এর অন্য আরেকটি প্রতিফলন ঘটে, বিজ্ঞানের সাহায্যে (আসলে বিজ্ঞানের মৃত্যু ঘটিয়ে) অমানবিক হিংস্রতা প্রকাশে ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও। যে আধিপত্যকামী ঔদ্ধত্য আমেরিকার মত সাম্রাজ্যবাদী দেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, ঐ বৈশিষ্ট্য নিছক সরকারী নয়। জনমানসের বড় অংশ জুড়েই তা আছে এবং রাষ্ট্রীয় পরিচালন ব্যবস্থা এদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। এরই একটি প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৪৫-এ হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমাবর্ষণ নিয়ে আমেরিকাবাসীদের মতামত সম্পর্কিত একটি সমীক্ষায়। হিটলারকে লজা দিয়ে আমেরিকা তখন এই বোমাবর্ষণের মাধ্যমে অত্যাক্স সময়ে খুন করেছিল ২ লক্ষ ২০ হাজার নির্দোষ মানুষকে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে পঙ্গু-ব্যাধিগ্রস্ত করে দিয়েছে। এই ১৯৯৫-এর জুলাই মাসে করা একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, আমেরিকাবাসীর প্রায় অর্ধেকই হিরোসিমা-নাগাসাকিতে বোমাবর্ষণকে সমর্থনা করে এবং তার জন্য আমেরিকার অনুতপ্ত হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই বলেও মনে করে। বিশেষত যারা বয়স্ক তাদের মধ্যে এই বোধ আরো তীব্ৰ।(৭) প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ও আগের অধ্যায়েই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমেরিকার মৌলবাদী (ফান্ডামেন্টালিস্ট)-দের একটি বড় দাবী হচ্ছে উগ্র কমিউনিজম বিরোধী বৈদেশিক নীতির পাশাপাশি সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানো। সব মিলিয়ে শুধুমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিছক প্রসারই ধর্মীয় মৌলবাদের সৃষ্টিকে রোধ করতে যথেষ্ট নয়। এই মৌলবাদী হিংস্ৰতারই অন্য একটি দিক সাম্রাজ্যবাদী পাশবিকতা, যা তার অস্তিত্বের স্বার্থেবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে।
এটি তার অস্তিত্বের সংকট-অনুভবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যে অনুভব তাকে তথা তার প্রতিনিধিশ্রেণীকে ধর্মের দিকেও ঠেলে দেয়, এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার জন্ম দিতে সক্ষম। একদা প্রগতিশীল ও বৈজ্ঞানিক চেতনাসম্পন্ন বুর্জোয়াদের এই করুণ অবনমনের প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টমসন তার ‘An Essay on Religion’–a 335 করেছিলেন, ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ইতিহাসকে বিচার করলে ধনতন্ত্রের আসন্ন ধ্বংসের বাস্তব চিত্রটিই প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং এই বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হতে বুর্জেয়া চিন্তানায়কদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীকে ঘুরিয়ে ধরবার বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিত্যাগ করে দার্শনিক ভাববাদ বা দুজ্ঞেয়বাদে আশ্রয় নেবার একটি মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে!’ কিন্তু ধনতন্ত্রের আসন্ন ধ্বংসের’ বাস্তবতার কথা বল্লেও, ধনতন্ত্র এত সহজে রাস্তা ছাড়তে প্ৰস্তুত নয়। সে কৌশল পাল্টায়, চেহারায় ‘মেক আপ’ দেয়। ‘বিজ্ঞানেও অগ্রসর’ সাম্রাজ্যবাদী দেশে ধর্মের ব্যবহার, শক্তিশালীভাবে টিকে থাকা এবং ফান্ডামেন্টালিজম তথা মৌলবাদের সৃষ্টি, বিকাশ ও অস্তিত্বের পেছনে এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার মত, শিল্পবিপ্লবের সূতিকাগার ইংল্যান্ডেও একই ভাবে রাজতন্ত্রের প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় মানসিকতা এবং ধর্মের ব্যাপকতর ব্যবহার ও অস্তিত্ব বর্তমান।
অন্যদিকে পুঁজিবাদের অসম বিকাশের এলাকা এই ভারতীয় উপমহাদেশ। বুর্জেয়া বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব, রেনেসা—কোনটিই এখানে হয় নি। চূড়ান্ত বৈষম্যের আধা সামন্ততান্ত্রিক এই দেশ বিশ্বের নানা সাম্রাজ্যবাদী ও নয়া উপনিবেশবাদী দেশের অবাধ মৃগয়াক্ষেত্র। স্বাধীনভাবে সমস্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পর্কের রূপান্তর ঘটিয়ে পুঁজিবাদের প্রগতিশালী ভূমিকার বিকাশ এখানে ঘটে নি। কত বিচিত্র স্বার্থের কত বিচিত্র স্তরের শ্রেণীবিভাগ থাকে। এসব দেশে। এখনকার ধর্মীয় মৌলবাদের দ্রুতশক্তিবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই ধরনের বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধর্মীয় মৌলবাদীদের নেতৃস্থানীয়রা অবশ্যই শাসকশ্রেণীর একটি অংশ, যে অংশ তীব্রভাবে ধর্মকে ব্যবহার করতে চাইছে এবং অপর অংশের সঙ্গে এই বিশেষ
মৌলবাদের উৎস সন্ধানে br>
স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারছে। ধর্মকে এইভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা, নিজ ধর্মীয় মাহাত্ম্য ও মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা
তাদের জঙ্গীভাবে করতে হচ্ছে।
এবং এরা উৎসাহী সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে। পরবর্তী স্তরের অর্থাৎ মধ্যশ্রেণীর স্বচ্ছল গোষ্ঠীর পরিবারগুলিকে। বিশেষত উত্তর ভারতে বিগত দু’তিন দশকে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, তার ফলশ্রুতিতে উঠতি এই শ্রেণী নিজের অস্তিত্বের স্বার্থে এমন বিকল্প ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতিকে সুবিধাজনক হিসেবে অনুভব করেছে। নতুন শহুরে মধ্যশ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে যারা নানা ধরনের ঋণ, ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগের উৎসাহদান ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় সত্তরের দশক থেকে সংখ্যায় অনেক বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলেও কিছু এলাকায় সবুজ বিপ্লব (যেমন উত্তরপ্রদেশের নানা স্থানে) কিছু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে। প্রকৃত বুর্জেয়া বিকাশের অভাবের কারণে, মানসিকভাবে এই শ্রেণী এখনো সামন্ততান্ত্রিক,–ধৰ্ম-পূজা আচ্চা-সতীমাহাত্ম্য ইত্যাদি তাদের মনপ্ৰাণ জুড়েই ছড়িয়ে আছে। এই অবস্থায় নেতৃস্থানীয় হিন্দু মৌলবাদীদের জঙ্গী হিন্দুত্বের প্রচার এবং মুসলমানরা তাদের আধ্যাত্মিক-অর্থনৈতিক সবদিক থেকে বিপদগ্ৰস্ত করতে পারে, এমন ভয়ের সঞ্চার করার ফলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশই হিন্দু মৌলবাদকে আত্মরক্ষার প্রধান উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে। ছিন্নবিচ্ছিন্ন তথাকথিত হিন্দুদের একত্রিত করতে শুধু হিন্দুত্বের প্রচার নয়, রাম মাহাত্ম্যকে সুনির্দিষ্টভাবে সামনে রাখা এবং বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ‘রাম জন্মভূমি উদ্ধার’ (তার পরে আছে মথুরা, বেনারস ইত্যাদি ইত্যাদির শতশত ‘মন্দির’–অর্থাৎ এই উদ্ধার কর্মের দীর্ঘস্থায়ী ধারাবাহিকতার প্রচার)-এ ধরনের কর্মসূচীকেও তীব্রতার সঙ্গে হাজির করা হল। দূরদর্শনে রামায়ণের প্রদর্শন অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান প্ৰযুক্তিভিত্তিক, অতীব সক্রিয় ধর্মপ্রচারও এ ধরনের জঙ্গী কর্মসূচীর ক্ষেত্র প্রস্তুত করায় কিছুটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সমাজের একেবারে পিছিয়ে থাকা, দরিদ্রতম মেহনতী মানুষদের চেয়ে এই ধরনের মধ্যবর্তী ব্যক্তিরাই মৌলবাদের বড় সহচর। এরা কিছু সুযোগসুবিধা পেয়েছে, তাকে আরো বাড়াতে চায়, ভিন্নধর্মের মানুষদের হটিয়ে নিজেদের পথ পরিষ্কার করতে চায়। ফলে হিন্দু হিসেবে (বা বিশেষ ধর্মীয়গোষ্ঠী হিসেবে) নিজেদের অস্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বকে সুনিশ্চিত করার প্রশ্নের সঙ্গে এই অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা অর্জনের লক্ষ্যও মিলেমিশে যায়।
