নেতাগোছের লোকটি এগিয়ে এসে মার্টিনেজের থেকে ফুট তিনেক দূরে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ায়। কুতকুতে লাল চোখ, গলায় সোনার মোটা চেইন, চুইংগাম চিবোনো লোকটার সারা শরীর থেকে যেন ঔদ্ধত্য চুঁইয়ে পড়ছে। হোঁতকা কালো মুখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে লোকটা বলল, ইউ ইংলিশ? আই ইংলিশ। গিভ গার্ল। নো ফাইটিং। গার্ল ইজ বিজনেস। ইউ গো সি বিচ। চোয়াল শক্ত করে সরু চোখে তাকিয়ে থাকেন। মার্টিনেজ। লোকটা বোধহয় বুঝতে পারে যে সাহেবের কথাটা ঠিক পছন্দসই হয়নি। সে আবার বলে, ইউ ফরেনার, নো ফাইটিং, নো ট্রাবল। উই কিং হিয়ার। গিভ গার্ল। গো ব্যাক। আর ইউ পে ডলার, এনজয় দ্য গার্ল।
স্থির চোখে সাপের চাউনি নিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকেন মার্টিনেজ আর সেই দৃষ্টি দেখে যেন হঠাৎ করেই হাসিটা উবে যায় তার মুখ থেকে। লোকটা নোংরা একটা মুখভঙ্গি করে চুইংগামটা থুকরে ছুঁড়ে দেয় মার্টিনেজের মুখে, আর বেরিয়ে আসে। অশ্রাব্য খিস্তি, নো হিয়ারিং বাস্টার্ড? ফাঁক ইউ অ্যাসহোল, মাদারফা…।
একটা লোক যে শরীরের উর্ধ্বাংশ যৎসামান্য বাঁকিয়ে আর বাঁহাতটা মুখের কাছে এনে, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে শরীরের ভারসাম্যটা বাঁপায়ের ওপর চালান করে দিতে পারে, আর পারে ডান পাটা প্রায় পাঁচফুট তুলে দিতে, সেটা নেতাগোছের লোকটি আন্দাজই করতে পারেনি। অবশ্য আন্দাজ করে লাভও হত না একটুও।
পাঁজরের ঠিক নীচে, পেটের একটু ওপরে অংশটাকে বলে সোলার প্লেক্সাস। মানবশরীরের যে যে জায়গায় আঘাত করলে মুহূর্তের মধ্যে শত্রুকে অকেজো করা যায়, তার প্রথম তিনের মধ্যেই এর নাম আসবে। আঘাতটা আসে ডায়াফ্রেমের ওপর, স্বভাবতই সেখানে সজোরে আঘাত করলে শ্বাস নেওয়াটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসবই হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটের একদম গোড়ার দিকের কথা। লোকটার অবশ্য এসব জানার কথা নয়ও। লাথিটা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয় যেন একটা লোহার মুগুর তার ফুসফুসটা ফাটিয়ে দিয়েছে। পড়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে যে দৃষ্টিটা তার চোখে ঝুলে ছিল তার মধ্যে যন্ত্রণার সঙ্গে মিশে ছিল বেশ খানিকটা বিস্ময় ও ভয়।
মরণান্তিক ভয়।
এরপরে স্বাভাবিকভাবেই বাকিরা তেড়ে আসে মার্টিনেজের দিকে। আর তারপর যেন একটুকরো ক্যারিবিয়ান হারিকেনই উঠে এল মুম্বাইয়ের কামাথিপুরার বুকে।
পুরো লড়াইটা শেষ হতে সময় লাগল ঠিক এগারো মিনিট। তারপর সেই ধ্বংসস্তূপের চারিপাশে যখন তাকালেন মার্টিনেজ, তখন এলাকা পুরো খালি। সটাসট বন্ধ হয়ে গেছে পান সিগ্রেট আর বাকি দোকানগুলো। যে মেয়েগুলো দরজার সামনে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে কাস্টমারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল, তারাও অবস্থা বুঝে ঘরের মধ্যে সেঁধিয়েছে; যদিও জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে এদিকেই।
ভয়ে আতঙ্কে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বাচ্চা মেয়েটার নড়া ধরে দাঁড় করালেন। মার্টিনেজ। তারপর মেয়েটাকে প্রায় টানতে টানতে পেছন ফিরে দৌড়তে থাকেন তিনি। বাচ্চাটাকে নিয়ে এক্ষুনি এখান থেকে পালাতে হবে তাকে, তার মন বলছিল বড় একটা ঝামেলা বাধতে চলেছে। দৌড়তে দৌড়তেই দুএকটা ট্যাক্সি থামাবার চেষ্টা করলেন তিনি এবং তাদের এই দুজনকে দেখেই দ্রুতবেগে উধাও হয়ে যাওয়া দেখে বুঝলেন– খবরটা এই এলাকায় এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে ভালোই।
বাঁ দিকে একটা বাঁক নিলেন মার্টিনেজ। এবার রাস্তাটা একটু চওড়া, দোকানপাট আছে। লোকজন একটু আধটু তাকাচ্ছেও দুজনের দিকে। ভাবখানা যেন, রেড লাইট এরিয়া থেকে সাহেব মেয়ে তুলে পালাচ্ছে নাকি?
একটা ক্যাব যেন অন্ধকার কুঁড়েই পাশে এসে দাঁড়াল মার্টিনেজের পাশে। সেদিকে একবার তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিলেন তিনি,ক্যাবটা ভর্তি। পেছনের সিটে প্যাসেঞ্জার বসে আছে।
সাহেব, কাম হিয়ার। অই অ্যাম হিয়ার টু হেল্প ইউ।
থেমে পেছনে ফিরলেন উত্তেজিত, ঘর্মাক্ত মার্টিনেজ। ট্যাক্সিটাও তার পাশে এসে থামে। পেছনের প্যাসেঞ্জারটি মুখ বার করেন, কাম হিয়ার সাহেব, জলদি। উই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম।
এটা কি একটা ফাঁদ? হতেও পারে। কিন্তু ক্যাবের জানলা থেকে মুন্ডু বার করে। রাখা লোকটাকে দেখে তার কী মনে হল কে জানে, মেয়েটাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে। নিজের অত বড় শরীরটা নিয়ে ট্যাক্সির পেছনে সেঁধিয়ে গেলেন মার্টিনেজ।
.
১৭৫৫। সেপ্টেম্বর। স্বিনভান লেকের ধার, হোলার, আইসল্যান্ড।
নিয়তির কী আশ্চর্য গতিপ্রকৃতি দেখো লিও, গটস্কলখ যে বছর মারা যান, ঠিক সেই বছরেই মিগুয়েলের জন্ম। নিস্তরঙ্গ লেকে নৌকা বাইতে বাইতে বলে জর্জি। দাঁড় টানতে টানতে চুপচাপ শুনছিল লিও। আর মিনিট দশেকের মধ্যেই তারা পৌঁছে যাবে। অপর পারে।বিশাল অন্ধ পাহাড়ের মতন সেই প্রাচীন চার্চ এখন তাদের দৃষ্টিসীমার প্রায় অনেকটাই জুড়ে আছে। একবার করে সেদিকে চোখ যাচ্ছে লিওর, আর বুকটা একটু করে দমে যাচ্ছে। বিশ্বচরাচরে আর কেউ নেই, কোথাও নেই। চারিদিকে নিরেট জমাট অন্ধকার যেন ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে আছে এই দুই দুঃসাহসী অভিযাত্রীর দিকে। সামনে সেই পরিত্যক্ত চার্চ, যেখানে গত দুশো বছরে কেউ সাহস করে দিনের বেলাতেই পা দেয়নি, রাতের বেলায় আসা তো অসম্ভব! বরফঠান্ডা জলে ছোট ছোট ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছে দশমীর বাঁকা চাঁদ। লিওর মনে হল অত বড় চাৰ্চটা যেন হাঁ করে আছে, তাকে গিলে খাওয়ার জন্যে। নেহাত জর্জি সঙ্গে আছে তাই…
