এক্সরসিজমও অবশ্য কম যন্ত্রণার নয় এবং দৈহিক অত্যাচারেরও শেষ থাকে না তাতে। দুর্বল শরীরের অনেকেই ওতে মারা যায়, অনেকেই পঙ্গু হয়ে পড়ে। এক্সরসিজমের পরেও সুস্থ সবলভাবে বেঁচে থাকতে খুব কম লোককেই দেখা গেছে। তবে এত হ্যাঁপা পোয়ানোর আগেই এক রাতে বেশ কিছু টাকাপয়সা হাতিয়ে চম্পট দেয় জর্জি।
সালটা সতেরশো ছত্রিশ।
ভাজ পরিবার ছেলে হারানোর কষ্টে থাকলেও একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। জর্জিনহো পরিবারের বড় ছেলে। স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম ভাঁজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান ষোল বছরের গণ্ডী পার করেছে। যেখানেই থাকুক না কেন সে, নিশ্চয়ই বেঁচেবর্তে আছে।এই আশাতেই দিনাতিপাত করছিলেন জর্জি আর লিওর বাবা মা, অগাস্তিনহো আর কাসান্দ্রা। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে লিওনাদোর ওপর। হাসিখুশি ছেলেটি ক্রমশ জেদি, ভিতু, কুঁড়ে ও ঘরকুনো হয়ে পড়ে।
আর তারও উনিশ বছর পর এই বছর মার্চের সন্ধ্যায় হঠাৎ ছদ্মবেশে জর্জির। উদয়। কাসান্দ্রা প্রথমে চমকে গেছিলেন, তারপর বুকে জড়িয়ে ধরেন, বিহ্বল হয়ে পড়েন অগাস্তিনহোও। তারপরেই কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারীদের দায়িত্বে চিলেকোঠার ঘরে লুকিয়ে রাখা হয় জর্জিকে। পঞ্চম জন মারা গেছেন দু বছর আগে, এখন সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত প্রথম জোসেফ। প্রয়াত সম্রাটের আদেশ নাকচ করে নতুন আদেশ জারি করার জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। গোপনে সেই ব্যবস্থাই করতে শুরু করেন অগাস্তিনহো।
জর্জির বয়েস এখন পঁয়ত্রিশ, লিও এখন পঁচিশ বছরের তরুণ। দাদাকে দেখে সব থেকে বেশি আনন্দ তারই হয়। সারাদিন ধরে সে পড়ে থাকে চিলেকোঠায়, শোনে এই ষোলো বছরে কী কী করেছে দাদা। চমকপ্রদ সেই আখ্যান শুনে মোহিত হয়ে যায় লিও।
পড়াশোনায় জর্জির কোনোদিনই তেমন মন ছিল না। তার মন জুড়ে ছিল তন্ত্রমন্ত্র, জাদুবিদ্যা, অতিপ্রাকৃতিক শক্তির খোঁজ। বাড়ি থেকে পালিয়ে সে প্রথমে যায় বাভারিয়াতে। সেখানকার জঙ্গলে বুড়ো শয়তান নামে খ্যাত এক বৃদ্ধ শামানিস্টের কাছে সে দানবমন্ত্রে সিদ্ধিলাভ করে। তারপর ফ্র্যাঙ্কোনিয়া আর স্যাক্সনি পেরিয়ে যায়। অস্ট্রিয়ার উত্তরে মোরাভিয়াতে। সেখানে রাজপরিবারে রাজকন্যার বেশ ধরে একজন ডাইনি অবস্থান করছিলেন, তাঁর সঙ্গে জর্জির আলাপ হয় এক বিচিত্র উপায়ে। সেই ডাইনির কাছে জর্জি শেখে শবসাধনা, শেখে মৃতদেহের মধ্যে নিজের আত্মাকে প্রবেশ করানোর বিদ্যা।
তারপর সেখান থেকে তার পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়লে সে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে যায় হাঙ্গেরি। ততদিনে তার কাছে জমানো টাকা প্রায় শেষ। সেখানে প্রায় ভিক্ষা করে বেঁচে ছিল সে। শেষে এক পথচারীর কাছ থেকে কিছু টাকা চুরি করে সে পাড়ি দেয় ট্রানসিলভানিয়াতে। _ ট্রানসিলভানিয়াতে এক জিপসি দলে ভিড়ে যায় জর্জি। ভালো ব্যবহার আর চমৎকার কথা বলতে পারার জন্যে অল্পদিনের মধ্যেই দলের কত্রীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে সে। সঙ্গে বংশগত ভাবে পাওয়া রূপ তো ছিলই। সেই মহিলার কাছেও বলকান অঞ্চলের এবং স্যাক্সন জনজাতির অনেক হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন জাদুবিদ্যা শেখে সে। শেখে পশুপাখির ভাষা, শেখে কেউটে সাপ আর জংলি নেকড়ে পোষ মানানোর মন্ত্র, শেখে সাপের বিষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষের প্রতিষেধক প্রক্রিয়া।
আরও শেখে মানুষের ভাগ্য গণনা করার পদ্ধতি। সেই মধ্যবয়সী রমণী যত্ন করে জাদুর জগতের অনেক ঝাপি তার সামনে খুলে দেয়। শোনে জাদুবিদ্যা আর ব্ল্যাক আর্টের ওপর অসংখ্য বই ও পাণ্ডুলিপির কথা, যার অধিকাংশই চার্চের আদেশে পুড়িয়ে ফেলা। হয়েছে। শোনে গ্র্যান্ড গ্রিমোয়ার বা রেড ড্রাগন, দ্য নেক্রোম্যান্সিয়া, ওয়েরা লিন্ডা, দ্য পিকাট্রিক্স ইত্যাদি জাদুজগৎ কঁপানো বিখ্যাত গ্রিমোয়ার গুলির কথা।
বদলে সেই জাদুকরীর কাছে নিজের কৌমার্যটুকু হারাতে হয় জর্জিনহোকে।
আর সেখানেই সে শোনে আইসল্যান্ডের এই হোলার অঞ্চলের কথা। শোনে ইওরোপের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে শক্তিশালী শয়তানের উপাসকের কথা। শোনে তাঁর লেখা সবচেয়ে অলৌকিক, সবচেয়ে রহস্যময়, সবচেয়ে ভয়ংকরী ডাকিনীবিদ্যার বইটির নাম। যে বইটির একটিই মাত্র কপি ছিল এবং সেই অসীম শক্তিশালী তন্ত্রসাধকের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের সঙ্গে সেই বইটিকেও কবর দেওয়া হয়।
এরপর আজ থেকে পাঁচ বছর আগে জিপসির দল তাকে এক বসন্তের প্রারম্ভে ছেড়ে দেয় অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তানবুলের বাইরে। ছেড়ে দেওয়ার আগে সেই মধ্যবয়সি মহিলা বিদায়চুম্বনের পর একটি অদ্ভুত কথা বলেন, সিংহ রাশির উদয়কালে মঙ্গল ও রাহুর গ্রহযোগে তোমার জন্ম। আজ থেকে আর পাঁচটির বেশি বসন্ত দেখার সৌভাগ্য তোমার নেই। শুধু শুনে রাখো, অনন্ত বিষাদের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে মহত্বের সৌন্দর্য, কুটিল মরণের মধ্যেও শোনা যায় মুক্তির গাথা। মৃত্যুও তোমার পায়ে চুম্বন করার অপেক্ষায় ধন্য করবে নিজেকে। আর শোনো, জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কর্তব্য পালন করতে যাওয়ার দিনে নিজের ছায়াকে সঙ্গে রেখো।
.
২০১৬। নয় অক্টোবর, সপ্তমী, সোমবার। মুম্বাই
কনস্যুলেটের কাজ মেটাতে বিকেলই হয়ে গেল মার্টিনেজের। তার আসল পরিচয় জানতেন শুধু কনসাল জেনারেল। তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সব ব্যবস্থা করে দিলেন।গোয়াতে ফ্লাইটেই যেতে পারতেন মার্টিনেজ, কিন্তু তিনি শুনেছেন কোঙ্কণ রেলপথের অপূর্ব সৌন্দর্যের কথা। কাজেই তার ইচ্ছেমতোই একটা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কাটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওখানে এখনও কিছু পোর্তুগীজ প্রপার্টি আছে, মুম্বাইয়ের কনস্যুলেটই তার দেখভাল করে। সেখানেই তার থাকার ব্যবস্থাও করা আছে। এ ছাড়াও তার ঘোরাফেরার জন্যে একটা গাড়ি সর্বক্ষণের জন্যে প্রস্তুত থাকবে, যেখানে বলবেন সেখানেই যেতে পারেন তিনি।
