ধর্মনিষ্ঠ বা ধর্মপ্ৰাণ (devoted to religion, virtuous, pious) ব্যক্তির সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। সুস্থ জীবনের লক্ষ্যে, নিজ ধর্মবিশ্বাসকে, তার আচার অনুষ্ঠান ও শিক্ষাকে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে অনুসরণ করাই তাঁর জীবন-যাপনের প্রধান দিক। মৌলবাদীরা ধর্মনিষ্ঠ নয়; ধর্ম এদের কাছে নিষ্ঠার চেয়ে নিজের স্বাৰ্থ পুষ্ট করার, মানুষকে বিভক্ত করে তথা তার সামগ্রিক আন্দোলনে অনৈক্য সৃষ্টি করে হিংস্রতা প্রকাশ করার একটি মাধ্যম মাত্র। ধর্মীয় মৌলবাদী বলতে একদল এমন ‘মানুষ’কে বোঝায় যাদের মধ্যে ধর্মকে আঁকড়ে রেখে উগ্রতা ও হিংস্ৰতা (এই উগ্রতা ও হিংস্ৰতা সর্বদা নিছক শারীরিক নয়) ধর্মান্ধতা ও পরমত অসহিষ্ণুতা, প্রগতিবিরোধিতা ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী ইত্যাদির ব্যাপারটি প্রধানভাবে চোখে পড়ে। এর বিপরীতে একজন ধর্মনিষ্ঠ মানুষের কথা বললে বা শুনলে চোখের সামনে প্রথমেই ভেসে আসে ধর্মে নিষ্ঠাবান, মানবপ্রেমিক, উদার একজন মানুষের মুখ। একদা যে অসম্পূর্ণ জ্ঞান ও অসহায়তা থেকে ঈশ্বর ও আত্মাসহ ধর্মের প্রাথমিক ভিত্তিগুলি কল্পিত হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ধর্মকে আঁকড়ে রাখেন নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পূক্তভাবে জড়িয়ে। তাকে শ্রেণীস্বার্থে ব্যবহার করা, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি বা রাজনৈতিক ধান্দাবাজির জন্য ব্যবহার করা থেকে অনেক দূরে তাঁর অবস্থান। ভিন্ন ধর্মের মানুষ তাঁর কাছে শত্রু নয়, তাকে তিনি র্তারই মত ধর্মনিষ্ঠ আরেকজন বলেই গণ্য করেন এবং সম্মান করেন।
ধর্ম যার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেই রিলিজিয়ন (Religion) কথাটি এসেছে re-ligare থেকে যার আদি অর্থ হল ‘পুনর্বন্ধন’ (এই, ligare থেকেই এসেছে ligament কথাটি)। অর্থাৎ দুটি ভিন্ন মানুষকে যা বন্ধন করে তাই রিলিজিয়ন। সংস্কৃত তথা বাংলা ‘ধর্ম-এরও অর্থ যা ধারণ করে, মানুষকে ও মানুষের সমাজকে। ছিন্নবিচ্ছিন্ন শতধাবিভক্ত মানুষ নিয়ে সমাজ-ধারণ সম্ভব নয়। এইভাবে সমস্ত দিক বিচারে ধর্মের মূলগত অর্থেই ধর্মনিষ্ঠদের বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা আদৌ ধাৰ্মিক নয়, বরং তারা ধর্মবিরোধী—যে ধর্ম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা সেই ধর্মকে সামনে রেখেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের শত্রু বলে দূরে সরিয়ে দেয়। (অবশ্য পরবর্তীকালে ধর্ম বা রিলিজিয়নের এই মূলগত অৰ্থও হাস্যকর হয়ে গেছে, যখন থেকে বিশেষ প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম বিশেষ গোষ্ঠীর বা শ্রেণীর স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।)
এগুলি সত্ত্বেও এটিও সত্য যে, ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির মধ্যে নিজ ধর্মবিশ্বাসের প্রতি এক ধরনের অন্ধত্ব থাকে, যা ধর্মান্ধতা-ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মীয় মৌলবাদেরও একটি প্রাথমিক ভিত্তি। কিন্তু শেষোক্তারা যখন ধর্মবিরোধী বা ধর্মের ভিত্তিকে নাড়া দিতে সমর্থ প্রগতিশীল চিন্তাকে (যেমন বিবর্তনবাদ, বস্তুবাদ ইত্যাদি) হিংস্রভাবে মোকাবিলা করে, ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিরা তাকে উপেক্ষার চোখে দেখেন।
মৌলবাদীরা যখন ধর্মের মূল ভিত্তিতে ফিরে যাওয়ার জন্য জঙ্গী আন্দোলন ও প্রচার করে, ধর্মনিষ্ঠরা তখন নিজের জীবনে তার প্রয়োগ করেই তৃপ্ত থাকেন। সব মিলিয়ে ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির কাছে ধর্ম নিজস্ব ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদী তথা সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিবর্গের কাছে তা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের একটি সাংগঠনিক মাধ্যম বা উপায় যা ধর্মের সঙ্গে ততটা যুক্ত নয়। এই উদ্দেশ্য নানা ধরনের হতে পারে,–(ক) নিছক ধর্মীয় মাহাত্ম্য বা বিপন্ন হওয়া ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য, এবং (খ) তার নাম করে নিজেদের শ্রেণীগত আধিপত্য বিস্তার করা ও ক্ষমতা অর্জন করা; এক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির নানা দিক যুক্ত করা হয়। দ্বিতীয়োক্ত এই বিশেষ অধ্যমীয় উদ্দেশ্য না থাকার কারণে ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিরা একক বা বিচ্ছিন্নভাবেই সাধারণতঃ থাকেন, কেউ বা হিমালয়ের নির্জনে ধ্যান আর ঈশ্বর আরাধনার কল্পিত আনন্দে নিমগ্ন থাকেন। অবশ্য যৌথভাবে ধর্মাচরণের জন্য কেউ বা হরিসভা জাতীয় নানা ধরনের ধর্মীয় ক্লাবও গড়েন। অন্যদিকে ধর্মের নাম করে বিশেষ কাৰ্যসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা সাধারণতঃ সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন সংস্থা গড়ে তোলে, এমন কি এখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী নানা ধরনের রাজনৈতিক দলও।
ধর্মীয় সংগঠনও নানা ধরনের হয়। নিছক সংগঠিত হলেই যে, তার মধ্যে মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক ধান্দা থাকবে তা অবশ্যই নয়, যেমন পাড়ার কিছু ধর্মপ্ৰাণ ব্যক্তি ধর্মকে কেন্দ্র করে আনন্দলাভ করা ও অবসর বিনোদনের জন্য ঐ হরিসভা জাতীয় নানা সংস্থা গড়ে তুলতে পারেন। আবার সাইবাবা, অনুকূলচন্দ্ৰ, মোহনানন্দ, আনন্দময়ী মা, রজনীশ জাতীয় অজস্র গুরুমা-গুরুমহাশয়দের দল ব্যক্তিগত ব্যবসা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির জন্য ধর্মকে কাজে লাগিয়ে এবং সরলবিশ্বাসী মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে ধর্ষণ করে নিজেদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। কখনো বা লোকনাথ বা বালক ব্ৰহ্মচারীর মত লোকদের মৃত্যুর পরেও তার ধান্দাবাজ কিছু ‘ভক্ত’ ব্যবসায়িক কারণে এই ধরনের ব্যবসায়িক সংস্থা জিইয়ে রাখে। পাশাপাশি রামকৃষ্ণ মিশন জাতীয় ধর্মীয় সংস্থাও গড়ে ওঠে, যাদের প্রধান দিক নিজ ধর্মীয় মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সমাজ সেবা, শিক্ষা প্রসার, কিছু বিশেষ মূল্যবোধ গড়ে তোলা ইত্যাদি।
