এই গোলমালের মধ্যেই জর্জিনহো দৈবাৎ এক অসাধারণ মন্ত্রশক্তির অধিকারী ভারতীয় পুরুষের সাক্ষাৎ পায়। সেই ভারতীয় লোকটি তার বছর বিশেক আগে তুরস্কে এসেছিলেন ক্রীতদাস হিসেবে। তখন ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য ভাঙনের মুখে, মারাঠা। নামের এক হিন্দু শক্তি তখন অর্ধেক ভারতের অধীশ্বর। তারাই লুঠপাট করে, সমর্থ চেহারার মানুষজন ধরে বেঁধে বিদেশি দাসব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে বিপুল সম্পত্তি উপার্জন করেছিল। ভারতবর্ষের পূর্বদিকের বংগা নামের প্রদেশের বাসিন্দা এই মানুষটি তেমন করেই প্রথম যৌবনে মারাঠা দস্যুদের খপ্পরে পড়েন এবং আফগানি দাসব্যবসায়ীদের হাতফেরতা হয়ে ইস্তানবুলে আসেন। পরে এঁর বুদ্ধি ও ধীশক্তি দেখে। এর মালিক এঁকে মুক্ত করে নিজের জীবিকানির্বাহের ব্যবস্থা করে দেন।
এই মানুষটি প্রাচ্যের যাবতীয় তন্ত্রমন্ত্র এবং জাদুকরী বিদ্যার আধার ছিলেন। অষ্টসিদ্ধি থেকে শুরু করে ভূতবন্ধন বা প্রেতকল্পে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও চরাচরের সমস্ত ডাকিনীবিদ্যায় ছিলেন অদ্বিতীয় অতিরথ। কায়াধারণ থেকে শুরু করে নিজের আত্মাকে দেহের বাইরে নিয়ে যাওয়া, অন্যের জীবিত শরীরে প্রবিষ্ট হওয়ার অসামান্য ক্ষমতা ছিল তার। হাওয়া থেকে অদ্ভুত জিনিস সৃষ্টি করতে পারতেন, পারতেন। নিজের শরীর হালকা তুলোর মতন করে ফেলতে।
জর্জির অধ্যাবসায় দেখে তিনিই জর্জিকে পিশাচবিদ্যা দান করেন। এই পৃথিবীতে খুব কম লোকেরই যা অধিগত, শেখান সেই মৃতদের জগৎ জাগ্রত করার মন্ত্র। তবে এও বলেন যে জীবনে মাত্র একবারই কেউ পারে এই ভয়ংকর কাজে ব্রতী হতে। এমন। কি বিন্দুমাত্র বিচ্যুতিতে প্রাণসংকট অবধি উপস্থিত হতে পারে।
জর্জিনহোর সমস্ত কথা তিনি শুনেছিলেন। জর্জি সমস্ত কথা জানিয়ে তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। প্রিয়শিষ্যকে বিমুখ করেননি সেই শাস্ত্রবেত্তা, একদিন গোরস্থান গিয়ে বিশেষ তন্ত্রসাধনা করেন। তারপর ফিরে এসে জানান, যে অভিশাপ ভাঁজ পরিবারের ওপর আছে, তা খণ্ডন করা প্রায় অসম্ভব। কোটিকে গুটিক পারে, তাও ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহ না হলে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। তিনি আরও নক্ষত্রবিচার করে বলেন উত্তরের হিমাবৃত দেশের এক মহাভৈরব সিদ্ধ পুরুষকে জাগানোর কথা। সেখান থেকেই নাকি চূড়ান্ত নির্দেশ আসবে।
বিদায় দেওয়ার দিন জর্জিনহোকে জড়িয়ে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন দেশে তিনি একটি ছোট ভাইকে দেখে এসেছিলেন অপহৃত হওয়ার সময়। যদি সে বেঁচে থাকে, আজ নিশ্চয়ই সে জর্জিনহোর মতই বড়োটি হয়েছে!
আজন্মকালের জন্যে তার কেনা গোলাম হয়ে রয়েছে জর্জিনহো ভাজ!
চুপচাপ বৈঠা বাইতে বাইতে কথাগুলো নিজের মনে ভাবছিল লিওনার্দো। আজ সে জানে জর্জি কারও টানে ভাঁজ পালাসেতেতে ফিরে আসেনি। ফিরে এসেছিল অন্য এক উদ্দেশ্যে নিয়ে। আসার মাসখানেকের মধ্যেই সে লাইব্রেরি ঘরের গোপন ভল্টে আবিষ্কার করে মিগুয়েলের লুকোনো ডায়েরি, আজ অবধি যা কেউ চোখেই দেখেনি, আছে বলে শুনেছে শুধু।
সব কিছু পড়ার পর, সব কিছু জানার পর, জর্জি বুঝতে পারে মিগুয়েলের ডায়েরিতে উল্লিখিত সেই উত্তরের হিমাঞ্চলাবৃত দেশে মৃত্তিকাগর্ভে শায়িত লোহিত চর্মাবৃত মহাযোগীর নাম কী। তাকে কেনই বা সেই জিপসি রমণী উল্লেখ করেছিল। ইওরোপের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শয়তানের উপাসক বলে। কেনই বা ইস্তানবুলের সেই ভারতীয় তন্ত্রসাধক উত্তরের হিমাবৃত দেশের মহান মন্ত্রসিদ্ধ পুরুষের কথা বলেছিলেন। এবং জেনেছিল সেই সবচেয়ে অলৌকিক, সবচেয়ে রহস্যময়, সবচেয়ে ভয়ংকরী। ডাকিনীবিদ্যার বইটির নামও। যে বইটির একটিই মাত্র লিখিত রূপ ছিল। সেই ভয়াল তন্ত্রসাধকের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের সঙ্গে বইটিকেও কবর দেওয়া হয়।
সেই মহাসিদ্ধ ঘোরভৈরব তন্ত্ৰপুরুষের নাম আজ জানে লিওনার্দোও, একটু আগেই জর্জি জানিয়েছে তাকে। জানে সেই অলৌকিক শক্তির ধারক গ্রিমোয়ারটির নামও, এও জানে কেনো মিগুয়েলের ডায়ারিতে সেই অলৌকিক পুরুষের বিশেষণ হিসেবে লোহিত চর্মাবৃত কথাটি বলা হয়েছে।
কারণ যে বইটি তার লেখকের সঙ্গেই সমাহিত করা হয়, সেই তন্ত্রচিহ্নধারী, শয়তানের মন্ত্রসিদ্ধ বইটির নাম হলো রওডস্কিনা। ভাষাটা আইসল্যান্ডিক।
আর ইংরেজিতে এর নাম রেড স্কিন বা লাল চামড়া। লোহিত চর্ম।
আর সেই তন্ত্রবেত্তা মহাসাধকের নাম?
গটস্কলখ।
গটস্কলখ গ্রিমি নিকুলসন।
.
২০১৬। নয় অক্টোবর, সপ্তমী, সোমবার। মুম্বাই।
রাস্তাটা চওড়া হলেও সামান্য অন্ধকার। সেটা আগে খেয়াল করেননি মার্টিনেজ। অন্ধের মতন রাস্তার ডানদিক ধরে সোজা হাঁটছিলেন। আশেপাশের জনস্রোত, তাদের বদলে যাওয়া প্রকৃতি, কিছুই লক্ষ করেননি। মাথার মধ্যে দপদপ করছিল ক্রোধ, কান্না আর যন্ত্রণা। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে নিজের হৃৎপিণ্ডটা যদিবার করে আনতে পারতেন একবার… তিয়াগো… ওহ তিয়াগো… এইভাবেই সারা জীবন একটা নির্জীব। পদার্থের মতন বেঁচে থাকবে তাঁর ছেলে?
রাত নেমে এসেছে এই মহানগরীর শরীরে, রন্ধে রন্ধেও বটে। খানিকক্ষণ পথ। চলার পর সচেতন হলেন তিনি, পা দুটি ধীর হয়ে এল।
তিনি জানেন না কতক্ষণ হেঁটে এসেছেন তিনি, কতদূর। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি যেখানে পঁড়িয়ে আছেন, সেখানে তাঁর না থাকাই শ্রেয় ছিল। জায়গাটা একটা আলো। আঁধারি রাস্তা তেমাথা নোড়। যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার ঠিক উলটোদিকে একটা সরু গলি।
