আকাশে সপ্তমীর বাঁকা চাঁদের ক্ষীণ আলো লুটিয়ে পড়েছে পিচের রাস্তায়। রাস্তার পাশের ভাঙা ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো যেন বিষাদের। চাদরের মতন ছড়িয়ে আছে চারপাশে। চোখ তুলে মার্টিনেজ বুঝলেন যে জায়গায় তিনি এসে পড়েছেন সেখানে এই মুহূর্তে আসাটা তার উচিত হয়নি।
সামনের গলিটার দুপাশে অনেকগুলো ঘর। প্রতিটি ঘরের সামনে উজ্জ্বল রঙের। দৃষ্টিকটু পোশাকে বসে আছে একদঙ্গল মেয়ে। তাদের রং-মাখানো মুখ, উগ্র সাজগোজ, খিলখিল হাসি, উচ্চকিত আলাপ-আলোচনা, বসার ভঙ্গি, এসবই বলে দিচ্ছিল ওরা কারা!
গলির মুখটায় আর চারিদিকে কাঠের গাড়ি, তাতে কিছু সস্তা খাবার বিক্রি হচ্ছে। মোড়ে একটা ছোট্ট দোকান, সামনে ঝুলছে রং-বেরঙের স্যাশে।সেখানে সিগারেট থেকে শুরু করে হরেক জিনিসের বিক্রি, তারস্বরে একটা রেডিও চলছে। বাইরে থেকে আসা লোকজন মাথা নিচু করে একেকটা বাড়িতে ঢুকছে, আবার কেউ কেউ বেরিয়ে আসছে। এক জায়গায় ছোট জটলা; দেশি মদের উগ্র গন্ধে আর মৌতাতলোভী লোকেদের ভিড়ে নরকগুলজার হয়ে আছে জায়গাটা।
মার্টিনেজ খেয়াল করলেন ইতিমধ্যেই তার পাশে ঘনিয়ে এসেছে একটা লোক, তার নোংরা চেহারা, মলিন পোশাক-আশাক সবই বিবমিষা উদ্রেককারী। টলতে টলতে ফিসফিস করে সে বলল, ওয়ান্ট গুড কলেজ গার্ল স্যার? ফ্রেশ গার্ল স্যার, ভেরি ইয়ং, ভেরি চিপ। স্থানীয় মদের কড়া গন্ধে মার্টিনেজের গা গুলিয়ে ওঠার উপক্রম। হয়। তিনি মুখে রুমাল চাপা দিয়ে হাতের ঈঙ্গিতে লোকটাকে সরে যেতে বলতেই সে আরও গা ঘেঁষে আসে, শ্লেম্মাজড়িত কণ্ঠে মার্টিনেজের জামার হাত ধরে টানতে থাকতে, টিপস সাহিব, টিপস। গিভ মি টেন ডলার…
মার্টিনেজের ইচ্ছা হল টেনে একটা থাপ্পড় মারেন এই নোংরা ভিখিরির বাচ্চা বেশ্যার দালালটাকে। বহু কষ্টে মনের ইচ্ছা সংবরণ করে জামাটা ছাড়াবার হাতটা শুধু একবার সজোরে ঝাড়া দিতে লোকটা মাটি থেকে সামান্য উঁচু হয়ে ছিটকে পড়ে, মাথাটা সজোরে লাগে একটা ল্যাম্পপোস্টে ও স্থির হয়ে যায়।
মার্টিনেজ খেয়াল করলেন আশেপাশের দেওয়ালের গা ঘেঁষে থাকা অন্ধকারগুলো যেন একটু নড়ে উঠল। ইতিউতি জ্বলতে থাকা আগুনের বিন্দুগুলো একটু সচল হয়, দুচারটে ছায়া উঠে এল এদিকে। বিদেশবিভূঁইতে কোনো ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, স্থানীয় কনস্যুলেট বা দেশের ট্যুর গাইড সে কথাই পই পই করে বলে দেয় বারবার। আর যে কাজটার জন্যে এসেছেন, তার আগে যথাসম্ভব ঝামেলা এড়িয়েই চলতে চাইছিলেন মার্টিনেজ। কিন্তু ঝামেলা নিজে থেকে ঘাড়ের ওপর এসে পড়লে আর কী করা! ঘুরেই দাঁড়ালেন ইওরোপের ইস্পাত।
ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই মুহূর্তেই ঝড়ের মতন একটা গাড়ি এসে থামল গলিটার মুখে। পাশের দরজা দুটো স্লাইড করে খুলে যেতে দুপাশ থেকে দুটো করে মোট চারটে মোটাসোটা হুলিগান টাইপের লোক নামে পাথুরে রাস্তায়।
না, শুধু তারা নয়, নামল একটা অল্পবয়সি মেয়েও।
মেয়েটা যে স্বেচ্ছায় আসেনি, সেটা না বললেও চলবে। গাড়ি থেকে টেনে নামানোর পর থেকেই তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে বাচ্চাটা যাবে না, ওই গলির মধ্যে কিছুতেই যাবে না সে। ছটফট করছে মেয়েটা আর কাঁদছে। হাউহাউ করে কাঁদছে, বুক ফাটিয়ে কাঁদছে। ডানহাতটা দিয়ে নিজের বুক থাবড়ে থাবড়ে কাকুতিমিনতি করছে, পায়ে পড়ছে ওই চারটে লোকের। সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার।
বলা বাহুল্য, চারজন মুশকো গুন্ডার কাছে এসব গা-জোয়ারি কিছুই না। তার ওপর ভাবগতিক দেখে মনে হল এসব কাজ তাদের গা সওয়া। একজন আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে সজোরে বায়ুত্যাগ করাতে সেই নিয়ে আবার হেসে লুটিয়ে পড়লো বাকি দুজন। শেষের জনের হাতেই ধরা ছিল বাচ্চাটা, সে আবার এসবে কাঁচরম্যাচরে বিরক্ত হয়ে সজোরে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল মেয়েটাকে। আঁক করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার মাথাটা স্প্রিং এর মতন বাঁদিকে ঘুরে গেল, আর দৃশ্যটা দেখে চড়াৎ করে মাথায় রক্ত চড়ে গেল মার্টিনেজ ভাজের।
অনেক কষ্টে রাগ সামলালেন তিনি, যদিও ভেবে পাচ্ছিলেন না যে এই মুহূর্তে তাঁর কী করা উচিত। তার স্বাভাবিক বুদ্ধি তাকে বলছিল এখান থেকে চুপচাপ কেটে পড়াই আপাতত ঠিক। পরে না হয় কনস্যুলেটের সাহয্যে পুলিশে একটা অভিযোগ…
ভাবতে ভাবতেই একটা অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে গেল। মেয়েটা তাকে ধরে-থাকা হাতটায় সজোরে একটা কামড় দিতেই লোকটা উঃ আওয়াজ করে হাতটা আলগা দেয়। আর সেইটুকু সময়ের মধ্যেই মেয়েটি পালাতে গিয়ে সোজা এসে মার্টিনেজের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, এতে একটু চমকেই যান তিনি। দ্রুত মেয়েটাকে দুহাতে ধরে তোলেন, আর তারপর তার মুখের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যান তিনি।
যতটা ভেবেছিলেন তার থেকেও অনেক বাচ্চা হবে মেয়েটা। দশ কী এগারো।
প্রায় তিয়াগোর বয়সি!
মেয়েটাকে দাঁড় করিয়ে নিজের পিছনের দিকে ঠেলে দিলেন মার্টিনেজ। নাঃ, ঝামেলাটা আর এড়ানো গেল না।
ইতিমধ্যেই টি শার্ট, জিনস আর স্নিকার্স পরা চার মূর্তিমান ধীরে ধীরে এগিয়ে। আসে এদিকে। দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো ছায়াগুলো তাদের অনুসরণ করে তৎক্ষণাৎ। ছায়াদের কেউ একজন চেঁচিয়ে চারজনের দলের নেতাগোছের লোকটিকে বলে কিছু, আর তারপর রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা দালালটিকে দেখায়।
