এগুলি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তখনকার বাঙলার শিক্ষিত সমাজে মুক্তমন ও সংস্কারের যে পরিমণ্ডল তৈরী হয়েছিল তার বহিঃপ্রকাশ এসব। নতুন ইয়োরোপীয় জ্ঞান ও আধুনিক মননের সঙ্গে পরিচয় এই মুক্তমন গড়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল। কিন্তু হিন্দুধর্মের চিরাচরিত। ঐতিহ্যের প্রতি এ ধরনের আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় এবং ব্রাহ্মধর্ম ছাড়া খৃষ্টধর্মের দ্বারাও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে, ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদী মানসিকতাও সৃষ্টি হয়। এই চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল, অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা রূপ পায় শশধর তর্কচূড়ামণি (১৮৫১-১৯২৮)-র মত মানুষদের মধ্যে। একদিকে ইনি যেমন সহবাস-সম্মতি আইন’ প্রণয়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেন, তেমনি হাঁচি-টিকটিকির বাধানিষেধ জাতীয় হাস্যকর কুসংস্কারগুলিরও ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’ দিয়ে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। অন্যদিকে গদাধর চট্টোপাধ্যায় তথা শ্ৰীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব (১৮৩৬–১৮৮৬) ও তার ভাবশিষ্য নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২)-এর মত বর্তমানে অতি প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ও সংস্কারকরাও হিন্দুধর্মের ঐ টালমাটাল অবস্থায় নব্যহিন্দুত্বের (NeoHinduism) এক উদার চিস্তার প্রচার করেন। ঈশ্বরচন্দ্ৰ যাকে ভ্ৰান্তদর্শন বলেছিলেন সেই বেদান্ত আর ভক্তিবাদ তাদের এধরনের প্রচারে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। পুনরভ্যুত্থানবাদীদের সমস্ত বৈশিষ্ট্য তাঁদের মধ্যে না থাকলেও ‘অভ্যুত্থানমধৰ্মস্য’–এর প্রতিক্রিয়ায় তাদেরও সৃষ্টি।
এই তথাকথিত অধর্মের অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮– ১৮৯৪)-এর মত পণ্ডিত সাহিত্যসম্রাটের লেখাতেও প্রতিফলিত হয়। তিনি শুধু হিন্দুত্ব ও কৃষ্ণতত্ত্বের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষাস্ত হননি, আনন্দমঠ’-এর মত উপন্যাসের মধ্য দিয়ে হিন্দুত্ববাদী মানসিকতারও প্রচার করেন, যা ঐ পরিবেশে হিন্দু পুনরভ্যুত্থানবাদের কাছাকাছিই বা সমার্থক ছিল। এমন কি আনন্দমঠের প্রথম দিকের সংস্করণে বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা থাকলেও, পরে বৃটিশ তোষণের জন্য, তথা নিজের সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও শ্রেণীস্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে, এসব কথা পাল্টে তার পরিবর্তে ‘নেড়ে।’ তথা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘূণার বীজ বপন করেন। দু’তিন হাজার বছর আগে বহিরাগত তথাকথিত আর্যরা যেমন ভারতের আদিবাসিন্দাদের সঙ্গে লড়াই করে পরে একাত্ম হয়েছিল, তেমনি কয়েকশত বছর আগে মুসলিমরাও ভারতে পদার্পণ করে একসময় এদেশেরই লোক হয়ে গেছে। আর বর্তমানের মুসলিম জনসংখ্যার বৃহদংশ এ দেশেরই ধর্মান্তরিত মানুষ। তবু এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করে, এখনকার হিন্দু মৌলবাদীদের মত, বঙ্কিমচন্দ্রও ‘মুসলিমদের বিদেশী হিসাবে দেখিয়েছিলেন, এবং জাতীয়তাবাদ বা ভারতীয়ত্ব বা দেশজ-সবকিছুর হিন্দুত্বের সঙ্গে অভিন্ন রূপ কল্পনা করেছিলেন।’ (আধুনিক ভারত ও সাম্প্রদায়িকতা, বিপান চন্দ্র)। এইভাবেই ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদীরা-ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ও মৌলবাদের সূত্রপাত ঘটায়, যে সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দেশে আগে এভাবে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত ছিল না।
জাতীয়তা ও স্বদেশ প্রেমের নামে এমন হিন্দু ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা একাকার হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি শুধু বঙ্গদেশে নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ভারতীয় ভূখণ্ডেই মাথা চাড়া দিতে শুরু করে। বাল গঙ্গাধর তিলকের মত কিছু অসাধারণ দক্ষ, এমনকি দেশপ্রেমিকের হাতে তার সূচনা। তবে তিলকের দৃষ্টিভঙ্গীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলি অবশ্যই প্রাধান্য পেত, কিন্তু এটিও সত্য যে, ‘তিলক তঁর হিন্দু ধর্মীয় ভাবসম্পন্ন গণেশ পূজা এবং শিবাজী উৎসব প্রচারের মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে হিন্দুত্বের সংশ্লেষ বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন’ এবং অন্যদিকে ‘অরবিন্দ ঘোষ, বিপিন চন্দ্ৰ পাল এবং লালা লাজপত রাই প্রমুখ চরমপন্থী নেতারা তাদের রাজনৈতিক বক্তৃতা ও রচনায় হিন্দুপ্রতীক, বাকরীতি ও পুরাণকে ব্যবহার করতেন। ভারতকে অনেক সময়ে মাতৃদেবী বলে উল্লেখ করা হত, বা কালী, দুর্গ ও অন্যান্য হিন্দু দেব-দেবীদের সঙ্গে তুলনা করা হত।’ (ঐ) এটি অবশ্যই ঠিক যে, এই সব নেতৃবৃন্দ বা তাদের কাজকর্মকে সরাসরি ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদী বা সাম্প্রদায়িক বলা যায় না। কিন্তু তারা, হয়তো বা অসচেতনভাবেই এবং মুসলিমদের প্রতি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ পোষণ না করেই, এই ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থান ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে গেছেন। এখনো আমাদের দেশে এই সব নেতৃবৃন্দকেই পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রচার করা ও মহীয়ান করা হয়। তাদের অবদানের প্রাপ্য মর্যাদা অবশ্যই দেওয়া উচিত, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্তরে তাদের অন্যদিকগুলিকে অস্বীকার করে বিশুদ্ধ ভক্তি ও সন্দেহাতীত মহত্ব প্রচারের মানসিকতা থেকে বর্তমান রাষ্ট্রীয় চরিত্রটিকে আঁচ করা যায়।
ঘটনাচক্ৰে অথবা হয়তো কোন বিশেষ ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে (যে ক্ষেত্রে বিবর্তনবাদ(২) থেকে মার্ক্সবাদের মত নানা বৈজ্ঞানিক চিন্তার উদ্ভব হয়তো ভূমিকা পালন করেছে), বাংলায় তথা ভারতে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই ধর্মীয় পুনরভু্যত্থানবাদীদের উদ্ভবের সময়ে আমেরিকাতেও সৃষ্টি হচ্ছিল ফান্ডামেন্টালিজম-এর ভিত্তি। এর আগেই বলা হয়েছে। ইয়োরোপে সংগঠিতভাবে ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদ (Revivaism) সৃষ্টি হয়েছিল আরো আগে,-অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। এর একটি কারণ নিশ্চয়ই এই যে, মুক্ত চিন্তা, ধর্মীয় কুসংস্কারগুলির উপর আঘাত করা এবং ধর্মের ভিত্তিটিকেই নাড়া দেওয়ার কাজটি ইংল্যাণ্ডে তথা ইয়োরোপে শুরু হয়েছিল ভারতের থেকে অনেক আগে। প্ৰতিদেশে সব সময়েই এই স্রোতবিরোধী ধারা লোকচরিত্রের একটি অংশ। কিন্তু কখনো কখনো তা বিশেষ মাত্রা পায়। ইংল্যাণ্ডে সপ্তদশ শতাব্দীতে তো বটেই এমন কি পঞ্চদশ শতাব্দীতেও ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী কাজকর্মের উদাহরণ কম নেই। ১৪৯১-তেই এক ছুতোর দীক্ষাস্নান, স্বীকারোক্তি ইত্যাদি প্রথাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। তখন বিশেষত যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বিশেষভাবে দানা বাঁধে। লোলার্ড গোষ্ঠীর একজন মন্তব্য করেছিলেন, ‘ধর্মযাজকেরা জুডাস-এর থেকেও খারাপ। জুডাস তিরিশ পেন্সের জন্য যিশুকে ধরিয়ে দিয়েছিল। যাজকেরা তো আধাপেনির বিনিময়ে মানুষকে দলে দলে বিকিয়ে দিচ্ছে।’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী এ ধরনের অজস্র আন্দোলন ও মতামত ক্রমশঃ বিকশিত হয়েছে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর আসন্ন পুঁজিবাদী বিপ্লবের রাস্তা মসৃণ করেছে। একদিকে ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেমন পুরনোকে ছেড়ে নতুন পথ খোঁজার চিন্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (আর তার নেতৃত্ব মূলত দিয়েছে ইংল্যাণ্ডের নীচুতলার পছিয়ে থাকা নিপীড়িত মানুষরাই), তেমনি অন্যদিকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও নিত্যনতুন আবিষ্কার ও সত্যের সন্ধান শুরু হয়েছে, যার একটি ফলশ্রুতি প্রগতিশীল পুঁজিবাদের উদ্ভব তথা শিল্প বিপ্লব। ধর্মীয় ক্ষেত্রে ডিগার, র্যান্টার, ফ্যামিলি পন্থা, লেভেলার, কোয়েকার ইত্যাদির মত প্রতিবাদী গোষ্ঠীগুলির নেতৃত্ব মূলত এসেছিল জনসাধারণের দরিদ্র পিছিয়ে পড়া অংশ থেকেই।
