বিশেষ প্রতিষ্ঠানিক ধর্মে নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের ব্যাপারটিতে ধর্মান্ধতা নমনীয়রূপে লুকিয়ে থাকে। তা যদি না থাকে। তবে বিশেষ একটি ধর্মে বিশ্বাসের ব্যাপারটিরই অস্তিত্ব থাকে না এবং তার বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, মূল্যবোধকে একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করারও তাগিদ থাকে না। হিন্দু হলে গরুর মাংস বা মুসলিম হলে শুয়োরের মাংস একেবারেই খাব না-এটি একটি নির্দোষ ধর্মান্ধতার হাস্যকর রূপ। আগেকার দিনের ব্রাহ্মণেরা বা মুনি-ঋষিরা বা হিন্দুদের ‘দেবদেবীরা’। যে আকছারই গরুর মাংস খেত, এমনকি কৃষ্ণ যজুর্বোেদ ব্রাহ্মণকে যে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করারও নির্দেশ দেওয়া আছে, কিংবা নিছক অর্থনৈতিক কারণেই যে গো-সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল এবং গরুকে ‘মা’ হিসেবে (অর্থাৎ হিন্দুদের ‘বাছুর’ হিসেবে) ভাবাটা যে কোন কাজের কথা নয়-এ ধরনের সামান্য যুক্তিবোধও প্রয়োগ করা হয় না। একই ভাবে হজরত মহম্মদ যাদের মুসলিম হিসেবে ধর্মস্তিরিত করেছিলেন, তারা যে ধর্মস্তিরিত হওয়ার আগে শুয়োরের মাংসও খেত, কিংবা যথাসম্ভব স্থানীয় শত্ৰু-স্থানীয় মানুষেরা শুয়োর পুষত বলে মুসলিমরা শত্রুদের পোষ্য জীবকে ঘূণ্য হিসেবে প্রচার করেছে অথবা ‘আল্লার সৃষ্টি করা’ গরু-ছাগল খেতে পারলে শুয়োরই বা কেন খাওয়া যাবে না–এ ধরনের কোন কথাবার্তা শোনাও কানে আঙ্গুল দিয়ে বন্ধ করা হয়।
এই ধরনের যুক্তিবিবর্জিত বিশ্বাসের মানসিকতাই (যা প্ৰতিষ্ঠানিক ধর্মের অসংখ্য বাহ্যিক চরিত্রকে বিশিষ্টতা দান করে) এক সময় উগ্র আকার ধারণ ক’রে ধর্মান্ধিতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির পরিপূর্ণ রূপ ধারণ করে।’* এর জন্য নিজে শহিদ হওয়া ও অন্যদের শহিদ হতে উৎসাহ দেওয়ার কাজ অনায়াসে করা হয়। প্রতিবেশী হিন্দু বা মুসলিমকে খুন করলে, নিজের স্ত্রী বা কন্যার মত এক ভিন্নধর্মাবলম্বিনীকে ধর্ষণ করলে বা ভিন্ন ধর্মের মানুষদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিলে যে আদৌ নিজের ধর্মের প্রতি শ্ৰদ্ধা প্ৰকাশ করা হয় না এবং নিজেদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যাবলীরও সুরাহা হয় না, এ ধরনের যুক্তিবোধ ধর্মান্ধতাদের মধ্যে থাকে না।
ধর্মান্ধতারা নিজেদের অর্থনৈতিক আন্দোলনকে ধর্মের সঙ্গে গভীরভাবে মিশিয়েও দেয়। ধর্মই যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে তোলার ও টিকিয়ে রাখার অন্যতম একটি উপায় তা ধর্মান্ধিরা মাথাতেও আনে না। এই ভাবেই ধর্মান্ধতারা নিজ ধর্মের সমস্ত মানুষের সব ধরনের স্বার্থকে অভিন্ন বলে ভাবতে শুরু করে। এই মানসিকতা তীব্রতা পায় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের মধ্যে।
বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন পরিবেশে এই রূপান্তর ঘটে। তবে ধর্মান্ধতা বিশেষ সময়ে ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদ (religious revivalism)-এরও জন্ম দেয়। এই পুনরভ্যুত্থানবাদের সৃষ্টি হয় মূলত ঐতিহ্যশালী ধর্মীয় মূল্যবোধ যখন বিশেষ কালে নানা প্রশ্ন ও বিরোধী যুক্তির সম্মুখীন হয় এবং তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হিন্দু ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদীদের অভ্যুত্থান এই বাংলায় ঘটেছিল। এইভাবেই। তার আগেইয়ংবেঙ্গল থেকে বিদ্যাসাগরের মত ব্যক্তিরা সনাতন হিন্দু ধর্মের জঞ্জাল ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯–১৮৩১)-র মুক্তমন ও যুক্তিবাদী মানসিকতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মূলত সমাজের উপরতলার হিন্দুপরিবারের সন্তানেরা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী রূপ দান করেন। প্রকাশ্যে গোমাংস ও মদ্যপান করা জাতীয় কাজকে ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি উপায় হিসেবে ভাবা হয়েছিল। (যদিও জনসাধারণের সর্বস্তরে মতাদর্শগত ব্যাপক প্রচার না চালিয়ে ও আর্থ সামাজিক অন্যান্য দিকের সঙ্গে তাকে যুক্ত না করে, বিচ্ছিন্ন ভাবে করা এসব কাজে ব্যক্তিগত ‘হিরোইজম’-ই ছিল বেশি; সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে এমন কাজ ধর্মাচরণকে আরো নিষ্ঠার সঙ্গে আঁকড়ে ধরার প্রবণতাও সৃষ্টি করে।) অন্যদিকে রামতনু লাহিড়ি (১৮১৩–১৮৯৮) প্রকাশ্যে উপবীত ত্যাগ করেন (১৮৫১ সালে) বা রসিককৃষ্ণ মল্লিক (১৮১০-১৮৫৮) আদালতে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গঙ্গজলের পবিত্রতা অস্বীকার করেন। ডিরোজিয়ানদের এমন কাজকর্ম সুবিদিত এবং তা সমাজে উল্লেখযোগ্য আলোড়নও যে ফেলেছিল তাতেও কোন সন্দেহ নেই। পাশাপাশি ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগরের (১৮২০–১৮৯১) মত ব্যক্তিত্বরা ডিরোজিয়ান না হলেও হিন্দুধর্মীয় আবিলতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্ৰ চিঠিপত্রের শিরোনামে লোকচারবশত ‘শ্ৰী শ্ৰী হরিঃ শরণম শ্ৰী শ্ৰী হরিঃ’, ইত্যাদি লিখলেও ধর্ম ও ঈশ্বর-বিশ্বাসের প্রতি তাঁর কোন মোহ ছিল না। তাই দ্বিধাহীনভাবে তিনি এটি জানিয়েছেন, ‘বেদান্ত ও সাংখ্য যে দর্শনের দুটি ভ্ৰান্ত ধারা এ ব্যাপারে আর তর্কের অবকাশ নাই। এগুলি মিথ্যা হলেও হিন্দুদের কাছে অপরিসীম শ্রদ্ধা পায়।’ (‘That the Vedanta and Sankhya are false systems of philosophy is no more a matter of dispute. These systems, false as they are, command unbound reverence from the Hindus.’–কাউন্সিল অব এডুকেশনের সেক্রেটারি এফ আই মুয়াট-কে লেখা চিঠি, ৭ই সেপ্টেম্বর ১৮৫৩)। অন্যদিকে সাংগঠনিকভাবেও হিন্দুধর্মের উপর আঘাত আসে ব্রাহ্মধর্ম সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। (ব্রাহ্ম সমাজ বা ব্রাহ্মসভার প্রথম অধিবেশন হয় ১৮২৮-এর ২০শে অগাস্ট।)
