ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আর্যসমাজ, হিন্দু মহাসভা জাতীয় নানা হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠন গড়ে ওঠে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদী ঐতিহ্য-সচেতনতা—এসবের সাংগঠনিক বহিঃপ্রকাশ ছিল এই ধরনের সংস্থার সৃষ্টি। আর্যসমাজ শুরুতে পুরোহিতদের দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই করলেও পরে গোহত্যা বন্ধ করা ও উর্দুর পরিবর্তে দেবনাগরী লিপির হিন্দিভাষা প্রচলন করার মত আন্দোলনের দ্বারা এই সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করায় যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল। মদনমোহন মালব্য বা লালা লাজপত রাই-এর মত কংগ্রেসী নেতারা হিন্দু মহাসভাতেও সক্রিয় ছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে ১৯৩০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে কংগ্রেস এবং হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলির কর্মীরা প্রায় একই ব্যক্তি ছিলেন। পরবর্তীকালে গোলওয়ালকার বা সাভারকর-এর মত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা তথা মূলগতভাবে মৌলবাদীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ও ‘তাদের চর গান্ধীর’ বিরুদ্ধে হিন্দুদের সতর্ক করতে থাকেন। কংগ্রেসী নেতৃত্বের অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব জওহরলাল নেহরু ১৯৫৮-এর ১১মে কংগ্রেস অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় মন্তব্য করেছিলেন,-’সংখ্যাগরিষ্ঠের সাম্প্রদায়িকতা খুব সহজেই ‘জাতীয়’ বলে চালানো যায় এবং সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতাকে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে আখ্যা দিতেও দেরী হয় না।’ প্রকৃতপক্ষে কংগ্রেসের শুরুর দিকে এই ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠের সাম্প্রদায়িকতাকেই জাতীয়তাবাদ বলে ভাবা হয়েছে এবং পরবর্তী কালে আর এস এস-বিশ্বহিন্দু পরিষদ-জনসংঘ বা বিজেপি-র মত সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী হিন্দু সংগঠনগুলি এই মানসিকতাকেই প্রধান ও তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরেছে। কংগ্রেস যখন হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা সম্পূক্ত জাতীয়তাবাদকে ধীরে ধীরে পরিত্যাগ বা পরিমার্জিত করেছে, তখন ঐ শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে এই সব হিন্দুত্ববাদীরা।
অন্যদিকে মুসলিমদের একাংশ এক সময় যেমন কংগ্রেসের আপাত সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করে প্রচার করেছে এবং সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করেছে, তেমনি পরবর্তীকালে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের আরো সংগঠিত ও জঙ্গী করে তুলেছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের সৃষ্টি করেছে। মুসলিমদের মধ্যকার এই প্রতিক্রিয়া অনেকটা স্বাভাবিকভাবে সৃষ্টি হলেও, তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিহ্নিত করার ও প্রচার করার কাজটিও হিন্দুত্ববাদীরা সুকৌশলে তীব্রতর করেছে। মুসলিমদের অভারতীয়, ভারতীয়তত্ত্বের শিকড় বহির্ভূত, বহিরাগত ইত্যাদি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসবের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা দেখে তখনকার উগ্ৰ সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে ফ্যাসিবাদের মিল অনেকে(৪) অনুভব করেন। অনেকে এও লক্ষ্য করেন যে ১৯৩৭-এর পর সাম্প্রদায়িকতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছিল, যা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ধর্মীয় মৌলবাদে রূপান্তরের সময় বলে চিহ্নিত করা যায়।
কিন্তু, এই রূপান্তরের পেছনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া আরো বহুজনের অতীত ও সাম্প্রতিক ক্রিয়াকাণ্ডও যে ভূমিকা পালন করেছে এবং মৌলবাদী শক্তিকে রসদ জোগানের কাজে অংশগ্রহণ করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। দক্ষিণপন্থীদের মধ্যকার তো বটেই, এমন কি বামপন্থী নামে চিহ্নিত কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা বুদ্ধিজীবীরা যখন নিজেদের ও সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য স্বাধসিদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে থাকে, তখন ধর্মের এই ক্রমরূপান্তর রোধ করা মুস্কিল। এর অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, মহাত্মা গান্ধী সহ সামগ্রিকভাবে কংগ্রেসকে এবং বামপন্থীদের সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদী বলা হচ্ছে। এরা সচেতনভাবে ধর্মকে সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন, তা হয়তো ততটা নয়, যতটা নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যে নিজ ধর্মবিশ্বাস (যেমন মূলত হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস), ধর্মীয় পরিচয়, ঈশ্বর বিশ্বাস, বিশেষ ধর্মগ্রন্থের কথাবার্তা ইত্যাদির প্রতিফলনকে সচেতনভাবে পরিহার করার ব্যাপারে অক্ষম হয়েছিলেন। এই অক্ষমতা মৌলবাদ প্রতিরোধে তাদের অক্ষমতারই অংশ।
এবং এইভাবে ধর্মবিশ্বাসের সাম্প্রদায়িক রূপান্তরও ঘটে। ধর্মীয় মৌলবাদী হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত সাম্প্রদায়িক হওয়া। সব ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা মৌলবাদী নয়, কিন্তু সব ধর্মীয় মৌলবাদীরা অবশ্যই সাম্প্রদায়িক। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, বারংবার বলা দরকার, এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গী, যেটিতে প্রাথমিকভাবে মানুষকে মানুষ হিসাবে গণ্য না করে বিশেষ এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হিসাবেই গণ্য করা হয়। অর্থাৎ মানুষের এই কৃত্রিম ধর্মীয় পরিচয়ই তাদের কাছে প্রধান পরিচয়। উপরন্তু এটি আসলে আপনি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ও ধর্মকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে(৫) আর ভিন্ন ধৰ্মসম্প্রদায়ের সবাইকেই শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, এবং অবশ্যই স্বাভাবিকভাবে শ্রেণী:নিবিশেষে আপন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সবার স্বার্থকে অভিন্ন বলে বিশ্বাস করতে শেখায়। মৌলবাদ এসব তো করেই, উপরন্তু সে নিজ ধর্মের বিশুদ্ধ মূল রূপকে (যা অবশ্য বিতর্কিত) পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপরেও জোর দেয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের কাছে এই ধর্মীয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি ততটা গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু এ দুটি এবং ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদও, ‘নুনচিনির সরবতের মত পরস্পরের সঙ্গে মিশে থাকে, শুধু কখনো নুন বা চিনির মাত্রার হেরফের ঘটে মাত্র। এরা সবাই এটিও প্রচার করার চেষ্টা করে যে, নিজ ধর্মের নির্দেশিত পথেই জনসাধারণের সব সমস্যার সমাধান হবে। যেহেতু এই প্রচার সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবৈজ্ঞানিক, তাই বিপজ্জনকও বটে। এবং প্রকৃতপক্ষে এর মধ্য দিয়ে নিজ সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী:ই, জনসাধারণ নয়,–তারা শুধু প্ৰতারিত হয় এবং তাদের ধর্মবিশ্বাস এদের হাতে ধৰ্ষিত হয় মাত্র।
