সাম্প্রদায়িকতা শুধু ধর্মীয় নয়,-ভাষাগত, জাতিগত, প্রাদেশিক, এমন কি অঞ্চলগত বা গোষ্ঠীগতও হতে পারে। (মৌলবাদ এখনো এত বৈচিত্ৰ্য পায় নি।) এখানেও সাম্প্রদায়িকতার মূল দৃষ্টিভঙ্গী অক্ষুন্ন থাকে। অর্থাৎ এই ধরনের সাম্প্রদায়িকতাও শ্রেণী:স্বার্থের বিভিন্নতা উপেক্ষা করে ও মানুষকে এটি বোঝানোর চেষ্টা করে যে, ভিন্ন ভাষার, জাতির বা প্রদেশের সব মানুষই তার শত্রু (ভাষা আন্দোলনের মত আন্দোলন থেকে ভাষাগত সাম্প্রদায়িকতাবাদের এ একটি বড় তফাৎ), একই ভাষার বা জাতির বা প্রদেশের সবার স্বার্থ এক ইত্যাদি। আমরা বাঙালী’-র মত এমন সংগঠিত সাম্প্রদায়িকতা বা অহমীয়া-উড়িয়া ইত্যাদিদের মধ্যেকার আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িকতা দু এক দশক আগেও অনুপস্থিত ছিল। মৌলবাদের পাশাপাশি, এদের সৃষ্টির পেছনেও, সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবের সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান সংকট ও বিপন্নতাবোধ এবং ক্ষমতালিঙ্গু বিশেষ গোষ্ঠীর উসকানি প্রধান ভূমিকা পালন করে। বাঙালীদের স্বার্থ বুঝি মারোয়াড়িরাই (বা এ জাতীয় অন্যরা) বিপন্ন করে তুলেছে, এমন ধরনের প্রচার করা হয়। (যেমন করা হয়, ‘হিন্দু বা মুসলিমরা মুসলিম বা হিন্দুদের নানাবিধ সংকটের প্রধান কারণ—’ মুসলিম বা হিন্দু সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদীদের এমন কথাবাতাঁর মধ্য দিয়ে।) আসামে বা উড়িষ্যায়। ‘বাঙালী খেদাও’ কিংবা ইংল্যাণ্ডজার্মানিতে ‘এশিয়ান হটাও’ জাতীয় দেশি-বিদেশী অজস্র উগ্ৰ সাম্প্রদায়িকতাবাদী ফ্যাসিস্ট কায়দার আন্দোলনেও একই কাজ করা হয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের মত সর্বত্রই এ ধরনের সাম্প্রদায়িকতা এটি ভুলে যায় ও অন্যদের ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করে যে, বেকারত্ব থেকে শুরু করে নানা অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কয়েকজন জন্মসূত্রে বাঙালী, মারোয়াড়ী, এশিয়ান বা কৃষ্ণাঙ্গ ইত্যাদিরা নয়; তার প্রধান কারণ লুকিয়ে আছে নিজেদের অক্ষমতা ও অযোগ্যতার পাশাপাশি, প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই, যে ব্যবস্থা বৈষম্যভিত্তিক ও শোষণজীবী।
প্রকৃতপক্ষে এইভাবে সাম্প্রদায়িকতার ও মৌলবাদের সৃষ্টির মধ্যে এক সংকটের অনুভবের সঙ্গে হতাশাও মিশে থাকে। যে শাসকশ্রেণী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এই সংকট ও হতাশার মূলে তারা তাদের অস্তিত্বের স্বার্থে এই ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে (ও ধর্মীয় মৌলবাদকেও)। মদত দিতে থাকে। কারণ তারা স্পষ্টই অনুভব করে, এবং উল্লসিত ও নিশ্চিন্ত হয় এটি জেনে যে, এই ধরনের আন্দোলনে জনসাধারণ তার মূল শক্রকে চেনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তাদের সমস্ত উদ্যম ও উৎসাহ ভিন্নপথে চালিত হয়ে যায়, ফলত প্রকৃত শত্রু যে শ্রেণী ও গোষ্ঠী তাদের উৎখাত করায় জনসাধারণ কখনোই সফল হবে না।
আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরা যখন (পরবর্তীকালের ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মত)। কম্যুনিজম-কে প্রধান শত্রু হিসেবে গ্রহণ করা শুরু করে, তখন তার মধ্যে এদিকটি স্পষ্ট ধরা পড়ে। পরবর্তিত পরিস্থিতির অর্থনৈতিক সংকটে ভীত-সন্ত্রস্ত পুঁজিপতিরা তাদের অস্তিত্বের স্বার্থে কম্যুনিজম রুখতে ফান্ডামেন্টালিজমকে উৎসাহিত করে। এখনো প্রধানতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকায় এর (এবং তার আরো পরিমার্জিত রূপের) অস্তিত্ব এই সুগভীর স্বাৰ্থবোধকে পরিস্ফুট করে। এর ফলে আমেরিকার জনগণের সংকট কমে তো নি, বরং ক্রমবর্ধমান। যে সময়ে আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলির বহির্বিশ্বে ব্যবসা দ্বিগুণ হয়েছে, ঐ সময় আমেরিকার শ্রমিকদের গড় সাপ্তাহিক আয় কমেছে শতকরা ১৮ ভাগ, দরিদ্র আমেরিকানদের সংখ্যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যায় পৌঁছেছে এবং ৪০ বছর আগে আমেরিকানদের আয়ের যে বৈষম্য ছিল তা আরো বেড়েছে। বেকারি, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ইত্যাদিও ক্রমবর্ধমান। (নিউ ইয়র্কের কাউন্সিল অব ইন্টারন্যাশন্যাল অ্যাফেয়ার্সের সভাপতি ওয়ার্ড মোরেহাউসের প্রবন্ধ, ফ্রন্টলাইন, ২১.৫-৯৩)
আমেরিকার মানুষ মানেই পুঁজিপতি ও সাম্রাজ্যবাদী বা এই মানসিকতার,—তা আদৌ নয় এবং এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ থাকার কারণ নেই। কিন্তু যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় তারা রয়েছেন, সেটির চরিত্র এই এবং আমেরিকার জনগণের বৃহদংশই তার দ্বারা তথা তার প্রতিভূ মুষ্টিমেয়ের দ্বারা শাসিত ও শোষিত। আর ব্যাপারটি এত সূক্ষ্মভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমেরিকার জনগণের বৃহদংশই এ ব্যাপারে সচেতন নয়। তাই তাঁরা ধর্মেও আছেন, জিরাফেও (অর্থাৎ বিজ্ঞানপ্ৰযুক্তির ক্ষেত্রেও) আছেন। এরই একটি প্রতিফলন ঘটে, আমেরিকার ঈশ্বরবিশ্বাস ও ধর্মপরিচয় থেকে মুক্ত ব্যক্তির স্বল্পতা থেকে, যে স্বল্পতা আমেরিকার মত জ্ঞানে ও বিজ্ঞানে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশে কিছুটা স্ববিরোধী মনে হয়।(৬) আসলে তা স্ববিরোধী নয়, কারণ শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার নাও ঘটাতে পারে তথা ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিস্তার না-ও রোধ করতে পারে। এই বিজ্ঞানমনস্কতাই মানুষকে তার সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি অর্জনের ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যান্ত্রিক ও সংকীর্ণ স্বার্থে বিকৃত ব্যবহার বিজ্ঞানমনস্কতার পরিবর্তে যান্ত্রিকতার জন্ম দেয়। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আমেরিকায় প্রায় সর্বতোভাবে ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা দেশে কম বেশি, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ তথা শাসকশ্রেণীর সেবাদাস হিসেবেই নিয়োজিত।
