প্ৰতিষ্ঠানিক ধর্মের অস্তিত্ব ও এইসব ধর্মে বিশ্বাস না থাকলে ধর্মীয় মৌলবাদ (ও সাম্প্রদায়িকতার) সৃষ্টি হওয়ার ও টিকে থাকার সম্ভাবনাই থাকে না। তাই ধর্মবিশ্বাসীরা আসলে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে ফক্ষুধারার মত লালন করেন। বিশেষ সময়ে ও পরিস্থিতিতে এই ধারা কারোকারোর ক্ষেত্রে প্রকাশ্য হয়ে বন্যার আকার ধারণ করে। তবু তাদের বৃহদংশই প্রকাশ্যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতাই করেন। এঁরা ধর্মের গ্রহণীয়, নমনীয়, সহনীয়, উদার রূপকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদীরা ধর্মের অবৈজ্ঞানিক, প্রতিক্রিয়াশীল, শাসকশ্রেণীর স্বার্থবাহী, পুরুষ আধিপত্যকামী এবং ধর্মের নামে মানুষকে কৃত্রিমভাবে বিভক্ত করার জনস্বার্থবিরোধী দিকগুলিকে হিংস্র ও চরমভাবে তাদের কথায় ও কাজে প্রকাশ করতে চায়। জনসমর্থন আদায়ের জন্য তারা ধর্মবাদী জাতীয়তাবাদের প্রচার করে। তাদের সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থ এসবের পেছনে ইন্ধন জুগিয়ে চলে।
————–
* ভারতীয় জনসঙ্ঘের লক্ষ্য ও আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা না করে শুধু তার সভাপতি বলরাজ মাধোককে উদ্ধৃত করা যায়।-’ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হলে ইন্ডিয়া নাম মুছে ফেলা হবে। নাম হবে। হিন্দুস্তান। জাতীয় পশু হবে গরু। রাষ্ট্রভাষা হবে সংস্কৃত। যোগাযোগের ভাষা হবে হিন্দি-বলেছেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের সভাপতি বলরাজ মাধোক। বুধবার। কলকাতায়।’ (আজিকাল; ২৫.৫.৮৯.)
** ভারতীয় জনতা পার্টির মত হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলি (যাদের সাধারণ ভাবে হিন্দু মৌলবাদী বলা যায় ও বলা হচ্ছে), তারা এই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শিক্ষা ও নীতিতেই প্রশিক্ষিত। বিজেপি (rIS 267 (5 Stifts (Tiri 4GIC2, ‘I am proud that my virtues have been imbibed from RSS,” (The Statesman; 17.995)
৪. মৌলবাদের জন্মকথা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্মীয় মৌলবাদ অতি প্রাচীন যেমন কোন ব্যাপার নয়, তেমনি আচমকা সৃষ্টিও হয় নি। ধর্মকে অনাবিল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অবস্থান থেকে উৎখাত করে, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রেণী:স্বার্থে তার চরম ব্যবহার থেকে তার উদ্ভব। সাধারণভাবে বল্লে মৌলবাদের সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে হয়তো এভাবে প্রকাশ করা যায়।–
অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস
(এখন থেকে ৫০-৬০ হাজার বছর আগে নিয়ানডার্থাল মানুষের অন্তিম পর্যায়ে। এর থেকে ধীরে ধীরে ঈশ্বর ও আত্মার প্রাথমিক কল্পনার উন্মেষ। প্রধান ভূমিকা পালন করেছে—’মানুষের’ কল্পনা করার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার উন্নত ক্ষমতা, প্রকৃতির কাছে ও প্রকৃতি সম্পর্কে তার অসহায়তা ও অজ্ঞতা।)
↓
প্ৰতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ধর্ম
(এখন থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর আগে। প্রধান ভূমিকা পালন করেছে—শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সৃষ্টি; মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা তথা অনুশাসন সৃষ্টি করে গোষ্ঠীকে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রাখার তাগিদ)
↓
ধর্ম-নিষ্ঠা
(ঐশ্বরিক শক্তিকে সন্তুষ্ট রাখার বিশ্বাস ও তাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত সততা–>এগুলি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট)
↓
ধর্মান্ধতা বা ধর্মীয় গোঁড়ামি
(প্রধান ভূমিকা পালন করে বিশেষ শ্রেণীর উসকানি, চূড়ান্ত সংকীর্ণ ও অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা, নিজ ধর্মের বিরুদ্ধে ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্নতর সামাজিক শক্তির আক্রমণ ও চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়া)
↓
ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা । ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদ
↓
ধর্মীয় মৌলবাদ
(বিশুদ্ধ ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদ নিজ ধর্মের তথাকথিত বিপন্ন অস্তিত্বের সময় তার মাহাত্ম্য ও কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রধান দিক হচ্ছে, মানুষের কৃত্রিম ধর্মীয় পরিচয়কেই প্রধানতম পরিচয় হিসেবে মনে করা, এইভাবে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও শক্ৰতা সৃষ্টি করা, মানবিক সৌভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করা এবং নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমস্ত মানুষের স্বাৰ্থ এক বলে প্রচার করা ও ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে শত্রু বা অনুগত থাকার যোগ্য বলে মনে করা। ধর্মীয় মৌলবাদী ধর্মের সুবিধাজনক মূল ভিত্তিটিকে আপোষহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং ধর্মান্ধিতা, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থানবাদের নানাদিক তার সঙ্গে সম্পৃক্তভাবে মিশে থাকে। ধৰ্মজীবী শাসক-শ্রেণীর বিপন্ন বা মুমূর্ষ। অবস্থায় অথবা শাসকশ্রেণীর একাংশের দ্বারা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের বীভৎস ব্যবহারের দ্বারা তার উদ্ভব।)
ধর্মীয় মৌলবাদ ও মৌলবাদী মানসিকতা এইভাবে বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে এক সময় সৃষ্টি হলেও তা আদৌ সর্বজনীন নয়। প্রকৃতপক্ষে একমাত্র অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসের ব্যাপারটিই একসময় সর্বজনীনতা লাভ করেছিল, যদিও এখন থেকে আনুমানিক আড়াই-তিন হাজার বছর আগে বস্তুবাদী চিস্তার উন্মেষের ধারাবাহিকতায় তা আজ আর সর্বজনীন নেই। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ধর্ম থেকে ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অব্দি-সমস্ত স্তরেই আপামর জনসাধারণ তার অংশীভূত হয় নি। একসময় প্রতিষ্ঠানিক ধর্মগুলিতে বিশ্বাসীর সংখ্যা-তা যে যত আলগাভাবেই হোক না কেন, ছিল তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। ঐ তুলনায় ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির সংখ্যা প্রকৃত বিচারে ছিল অনেক কম। আর ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় মৌলবাদীর সংখ্যা আরো কম। মানুষের চিরন্তন শুভবুদ্ধিরই একটি পরিচয় এটি-যদিও তাদের দ্বারা প্রভাবিত, বিপথগামী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা অনেক।
