ধর্মের অস্তিত্বের সংকটের সময়ে (অন্তত যখন এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে ভাবা হয়), তখন সম্ভবামি যুগে যুগে’-র এই ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদ থেকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পুনরভ্যুত্থানবাদের মধ্যে ধর্মের বিপন্ন অস্তিত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার আকাঙক্ষাই প্রধানতম। বিশুদ্ধ ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদীরা লড়াই করে তাদের বিরুদ্ধে বা সেই চিন্তা ও শক্তির বিরুদ্ধে যারা বা যা তাদের ধর্মকে হতমান করে অথবা যখন সামগ্রিক ভাবে ‘ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি’। এক্ষেত্রে বিশেষ ভিন্ন ধর্ম এই ভূমিকা পালন করলে তার বিরুদ্ধেও লড়াই চলে, অন্যথায় সাধারণভাবে এর মধ্যে বিশেষ সম্প্রদায়কে হেয় করা বা আপন সম্প্রদায় থেকে পৃথক করার মানসিকতা বিশেষ গুরুত্ব পায় না। পুনরভ্যুত্থানবাদীদের মধ্যে ধর্মের শ্রেণীগত স্বাৰ্থ সংশ্লিষ্ট থাকলেও, ধর্মপ্রতিষ্ঠার আপাত সদিচ্ছার তুলনায় তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কিন্তু ধর্মীয় পুনরভুত্থানবাদের তীব্রতা প্রায়শই তার এই নিছক ধর্মমাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙক্ষাকে ছাড়িয়ে সম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, অন্তত তাদের জন্মদাতার ভূমিকা পালন করে। ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার যুক্তিহীন আবেগ প্রায়শঃই পুনরভ্যুত্থানবাদীদের নিজ ধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার, আপন ধর্মের মূল নিষ্কলুষ অবস্থাকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার ও বিরুদ্ধবাদী চিন্তাকে হিংস্রভাবে মোকাবিলা করার দিকে ঠেলে দেয়, অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী করে তোলে। ইয়োরোপে প্রোটেস্টাণ্টদের মধ্যে অষ্টাদশ শতকে উদ্ভূত রিভাইভ্যালিজম উত্তর আমেরিকায় প্রসারিত হওয়ার পর, ঊনবিংশ শতকে ফান্ডামেন্টালিজ সৃষ্টির পথকে সুগম করেছে; অবশ্যই এক্ষেত্রে বিবর্তনবাদ ও মার্কসবাদ জাতীয় বৈপ্লবিক চিন্তা ইন্ধন জুগিয়েছে এবং ক্রমশঃ পরিবর্তিত অর্থনৈতিক অবস্থায় নতুনতর মাত্রার শ্রেণীদ্বন্দ্ব অনুঘটকের কাজ করেছে।
একসময় ভারতীয় ভূখণ্ডেও হিন্দু ও মুসলিম এই দুই প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের অবস্থায় কাটিয়েছে। উভয়ের নানাবিধ ধর্মীয় উৎসব, ধর্মীয় সংস্কার ও অন্যান্য চিন্তাভাবনাকে উভয়েই গ্ৰহণ করেছে। মহররমের তাজিয়া ও মহরম হিন্দুদের কাছেও কম আনন্দদায়ক ছিল না। এমন কি অনেক স্থানে অনেক হিন্দু মেয়েদের মধ্যে এমন বিশ্বাসও ছিল যে, তাজিয়ার নীচ দিয়ে হাঁটলে তারা সন্তানের মা হবে। পীরবাবার কাছে মানত শুধু মুসলিমরা নয়, জন্মসূত্রে যারা হিন্দু তারাও করত। দুর্গাপূজা বা কালীপূজার মত হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে ও মেলায় মুসলিমরা,-পূজা না দিক, পৌত্তলিকদের অনুষ্ঠান বলে না। সরে গিয়ে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করত। অশ্বখগাছের তলায় ঠাকুরের থানে মানত করে বা ঢ়িল বেঁধে নিঃসন্তান মুসলিম রমণীরাও তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের চেষ্টা করত। হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐক্যের এই অতি স্বাভাবিক সামাজিক ধারা এখনো নেই তা নয়’(৩), কিন্তু উভয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভেদের মানসিকতা যে ব্যাপকতা লাভ করেছে। ঐ ব্যাপকতা আগে (অন্তত ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের পূর্বে) মোটেই ছিল না। উচ্চবর্ণীয় হিন্দুরা মুসলিমদের অস্পৃশ্য ভেবেছে কিংবা মৌলানা-মৌলবীর মত উচ্চস্তরের মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের কেউ কেউ হয়তো কঠোরভাবে পৌত্তলিক ধর্মানুষ্ঠান পরিহার করেছে, কিন্তু সাধারণভাবে সমাজে উভয়ের মধ্যে ঘূণা-হিংসা-বৈরিতা ছিল না এবং তাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মত ঘটনায় নীচুতলার হিন্দু-মুসলিম প্রতিবেশীদের অন্তত বৃহদাংশের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে হত্যা থেকে ধর্ষণের মত ক্রিয়াকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার মানসিকতাই অনুপস্থিত ছিল। ভারতের পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্রই এই চিত্র কমবেশি ছিল। তাই পাঞ্জাবের ১৮৮১-এর আদমসুমারীর উপর ডেনজিল ইবেটসন-এর গবেষণামূলক রচনায় এমন মন্তব্য দেখা যায়, ‘বাস্তব ক্ষেত্রে পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলে ধর্মান্তর ধর্মািন্তরিতের জাতের উপর কোন প্রভাব ফেলে না। মুসলমান, রাজপুত, গুজার, বা জাট সমস্ত সামাজিক, উপজাতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে তার হিন্দু ভাইদের মতই একজন রাজপুত, গুজার বা জাট। তার সামাজিক প্রথা অপরিবর্তিত, তার উপজাতিক বাধনিষেধের শৃঙ্খল শিথিল হয় নি, তার বৈবাহিক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নিয়ম অপরিবর্তিত;… … …’ ইত্যাদি।
মূলত ইংরেজদের দ্বারা চিহ্নিত ঐ তথাকথিত ইসলামী আমল থেকেই এই ধর্মপরিচয়কে পাত্তঃ-না-দেওয়া সামাজিক বন্ধুত্ব মোটামুটি ছিলই। কিন্তু ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের নামে হিন্দুত্বের পুনরভ্যুত্থানবাদী ক্রিয়াকাণ্ড সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে অভিন্ন হতে থাকে। বৃটিশরা নিজ স্বার্থে এই ধর্মীয় বিভাজন ও বিদ্বেষের বীজ বপন করতে থাকে,-এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাপার হলেও কোন সহায়ক ভিত্তি না থাকলে ইংরেজদের পক্ষেও এই সাম্প্রদায়িকতার চাপা থাকা আগুনে হাওয়া দেওয়া সম্ভব হত না। বিপানচন্দ্র। যেমন মন্তব্য করেছেন, ‘জাতীয়তাবাদী উলামাও মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয়, এমনকি সাম্প্রদায়িক পরিচিতি বাড়াতে ও সাম্প্রদায়িকতাবাদের প্রসারে প্রচণ্ডভাবে সাহায্য করেছিলেন’ এবং ‘অনুরূপভাবে, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী দয়ানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ ও বিপিনচন্দ্র পাল এবং অন্যান্যরা ধর্মভাবকে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং এইভাবে পরোক্ষে হিন্দুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক পরিচিতি বোধকে উৎসাহিত করেছেন।’
