আমোনা নামের কোনো ভিলেজ আছে গোঁয়ার আশেপাশে? প্রশ্ন শুনে ভুরু কুঁচকোলেন কনসাল জেনারেল। তারপর ম্যাপ আনিয়ে দেখে জানালেন যে আছে তো। বটেই। যেখানে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সেই ক্যালাস্কুট বিচ থেকে তিরিশ চল্লিশ কিলোমিটার দূরে, ঘণ্টা খানেক কী ঘণ্টা দেড়েকের রাস্তা। কিন্তু গোয়াতে এত দেখার জায়গা থাকতে হঠাৎ সেই অজ পাড়াগাঁয়ে কেন? এনি স্পেশ্যাল রিজন?
এমনিই,কাষ্ঠহাসি হেসে কনসাল জেনারেলের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে হয়েছে মার্টিনেজকে, জাস্ট ম্যাপে দেখছিলাম তাই আর কী।
অফিস থেকে বেরিয়ে মেরিন ড্রাইভে যাওয়া মনস্থ করলেন মার্টিনেজ। আসার আগে ইন্টারনেট থেকে দেখে এসেছেন মুম্বাইয়ের বিভিন্ন জায়গার ছবি । মেরিন ড্রাইভ তখনই নজর কেড়েছে তার। ড্রাইভারকে বললেন সেদিকে গাড়ি নিয়ে যেতে। যেতে যেতে শহরটাকে দেখতে লাগলেন তিনি। ব্যস্তসমস্ত মানুষজন, যন্ত্রের মতন যে যার কাজে চলেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেউ আড্ডা মারছে বা গল্পগুজব করছে দেখাই যায়। না। তবে যেটা দেখে মার্টিনেজের বেশ ভালো লাগল, সেটা হচ্ছে বান্দ্রা ওরলি সি লিঙ্ক। প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে সৌন্দর্যের মেলবন্ধন আগেও দেখেছেন তিনি। এই ব্রিজটির তারিফ করতে তাই আটকালো না তার।
আধঘণ্টা মেরিন ড্রাইভে সমুদ্রের ধারে বসে বেশ ভালো লাগল মার্টিনেজের। চমৎকার চওড়া ফুটপাথ। লোকে বসে আছে, ঘুরছে, বাচ্চারা খেলছে, কেউ কেউ গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। বাঁধানো তীরভূমি আধখানা চাঁদের মতন বেঁকে গেছে। সমুদ্রের ওধারে মুম্বাইয়ের স্কাইলাইন। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই, তার সুউচ্চ বহুতল আর মহার্ঘ দ্যুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গরবিনী রানির মতন। আর সবচেয়ে যেটা ভালো লাগল তাঁর, বিদেশি বলে কেউ তার দিকে অসভ্যের মতন হাঁ করে তাকিয়ে নেই, প্রাচ্যের অনেক দেশেই এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে তাকে পড়তে হয়েছে অনেকবার। স্বস্তিবোধ করলেন তিনি।
সন্ধ্যা নেমে আসছিল দ্রুত। আপনমনে হাঁটতে হাঁটতে বাঁধানো রাস্তার একদম শেষে চলে এসেছিলেন মার্টিনেজ। রাস্তা শেষ হতেই ছোট্ট একটা বিচ। তাতে যেন কার্নিভ্যাল বসেছে। একই সঙ্গে এত মানুষ, এত আলো, এত রং, এত উল্লাস কমই দেখেছেন তিনি।বুড়ো, জোয়ান, শিশু, পুরুষ, মহিলা, বেলুনবিক্রেতা, কাঁচের চুড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা, রোস্টেড কর্ন থেকে শুরু করে লোকাল ক্যান্ডি আর স্ন্যাকসের। দোকানে জায়গাটা জমজমাট।
উলটো দিকে ফিরলেন তিনি। রাস্তা পার হবেন, তারপর ওদিকের রাস্তায় গিয়ে ডানদিকের ফুটপাথ ধরবেন, তিন চার কিলোমিটার পরেই কোথাও তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কাছাকাছি গিয়ে ড্রাইভারকে কল করে নিলেই হল।সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, এমন সময় পাশেই চোখ গেল তার।
এক চল্লিশোর্ধ পুরুষ– মার্টিনেজের সমবয়সিই হবেন প্রায়–ফুটপাথের ধারে একটা উঁচু স্টুলে বসে এক বছর দশেকের ছেলের সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন; খুব সম্ভবত বাবা আর ছেলে। বাবা কানে কানে কিছু একটা মজার গল্প বলছেন, আর ছেলে সেই শুনে হেসে গড়িয়ে কুটিপাটি।
ধক করে বুকে একটা শেল এসে বিধল মার্টিনেজের। সব ঠিক থাকলে আজ তিনিও ফয়েসিয়া বা গুইশো বিচের ধারে বসে তিয়াগোর সঙ্গে এমনই মুহূর্ত কাটাতে পারতেন। তিনি তো আজ অবধি সজ্ঞানে কোনো পাপ করেননি। তবে কেন? তাঁকেই কেন তার স্নেহপুত্তলিটির জন্যে এইরকম উদভ্রান্তের মতন ঘুরে বেড়াতে হবে? জায়গায় জায়গায় দরজায় দরজায় ভিক্ষা করে বেড়াতে হবে? কী দোষ ছিল তার? কী দোষ। ছিল ওই দশ বছরের ছোট্ট শিশুটার? কবেকার কোন পূর্বপুরুষের পাপের দায় তাঁর ছেলেকে ভুগতে হবে কেন?
রাস্তার সিগন্যালের আলো পাল্টাতেই শোকে অভিভূত অন্ধের মতনই রাস্তা পেরোলেন মার্টিনেজ। তারপর ডানদিকে ঘোরার বদলে পথ ভুলে সোজা উল্টোদিকের রাস্তায় ঢুকে পড়লেন।
অক্টোবর মাসের ভারতের উজ্জ্বল আকাশ মাথার ওপর। পূর্বদিকের আকাশে তখন বৃষরাশির উদয় হচ্ছে, রোহিণী নক্ষত্র পূর্ণপ্রেমদৃষ্টিতে চাইলেন সদ্য উদয় হওয়া চাঁদের প্রতি। পশ্চিম আকাশে তখন শৌরি বা হারকিউলিস নক্ষত্রমণ্ডল। আর মাথার ওপর পূর্ব ও উত্তর ভাদ্রপদ নক্ষত্র দ্বারা বেষ্টিত পেগাসাস নক্ষত্রক্ষেত্র। পেগাসাস উড়তে শুরু করল!
.
১৭৫৫। সেপ্টেম্বর। স্বিনভান লেক, হোলার, আইসল্যান্ড।
ইস্তানবুলে তখন আপাতশান্তির আড়ালে ঘনিয়ে আসছে ক্ষয়িষ্ণুতার কাল। অটোমান। সাম্রাজ্যের তখন বদ্ধতার সময়, শাসনক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত সুলতান প্রথম মেহমুদ।রাশিয়া। তখন ইওরোপের নতুন উদীয়মান শক্তি। তাদের সঙ্গে লড়াই বেঁধেছিল সুইডেনের। সেই গ্রেট নর্দান ওয়রের সময় সুইডেনের পক্ষ নেওয়ার জন্যে এবং পরাজিত সুইডেনসম্রাট। দ্বাদশ চার্লসকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে ইতিমধ্যেই অটোমান সাম্রাজ্য রাশিয়ার। চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন এই ক্ষীয়মাণ সাম্রাজ্যের শিরঃপীড়া হয়ে উঠেছে ইয়েনিসারি বা জ্যানিসারিদের বিদ্রোহ। এককালে। যারা ছিল ইওরোপের দুর্ধর্ষতম প্রতিরক্ষাবাহিনী, তুর্কিসাম্রাজ্যের সেরা অস্ত্র, আজ তারাই সম্রাটের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত।
