মৌলবাদ এইভাবে হতাশা ও নেতিবাচক অবস্থার ফসল। অলৌকিক শক্তির কল্পনা মানুষের আদিম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। অন্যান্য প্রাণী বা জীবজন্তু থেকে যে সব দিক মানুষকে গুণগতভাবে পৃথক করেছে, এটি তার অন্যতম। ধর্মের ও তার অনুশাসন-মূল্যবোধের সংকলন মানুষের মানবিক ইতিবাচক দিকেরই প্রকাশ, যদিও ক্রমশ তার শ্রেণী স্বার্থে ব্যবহারও ঘটেছে। কিন্তু নিজের সমাজ ও গোষ্ঠীকে সুশৃঙ্খলভাবে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা পশুদের গোষ্ঠী থেকে মানুষের সমাজকে আলাদা করে। এবং এর ফলেই মানুষ পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী তার চিন্তাভাবনা, সমাজ-অৰ্থনীতি তথা ধর্মেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কিন্তু যখন এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করা হয় এবং ধর্মের নাম করে মানুষে মানুষে চূড়ান্ত বৈরিতামূলক বিভেদ, পারস্পরিক ঘূণা ও ব্যাপক জনগণকে প্রতারণা করার মাধ্যমের সৃষ্টি করা হয়, তখন আর তা মানবিক ও ইতিবাচক থাকে না। তখন আর ধর্ম মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রাচীন তথা অন্তত তৎকালে প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করে না। বর্তমান পৃথিবীতে নতুন জ্ঞানের আলোয় ঈশ্বর বিশ্বাসের তথা ধর্ম বিশ্বাসের বৈপ্লবিক পরিমার্জনার প্রয়োজনও স্পষ্ট অনুভব করা যাচ্ছে। এ অবস্থাতেও ধর্ম যদি রাস্তা না ছেড়ে দেয় এবং ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার পাশাপাশি মানুষের মনুষ্যত্ব ও আর্থসামাজিক বিকাশকে আচ্ছন্ন করতে থাকে, তবে এই ক্রিয়াকাণ্ডের উচ্ছেদ করাটাই অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব।
কিন্তু এই দায়িত্ব যাদের করার কথা বা যাঁরা করবেন বলে প্ৰতিশ্রুতি দেন, তারা যদি সংগঠিত না হন এবং দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রেও যদি ফাঁকি থাকে, তবে ঐ শূন্যতার সুযোগে ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ মাথা তুলে চাড়া দেবেই। বাস্তবত দেখা গেছে। যখন জনগণকে নিয়ে সুস্থ সামাজিক সংগ্রাম পরিচালিত হয় ও তার জোয়ার আসে, তখন সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলো পিছু হঠতে বাধ্য হয়। কয়েক দশক আগে এই বাংলায় ব্যাপক বামপন্থী আন্দোলন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী জাতীয়তাবাদের প্রসার-প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। সত্তরের দশকের তথাকথিত নক্সাল আন্দোলনের সময়ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান আদৌ লক্ষণীয় ছিল না। কিন্তু সারা ভারতব্যাপী এই বৈপ্লবিক আন্দোলন (তার সমস্ত ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও)। যখন এক সময় ব্যর্থ হল এবং মানুষকে হতাশ করল, তখন নানা গুরুবাবা-মাতাজিদের জঙ্গী আবির্ভাব নতুন করে ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করল। ধর্মকে কিছু মানুষও আঁকড়ে ধরল শান্তি ও মুক্তির উপায় হিসাবে। এমন কি সংখ্যায় নগণ্য হলেও এমন লড়াকু নক্সাল’ কর্মীদের কেউ কেউ বিজেপি-র মত মৌলবাদী সংগঠনে যুক্ত হয়েছে—এমন উদাহরণও রয়েছে এবং ধাৰ্মিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে এমন উদাহরণ তো আছেই।
আরো আগে ভারতে যখন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জোয়ার এসেছে তখনও এই সব ধর্মীয় অপশক্তি মাথা চাড়া দিতে পারে নি। ‘১৯১৮ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত বছরগুলি ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম ও হিন্দু মুসলিম ঐক্য, উভয়েরই সুখকর সময়। ১৯২৬-এর পর বামপন্থার উত্থান, ট্রেড ইউনিয়নদের এবং যুব আন্দোলনের বৃদ্ধি এবং সাইমন কমিশন বিরোধী প্রতিবাদ আন্দোলন আবার জনগণকে উদ্দীপিত করে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কমিয়ে দেয়। ১৯৩০-৩৪-এ আইন অমান্য আন্দোলন গোটা দেশে ঝড় বইয়ে দেয়। হিন্দু ও মুসলিম সকলেই ব্যাপক সংখ্যায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। সাম্প্রদায়িক দলগুলি ও নেতারা হয়। কার্যত অবসর গ্ৰহণ করেন অথবা ইতস্ততভাবে জাতীয় আন্দোলনকে সমর্থন করেন।. ১৯২০-র দশকের শেষে ও ১৯৩০-এর দশকে ক্রমবর্ধমানভাবে হিন্দু, শিখ ও মুসলিম যুবক ও শ্রমিকরা এবং অনেক এলাকায় কৃষকরা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য তাকাচ্ছিলেন কমিউনিস্টদের, সমাজতন্ত্রীদের, নওজয়ান ভারত সভার, বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীদের এবং নেহরু ও সুভাষচন্দ্ৰ বসুর দিকে। মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, আর.এস.এস. এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক সংগঠনের প্রভাব ছিল নূ্যনতম।’ (বিপিনচন্দ্ৰ)
এই ভাবেই ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত বা ধর্মনিরপেক্ষ বৈপ্লবিক আন্দোলন যেমন সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের উত্থানে বাধা দেয়, তেমনি তাদের অভাবও তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
পৃথিবী জুড়েই বামপন্থী আন্দোলনের দুর্বলতা ও নানা ধরনের ভাঙ্গন, বিভ্রান্তি যেমন এখন জনমানসে কোন বিকল্প আশা জাগানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে মৌলবাদের উত্থানে এটিও বড় ভূমিকা পালন করছে। প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা ব্যক্তিরাও সংগঠিত লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ নন। এ অবস্থায় সামাজিক-অৰ্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের হতাশা ঈশ্বর ও ধর্মকে আঁকড়ে রাখার তথা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের খপ্পরে পড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
আর তথাকথিত বামপন্থীরা বা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিরা যখন সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ও সাময়িক সমস্যাকে এড়ানোর জন্য ধর্মীয়, এমনকি ধর্মীয় মৌলবাদী অপশক্তির সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তাদের সহযোগী সংগ্ৰামী হিসাবে গ্ৰহণ করে এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তাদের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে, তখন জনসাধারণের সামনে আরো জটিল বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় এবং এই সব অপশক্তির গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে। এমনকি ধর্মীয় মৌলবাদীসাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা যাঁরা বলেন (যেমন ভারতে বামপন্থীরা ও কংগ্রেসীরা) তাঁরাও ঐক্যবদ্ধ নন। ছুৎমার্গ ত্যাগ করে অন্তত এই বিষয়ে যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ে, আবার নয়া ফ্যাসিস্ট ঐ ধর্মীয় অপশক্তিগুলির বিরুদ্ধেও লড়ে। ফলে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইটিও যেমন দুর্বল হয়, তেমনি তাদের আসল শত্রু কে তা নিয়েও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
