মৌলবাদের সৃষ্টি ও টিকে থাকার পেছনে এই শ্রেণীগত অবদান বিরাট হলেও, এটিও ঠিক যে, সংখ্যায় কম হলেও, কিছু মানুষ নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এদের দােসর হয়। কিন্তু এদের এ বিশ্বাস বিকৃত ধর্মবিশ্বাস। বিকৃত এই কারণে যে, শুদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে অন্যকে ছোট করার বা অন্য ধর্মের মানুষদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তীব্রভাবে মোটেই থাকে না। তবু আর এস এস-বিজেপি চক্ৰ বা জামাতে ইসলামীর মত হিন্দু-মুসলিম সব মৌলবাদীদের মধ্যেই এমন হিন্দুত্ব বা ইসলামের প্রতি আনুগত্যের কারণে সচেতন বা অসচেতনভাবে তাদের খপ্পরে গিয়ে পড়া ব্যক্তির অভাব নেই। কিন্তু মৌলবাদীদের মধ্যে পাল্লা ভারী মেকী ধর্মানুগতদের দিকেই।
হিন্দুমহাসভার মত হিন্দু মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভূস্বামীদের স্বাৰ্থ রক্ষণ করা। মহাসভার সভাপতি ভি. ডি. সাভারকর তাঁর ‘হিন্দুরাষ্ট্র দর্শন’-এ ভূস্বামী ও প্রজার মধ্যে কোনো ‘স্বার্থপর’ শ্রেণীগত বিরোধের নিন্দা করেন। যুক্তপ্রদেশ থেকে পাঞ্জাব—নানা রাজ্যে মুসলিম লীগও প্রধানত নির্ভর করত। স্বধর্মের ভূস্বামীদের উপর। এইসবু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির দুস্বামীদের আসল লক্ষ্য ছিল ধৰ্মরক্ষার চেয়ে নিজ শ্রেণীস্বার্থ বজায় রাখা।
জামাতে ইসলামীর মধ্যেও ইসলামের প্রতি অশ্রুপাত করা লোকেদের চরিত্র এমন মেকী মুসলিমেরই। বদরুদিন উমর তার মৌলবাদের বাঙলাদেশী সংস্করণ’ প্রবন্ধে (১৬ই এপ্রিল ১৯৯২ সাপ্তাহিক খবরের কাগজ’-এ প্রথম প্রকাশিত) যেমন জানিয়েছেন, ‘এদেশে সব থেকে জনপ্রিয়া’ বলে কথিত এক অর্ধশিক্ষিত (সাধারণ শিক্ষা তো বটেই এমন কি ইসলামিয়াত এবং ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে এর কোন ধারণা নেই) জামাতী ওয়াজকর নেওয়ালা ইসলামের নামে প্রত্যেক ওয়াজের জন্য বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার টাকা ফি নিয়ে থাকে। এটা তার ব্যবসা। ধর্মীয় মৌলবাদের নামে ব্যবসাদারী বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদীদের একটি বৈশিষ্ট্য। সকলেই যে উপরোক্ত অর্ধশিক্ষিত মৌলভীর মত ওয়াজ করে ধন অর্জন করে তা নয়। এরা কেউ ব্যাংকের ডিরেকটর, কেউ হাসপাতালের ডিরেকটর, কেউ কোন বিদেশী পাইপ লাইনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যেভাবেই হোক, এদের নেতৃত্বের প্রধান অংশটিই এভাবে ইহকালে আখের গোছাতে ব্যস্ত।’
পাকিস্তানেও, জিয়াউল হকের সময় ছিল মৌলবাদী উত্থানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাল। এই সময়ও কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছিল। কিন্তু তার মূল চরিত্রটি ছিল বিদেশী,-বিশেষত সাম্রাজ্যবাদী ও অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদী দেশের ঋণ নিয়ে নানাভাবে তার সাহায্যে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শ্ৰীবৃদ্ধি ঘটানো। দরিদ্রদের জন্য তার কোন ভূমিকা ছিল না, বরং নেতিবাচক প্রভাবই ছিল। তাই দেখা যায় ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানের গ্রামে দারিদ্র্য সীমার নীচের মানুষ ছিল শতকরা ৩৫ ভাগ, ১৯৭৯-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় শতকরা ৩৭ ভাগ। জিয়া-অৰ্থনীতির সামগ্রিক চরিত্রের আঁচ এ থেকে পাওয়া যায়। আর এই অবস্থায় একদিকে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ দরিদ্র জনসাধারণকে ভুলিয়ে রাখতে ধর্মের আফিম গেলাবে এবং অন্যদিকে নিজেরাও ধর্মকে আঁকড়ে রাখবে (অর্থাৎ ধর্মানুসরণের ভান করবে)-এতে অস্বাভাবিকত্ব হয়তো বিশেষ কিছু নেই। হিন্দু বিরোধিতা, বাঙলাদেশ বিরোধিতা (এবং বাঙলাদেশের মুসলিমরা প্রকৃত মুসলিম নয়—এমন প্রচার) ইত্যাদিও এই কারণেই করতে হয়।
আখের গোছানোর ধান্দায় ব্যস্ত মানুষেরা মৌলবাদীদের পুষ্টি জোগানো, এমনকি উত্থান ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাহায্য করলেও, শুধু এটিই মৌলবাদ সৃষ্টির প্রধান দিক নয়। আগেই বলা হয়েছে, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস, ধর্মান্ধতা, আপন অস্তিত্বের সঙ্গে ধর্মপরিচয়কে একাত্ম করে তোলা এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, মতাদর্শ বা ভিন্ন ধর্মের দ্বারা এই ধর্মের তথা আপন অস্তিত্বের বিপন্নতাবোধের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি যেমন এই সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে, তেমনি বিশেষ শ্রেণীর আধিপত্যকামী, নেতৃত্ব লোভী, অর্থনৈতিক সুবিধাবাদী মানসিকতাও এই সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু এটিও সব নয়। ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টির পেছনে আরেকটি বড় ভূমিকা পালন করে, জনসাধারণের সামনে উপযুক্তভাবে সংগঠিত সঠিক দিশার শূন্যতাও।
এই দিশাকে মার্কসীয় দর্শন অনুসারী হতেই হবে তার কোন মানে নেই। প্রকৃতই ধর্মনিরপেক্ষ উদার মতাদর্শও যদি সংগঠিতভাবে জনগণের নেতৃত্ব দিতে ও তাদের সমস্যার সমাধানে নিজের আন্তরিক ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাদের আস্থা অর্জন করতে ও জনগণের বৃহদংশের মধ্যে বৈজ্ঞানিক, ধর্মনিরপেক্ষ, উদার, মানবতাবাদী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারে (অন্তত তাদের সামনে তা রাখতে পারে), তাহলে মৌলবাদের সৃষ্টি ও বিস্তার ব্যাহত হতে বাধ্য। যখনই যেখানে এই শূন্যতা থাকে তখন, অন্যান্য শর্তসাপেক্ষে, ধর্মীয় মৌলবাদ এই শূন্যতা পূরণ করতে এবং জনগণের হতাশার সমাধান করার অভিনয় করে তাদের বন্ধু হতে এগিয়ে আসে। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ধর্মকে এমন মৌলবাদী জঙ্গীপনা করতে হচ্ছে, কারণ আধুনিক বিশ্বে তথাকথিত ঐসব প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের অস্তিত্ব যে বিপন্ন তা অনুভব করা যাচ্ছে(৮), ফলত তার প্রতিক্রিয়ায় ধর্মের মূল বা শিকড়ে ফিরে যাওয়ার তাগিদটিকে অর্থনৈতিক শ্রেণী স্বার্থের সঙ্গে মেলাতে হচ্ছে। (কারণ এখনকার প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও সংকটের মুখে নিজেকে বাঁচাতে গ্যাট চুক্তি থেকে হাজারো কৌশল নিতে বাধ্য হচ্ছে। তবু দেশের মানুষের বেকারত্ব, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, ক্রম হ্রাসমান মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মাথাপিছু আয়, এগুলি রোধ করা যাচ্ছে না।)
