদনাম রটানো হয়। গটস্কলখ নাকি রোজ রাত্রে ওয়্যারউল্ফ হয়ে ঘুরে বেড়াতেন। আর অসর্তক পথিক বা শিশুদের আক্রমণ করে তাদের কাঁচা রক্তমাংস খেতেন। এবার সত্যিই ঠান্ডা লাগতে শুরু করল লিওর।
লোকে বলে তিনি নাকি শয়তানের উপাসনা করতেন। ধীরে ধীরে তার নামই হয়ে যায় নিষ্ঠুর গটস্কলখ।
সত্যি? ভীত স্বরে জিজ্ঞাসা করে লিও।
শয়তান কাকে বলে লিও? সাধারণত তন্ত্রসাধকরা প্রকৃতির মধ্যেই অদৃশ্য ভাবে মিশে থাকা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির উপাসনা করেন। অশিক্ষিত লোকজন তাকেই বলে। শয়তানের উপাসনা। শয়তান বলে কিছুই নেই লিও। ইতিহাসের শুরু থেকে আজ অবধি মানুষের মনে যত অন্ধকার ইচ্ছা, যত গহীন আকাঙ্ক্ষা, যত গোপন পাপ, যত অব্যক্ত কামনা জমেছিল, বা জমে আছে, সেসবই পৃথিবীতে রয়ে গেছে লিও। আমাদের চৈতন্যের স্তরে স্তরে তার প্রতিটি পরত রয়ে গেছে, রয়ে গেছে আমাদের অস্তিত্বের আলজিভের মতন। তাকেই আমরা শয়তান বলে জানি, আমাদের মধ্যে মিশে-থাকা অন্ধকার আমি-টাকেই আমরা শয়তান বলে চিনি, জানি যে সে আছে। আর আমাদের সেই সম্মিলিত অবচেতনের গহীনে লুকিয়ে থাকা শয়তানকে যে বা যাঁরা একটিমাত্র রূপদান করে তাকে আহ্বান করতে পারেন, তাদেরই আমরা তন্ত্রশাস্ত্রজ্ঞ মহাপুরুষ বলে জানি। গটস্কলখ তাঁর সাধনবলে এরও অনেক ওপরের স্তরে পৌঁছেছিলেন লিও। তিনি সেই সেই ক্ষণজন্মা পুরুষদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি শুধু যে ইচ্ছেমতো শয়তানকে আহ্বান করতে পারতেন তা নয়, শয়তানকে যিনি নিয়ন্ত্রণও করতেও পারতেন!
চুপ করে রইল লিও। তার মনে চলছিল বিচিত্র এক ছায়াখেলা। একদিকে আজন্মলালিত গোঁড়া খ্রিস্টান সংস্কার, আরেকদিকে জর্জির হাত ধরে নতুন এক অজানা রোমাঞ্চকর জগতের উদ্ভাস। দুনিয়ায় তাহলে সবটা যে শুধু সাদা আর কালো তা নয়, তাই না?
আজ আমরা কী করব জর্জি?
গটস্কলখ একটি অসামান্য বইতে তার আজন্মকালসঞ্চিত জ্ঞান লিখে রাখেন। লিখে রাখেন মৃতদের জগত জাগানোর প্রক্রিয়া। লিখে রাখেন শয়তানকে আহ্বান করার যাবতীয় মন্ত্র, প্রক্রিয়াদি ও বিশদ বিবরণ। বইটির মলাট ছিল নিহত এক মাদি শুকরের মন্ত্রসিদ্ধ চামড়া দিয়ে। লাল রঙে রাঙানো চামড়া দিয়ে বাঁধানো বইটি নাকি লেখা হয় কমন র্যাভেনের রক্ত, কুকুরীর দুধ, আর বাদুড়ের মুখের লালা দিয়ে তৈরি কালিতে।
একটু চুপ করল জর্জিনহো। তারপর ফিসফিস করে বলে,লোকে বলে মৃত মানুষের কাটা আঙুল নাকি ব্যবহৃত হয়েছিল কলম হিসেবে। গটস্কলখ নাকি শুধু বলে যেতেন, আর সেই কাটা আঙুল নিজে নিজে পাতায় আঁচড় কেটে সেইসব লিখে যেত।
স্তম্ভিত হয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকে লিও!
লোকে বলে বইটি নিজেও অসামান্য ক্ষমতার আধার ছিল। অনুমতিহীন অনেকেই বইটি ছতে গিয়ে অভিশাপগ্রস্ত হয়েছে বলে শোনা যায়। লেখকের অনুমতি ছাড়া। অনধিকারী কেউই এই বইটি হাতে নেওয়ার সাহস করেনি কখনও। জনশ্রুতি অনুযায়ী তার নামই হয়ে লাল চামড়া, বা রেড স্কিন। আইসল্যান্ডীয় ভাষায় রওডস্কিনা। পনেরো শো কুড়ি সালে যখন গটস্কলখ মারা যান, হোলার চার্চে তখন আর কেউ আসে না। তাকে শয়তানের আখড়া বলে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন আইসল্যান্ডের আর্চবিশপ। তারই আদেশক্রমে গটস্কলখেরই এক প্রিয়শিষ্য মৃতদেহের সঙ্গে তাঁর লেখা। বইটিও একই কবরে সমাহিত করে। আর তার পরপরই এই চার্চ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। নতুন হোলার চার্চ এখন হোলার শহরের মধ্যিখানে। সেই থেকে এই চত্বরে কেউ পা রাখার কথা ভাবতেই পারে না।
এইটি বলার সঙ্গে সঙ্গে ছোটো নৌকাটি তীরে ভেড়ে। লাফিয়ে তীরে নামে জর্জিনহো এবং নৌকাটিকে টেনে ডাঙায় তোলে। তারপর লিও নামে নৌকা থেকে। তীরে। দাঁড়িয়ে আগের প্রশ্নটাই ফের করে সে, আজ এখানে আমরা কী করতে এসেছি জর্জি?
নৌকাটা টেনে একটা বড় পাথরের পেছনে এনে ফেলে জর্জিনহো, একাই। তারপর সেই ক্ষীণ চন্দ্রালোকিত হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে, অপার্থিব আলো আঁধারির মধ্যে প্রায় মিশে। যাওয়া জর্জির গলা থেকে সামান্য কৌতুকময় কথাটা ভেসে এল, আজ আমরা কবর থেকে গটস্কলখকে জাগাতে এসেছি লিও। জানতে এসেছি আমাদের পরিবারের ওপর। ছেয়ে থাকা এই ভয়ঙ্কর অভিশাপ থেকে মুক্তির কী উপায়। শয়তানেরও ওপরে প্রভুত্ব। করা একমাত্র ইনিই আমাদের সঠিক রাস্তা দেখাতে পারেন।
আতঙ্কটা লিওর বুকে পুরোপুরিভাবে চেপে বসার আগে ফিসফিস করে ফের বলে ওঠে জর্জিনহো ভাজ, এইটাই নিয়তির বিধান লিও, শয়তান এসে মিগুয়েলকে এটাই। বলে গেছিলেন। আর আজ যা করতে এসেছি তাতে তুমি এমন অনেক অলৌকিক কিছু। দেখবে, যা দেখে তুমি হতভম্ব হয়ে যেতে পারো। সাহস রেখো লিও, যদি কিছু ক্ষতি হয়। তো আমার হবে। তোমার গায়ে একটি আঁচড়ও পড়বে না, পড়তে পারে না, সে ব্যবস্থা। আমি করে রাখব। আজ যা ঘটবে, তার প্রতিটি মুহূর্তের নিখুঁত বর্ণনা নিজের মগজে। গেঁথে নিও তুমি। আজ রাত থেকে ভাঁজ পরিবারের রক্ষার একমাত্র উপায় তোমার। কাছেই গচ্ছিত থাকবে মিস্টার লিওনার্দো ভাজ। কিপ ইট সেফ।
