ভারতের মাটিতে ঐ উলামা-দিয়ানন্দদের দল যদি না থাকত। তবে ইংরেজদের সাধ্য ছিল না। সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার। এরা আপন ধর্মের অভ্যুত্থান ঘটানোর বা মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার নামে সাম্প্রদায়িকতার ও পরবর্তীকালে মৌলবাদের পিতৃত্বের (হয়তো বা অজানিত ভাবে) ‘গৌরব অর্জন করেছে। সমাজের বিশেষ কিছু অর্থনৈতিক অবস্থানের মানুষেরা (যেমন বিপন্ন অস্তিত্বের জমিদার গোষ্ঠী, নতুন গজিয়ে ওঠা গ্ৰাম্য জোতদার শ্রেণী, মহাজন, ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা) নিজেদের সংকীর্ণ শ্রেণী:স্বাৰ্থ বজায় রাখতে তথা সম্পদ-প্রতিপত্তি বাড়াতে রাজনীতির মধ্যে ধর্মের অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত ও ব্যবহার করছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর বুদ্ধিজীবীদের বৃহদংশ এদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছিল; এরাই শিক্ষাদীক্ষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ গঠন, সংবাদপত্র প্রকাশনার মাধ্যমে জনমত গঠন, ইত্যাদির নেতৃত্ব দিত এবং এরাই হাতের কাছে ধর্মকে পেয়ে তাকেই বা অন্য কিছু না পেয়ে ধর্মকেই ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। এরা স্বাভাবিকভাবেই বুঝেছিল যে, সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে ভাঙ্গিয়ে নিজের নেতৃত্ব ও শ্রেণীস্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কারণ, ধর্ম যে যুক্তিবোধহীন আনুগত্য, অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস তথা সমাজ সম্পর্কে শ্রেণীসচেতনতা-মুক্ত ধারণাবলীর শিক্ষা দেয়, ঐ সব শিক্ষা সমাজের উপরতলার ব্যক্তিদের স্বাৰ্থপুষ্ট করার ক্ষেত্রে সঙ্গতিপূর্ণ।
এইভাবে ধর্মকে ধনী-দরিদ্রদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে নামিয়ে তারা রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা শুরু করে। তারা এমন মানসিকতাকে সুকৌশলে প্রতিষ্ঠা করতে থাকে যে, মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রধানতম দিক হচ্ছে ধর্মপরিচয়, তাই নিজ অস্তিত্বের স্বার্থে ধৰ্মরক্ষা প্রয়োজন এবং আপনি ধর্মের সবাই সুহৃদ, তাদের সবার স্বাৰ্থ এক। অর্থাৎ বিশুদ্ধ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি শুরু হয়। স্বদেশের ও নিজ ধর্মের শাসকশ্রেণীর উপর সামান্য আঘাত না করে শুধু বৃটিশদের হটিয়ে দেশের দরিদ্র জনসাধারণের লাভ যে আসলে বিশেষ কিছুই হবে না—এ বোধকে জগতে না দিয়ে, এই সামন্ত ও উঠতি পুঁজিপতি গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা দেশবাসীর মনে এই বোধকেই প্রতিষ্ঠিত করল যে, বিদেশী ও স্বদেশী উভয় শাসককে নয়, শুধু বৃটিশদের হঠানোই একমাত্র কাজ তথা স্বাধীনতা আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদ। এই শ্রেণী নিতে চেয়েছিল বিদেশী শাসক হটিয়ে স্বদেশী শাসকের ভূমিকা এবং তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলনের পর তাই-ই হয়েছে। এই লক্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে তারা বিশেষ ধর্মকেই সুবিধাজনক মাধ্যম হিসেবে অনুভব করেছে ও গ্রহণ করেছে। তাই বঙ্কিমের ‘বন্দেমাতরম’ হিন্দু-গন্ধে ভরা, গান্ধীর স্বাধীনতা আন্দোলন হিন্দুরসে জারিত (শত ঐক্যের কথা বলেও) এবং পাকিস্তানকামীদের কাছে তো ইসলাম ধর্মই ছিল একমাত্র ভিত্তি। এইভাবে এরা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে খুচিয়ে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলেছে এবং আগুন নিয়ে খেলা করেছে। এখন এ খেলার রিং-মাস্টার হিন্দু-মুসলিম মৌলবাদীরা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ইংরেজরা ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয়দের বিভাজন ক’রে, তাদের ঐক্য বিনষ্ট করে, শাসন করার কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। ম্যালকম (১৮১৩) থেকে এর শুরু। ১৮৫৮-তে লর্ড এলফিনস্টোন বলেছিলেন। ‘ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল ছিল প্রাচীন রোমান নীতি এবং আমাদের তা গ্ৰহণ করা উচিত’। ১৮৬২-তে ভারতের রাষ্ট্রসচিব চার্লস উড ভাইসরয়কে জানিয়েছিলেন, ভারতের ‘জাতিগুলির’ অন্তৰ্দ্ধন্দ্বই ভারতে ইংরেজদের শক্তি যোগাবে এবং তাই ‘এই বিভেদকারী শক্তিকে জিইয়ে রাখতে হবে, কারণ সমগ্ৰ ভারত আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলে আর কতদিন আমরা টিকে থাকতে পারব?’ ১৮৮৭-তে রাষ্ট্রসচিব ক্রস ভাইসরয়কে লিখেছিলেন, ‘এই ধর্মীয় মনোভাবের বিভাগ আমাদের পক্ষে খুবই সুবিধাজনক’। ১৯২৫-এ রাষ্ট্রসচিব বার্কেনহেড ভাইসরয়কে লিখেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হোক, সবসময় সর্বান্তকরণে আমি এই আশা রাখছি।’ চাৰ্চিলও এই নীতি অনুসরণ করে গেছেন এবং ভারতের বৃটিশ প্রশাসন মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদের উল্টো পাল্লার ওজন হিসাবে’ চিরকাল ব্যবহার করে গেছে। হিন্দু ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী উভয় সম্প্রদায়ের জাতীয়তাবাদী ‘মহান’ নেতারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই বিলিতি নীতিকে উৎসাহিত করেছেন, — অবশ্যই নিজ স্বার্থে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৃটিশদের আবিষ্কার করা এই ধর্মীয় বিভাজনের পদ্ধতি শক্তিশালী ও উৎসাহিত হয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ধমীর্ণয় পুনরভ্যুত্থানবাদীদের দ্বারা। হিন্দু ‘জাতীয়তাবাদী’ ও মুসলিম ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীরা’ অনেকাংশে এই শক্তি ও উৎসাহের ফসল।
ধর্মনিরপেক্ষ, শ্রেণী সচেতন, জনগণের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন নয়,-ধৰ্ম-সম্পূক্ত, শ্রেণী-নিরাসক্ত, স্বদেশীয় অভিজাতদের (ভবিষ্যতের শাসকবৃন্দের!!) নেতৃত্বাধীন তথাকথিত বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, কোন না কোনভাবে সরাসরি বৃটিশ আধিপত্য হয়তো কমিয়েছে, কিন্তু তা একই সঙ্গে দেশবাসীকে দীর্ঘস্থায়ী বৃহত্তর দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে—এই দাসত্ব ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাসী মানসিকতার দাসত্ব, যা ক্রমশ মৌলবাদী দৈত্যের জন্ম দিয়েছে। (একই সঙ্গে স্বদেশী সামন্ত পুঁজিপতি ও শাসকশ্রেণীর দাসত্বও।)
