এমন নানা ধরনের ধর্মীয় বা ধর্মভিত্তিক সংগঠনের পাশাপাশি ধর্মীয় মৌলবাদী বা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠন আরো নিকৃষ্ট উপায়ে ধর্মকে কাজে লাগায়। এদের মধ্যে তীব্রতার তারতম্য থাকে। সব ধর্মেই মাহিষ্য সমিতি, বৈষ্ণব সম্মেলন, শৈব সভা বা সাদগোপ সভার মত নিছক সাম্প্রদায়িকতা ভিত্তিক নানা সংস্থা তৈরী হয়। বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীগত ও সাম্প্রদায়িক স্বাৰ্থ দেখার জন্য। কিন্তু এদের মৌলবাদী বলা চলে না, কারণ ধর্মের প্রাথমিক ভিত্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জঙ্গী উৎসাহ এবং বৃহত্তর ক্ষমতা লাভের ব্যাপকতর আকাঙক্ষা এদের মধ্যে অনুপস্থিত।
বিশুদ্ধ মৌলবাদী সংগঠন প্রথম গড়ে ওঠে আমেরিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ও আরো সুনির্দিষ্টভাবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ফান্ডামেন্টালিস্টদের মধ্যে। বাইবেল তথা ধর্মের মাহাত্ম্যকে প্রতিষ্ঠা করার প্রাথমিক তীব্রতা এদের অস্তিত্ব জুড়ে সম্পৃক্ত ছিল। অবধারিতভাবে শ্রেণীস্বার্থ তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলই, কিন্তু তা প্রধানভাবে প্রকাশ পায় আরো পরে যখন বিবর্তনবাদ ছাড়িয়ে কম্যুনিজমকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারটি সুনির্দিষ্ট মাত্রা পায়। এখনকার মৌলবাদী সংগঠনের মধ্যে এই দিকটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নিয়ানডার্থাল মানুষেরা শেষের দিকে ঐশ্বরিক শক্তি ও আত্মজাতীয় কোনকিছুর কল্পনা শুরু করলেও এবং পরবর্তী কালের আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন) তার ক্রমশ বিকশিত ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেও, এগুলি সাংগঠনিক ভাবে বিশেষ প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের রূপ পায় আরো হাজার হাজার বছর পরে,-মাত্র ৫-৬ হাজার বছর আগে, যখন শ্রেণী বিভক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এবং তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে, বিভিন্ন প্রাচীন ধর্ম (যেমন মায়া আজটেকদের) গড়ে ওঠে। এসব ধর্মের প্রায় সবগুলিই এখন অবলুপ্ত, জাদুঘরে ও ঐতিহাসিকদের কাজে কর্মে তা টিকে আছে। পরবর্তীকালে বৈদিক ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম, খৃস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম, ইসলাম ধর্ম, শিনটো ধর্ম, কনফুসিয়াসের ধর্ম (বা মতবাদ), শিখ ধর্ম, বাহাই ধৰ্ম ইত্যাদি নানা ধর্ম গড়ে ওঠে। এ ব্যাপারে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের ‘ধর্মের উৎস সন্ধানে (নিয়ানডার্থাল থেকে নাস্তিক)’ গ্রন্থে, ২য় সংস্করণ, প্রবাহ, কলকাতা-৯]
এই সব ধর্মের কারোর অবলুপ্তি, কারোর অজস্র বিভাজন, কারোর নানা ভাঙ্গা গড়া উত্থান পতনের ব্যাপারগুলি এটি প্রমাণ করে যে, এগুলি চিরন্তন বা সনাতন যেমন আদৌ নয়, তেমনি তা সম্পূর্ণ মনুষ্যসৃষ্ট, মানুষেরই প্রয়োজনে তৈরী হওয়া। এই প্রয়োজনেই সময়ের সঙ্গে তাদের পরিমার্জনা ও রূপান্তরও ঘটেছে, যেমন বৈদিক ধর্ম ব্রাহ্মণ্য ধর্মের স্তর পেরিয়ে এক সময় তথাকথিত হিন্দুধর্মের রূপ পেয়েছে, যদিও, এইভাবে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারটা নিতান্তই হাল আমলের ঘটনা-বৃটিশ শাসনকালে। মৌলবাদীদের নিয়ে মুস্কিল হচ্ছে, তারা এই সময়োপযোগী রূপান্তর ও পরিমার্জনার ব্যাপারটাকে অস্বীকার করে এবং ধর্মের প্রাচীন রাপের সুবিধাজনক দিকগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
এই মৌলবাদ ও মৌলবাদীরা ধর্মের সৃষ্টি বহু পরে জন্ম নিয়েছে, যদিও তারা দ্রুণাকারে ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে বর্তমান ছিল। ধৰ্মীয় মৌলবাদের (এবং সাম্প্রদায়িকতারও) পূর্ববর্তী একটি অবস্থা ধর্মান্ধতা বা ধর্মীয় গোঁড়ামি (religious famaticism)। সমস্ত ধরনের যুক্তির পথ পরিহার করে ধর্মের অনুশাসন, রীতিনীতি ইত্যাদিকে যান্ত্রিকভাবে বিশ্বাস করা ও তাকে কাজে প্রয়োগ করা ধর্মান্ধতার প্রধানতম দিক; এর জন্য ধর্মান্ধতা বা গোঁড়ারা অন্যের ধর্মবিশ্বাসকে বা ধর্ম বিশ্বাসের গণতান্ত্রিক অধিকারকে আঘাত করতে দ্বিধা করে না, এমন কি তাদের শত্রুর পর্যায়েও ফেলে দেয়।
হিন্দুরা বৌদ্ধদের উপর, মুসলিমরা হিন্দু বা বৌদ্ধদের উপর, ইহুদি-খৃস্ট মুসলিমরা পরস্পরের উপর যে অত্যাচার ও নিপীড়ন একদা চালিয়েছে তা ধর্মনিষ্ঠ বা মৌলবাদী মানসিকতা কোনটি থেকেই নয়, এই ধর্মান্ধতা থেকেই এবং কখনো কখনো তার সঙ্গে তীব্র ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদও মিশে ছিল। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় যখন একদল খেটে খাওয়া মানুষ তারই মত মেহনতী কিন্তু ভিন্ন ধর্মের মানুষের উপর হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে খুন থেকে ধর্ষণ-নানা ধরনের অত্যাচার চালায়, তখন তার মধ্যে যুক্তি বোধহীন ধর্মান্ধতার ব্যাপারটিই বেশি থাকে,-যে ধর্মান্ধতা হিংস্র৷ সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দিয়েছে।
নিছক ধর্মবিশ্বাস ধর্মান্ধতায় পরিণত হয়। মূলত তখনি যখন মনে করা হয় যে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা তার ধর্ম, তথা তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণী স্বাৰ্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। এরই একটি বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিক্রিয়ায় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সৃষ্টির সময় খৃষ্টপূর্ব প্রায় পঞ্চম শতাব্দী সময়কালে; তখন ব্রাহ্মণের বৌদ্ধ বা জৈনদের নাস্তিক নামে গালাগালি করেছে। কিংবা আরো আগে যখন বৈদিক ধর্মের বিপরীতে চার্বক বা বাৰ্হস্পত্য দর্শনের সৃষ্টি হয়েছে; তখন বেদ-ব্ৰাহ্মণের রক্ষকেরা চার্বকদের পুড়িয়ে মেরেছে। (মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের রােজ্যাভিষেকের সময়কার এই পুড়িয়ে মারা: বর্ণনা হয়তো প্রতীকী ছিল, কিন্তু তার মধ্যে চাৰ্ব্বকদের বিরুদ্ধে যুক্তিহীন ধর্মািন্ধাদের হিংস্রতার পরিচয়ও ফুটে ওঠে।)
