কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব মাত্রেই এমন নারীবিদ্বেষী তা নন। তাই দেখা যায় সম্রাট আকবর মুসলমানদের যথেচ্ছ তালাক করার প্রথা রদ করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। মুসলিমদের একটি গোষ্ঠী মুতাজিলাহ-রা বা ঈশ্বরবিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ মহাত্মা গান্ধী নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং এমন ধর্মনিষ্ঠ কিন্তু নারীদের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি প্রদর্শন করার মানুষ অসংখ্যই আছেন। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদীরা এঁদের থেকে পৃথক। মৌলবাদীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে ধর্মের মূল দৃষ্টিভঙ্গীগুলিকে ঈশ্বরদত্ত বলে প্রচার করা ও অন্ধভাবে আঁকড়ে রাখা। এরই একটি অংশ এই নারীস্বার্থবিরোধী পুরুষতান্ত্রিকতা তথা পুরুষ আধিপত্য। নারীপুরুষের সার্বিক সমানাধিকার ও সহযোগিতা তাদের ভাব ও ভাবনা থেকে বহু দূরে। এক্ষত্রে হিটলার তথা ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীগত মিলের কথা আগেই বলা হয়েছে।
ইরান-পাকিস্তান-আলজিরিয়া সর্বত্র এই মৌলবাদীরা মেয়েদের উপর বোেরখা চাপিয়ে চাকরি থেকে দূর করে দিতে চাইছে। এরা মুসলিম ধর্মের জোব্বা গায়ে চাপায়। হিন্দুত্বের নামাবলী গায়ে জড়িয়ে ভারতেও হিন্দু মৌলবাদীরা একই কথা বলে। তাদের নারীবিভাগ রাষ্ট্র সেবিকা সমিতিও এই ফাঁদে পা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই,—পারিবারিক সিদ্ধান্তই বিবাহ, পেশা ও কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে চূড়ান্ত এবং এমনকি সংগঠনে কাজ করার ব্যাপারটিও। সানন্দে উদাহরণ দেওয়া হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কমী-সমর্থক এক মহিলার, যিনি সস্তানের দেখাশুনা করার জন্য ব্যাংকের বড়ো চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পারিবারিক স্বাৰ্থ, সন্তানের যত্ন, যৌথ সিদ্ধান্ত ইত্যাদি অবশ্যই গুরুত্বহীন নয়, কিন্তু যখন তা নারীর আপন ব্যক্তিত্ব যোগ্যতা ও স্বাধীন ইচ্ছাকে আদৌ মূল্য দেয় না। তখন সেটি আর যাই হোক নারীস্বার্থবাহী থাকে না। এবং তা নারীর স্বাৰ্থ যদি না দেখে, তবে সেটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপর পক্ষের অর্থাৎ পুরুষের স্বাের্থই দেখে। হিন্দু মৌলবাদীরা সম্প্রতি অবশ্য দরিদ্র-বেকার যুবক কিশোর, শ্রমিক কৃষকদের মত মেয়েদেরও দাবার বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী সুন্দরভাবে বৈষম্যমুক্ত।
রাজনৈতিক জ্ঞান-ও ব্যক্তিত্ব-হীন কিন্তু সুন্দরী চিত্ৰতারকা বা দূরদর্শন তারকাকে (হায় সীতা!) তারা নিছক তার গ্ল্যামার ও শারীরিক সৌন্দর্যের কারণে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে নামিয়ে দিয়েছে। এখানেও নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য ও অভিনেত্রী হিসেবে আনন্দদায়িনী ভূমিকাই বড় করে ধরা হয়। (তবে ব্যাপারটি শুধু মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে নয়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে তেলেগু দেশম,–নানা রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রেও সত্য। মৌলবাদীদের মত এক্ষেত্রে এদেরও উদ্দেশ্য থাকে, চটক ও সস্তা জনপ্রিয়তাকে মূলধন করে কোনভাবে গর্দিটা লাভ করা। আদর্শবোধ বা রাজনৈতিক চেতনা ইত্যাদি। এদের সবার কাছেই গৌণ একটি ব্যাপার।)
অন্যদিকে হাজার হাজার কিশোরী-যুবতী-প্রৌঢ়ারা করসেবিকা নাম দিয়ে গডডলিকা স্রোতে এগিয়ে যায় অযোধ্যার সত্যগ্রহে বা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার উন্মাদনায়। ঝামেলার মুখে বা মিছিলের সামনে মেয়েদের লেলিয়ে দেওয়ার এ আরেকটি চিরাচরিত পৌরুষী ও নোংরা কৌশল। যদিও ঋতম্ভরা তাঁর বক্তৃতায় বোনেদের নয়, ভাইদের জাগার কথা বলেছিলেন (‘বীর ভাইয়ো জাগো’), তবু তিনি সহ আরো বহু মহিলারাই জগতে শুরু করেছেন। কিন্তু এই নারী জাগরণ নিজেদের সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা নয়, বরং তা ভুলিয়ে দেওয়ারই একটি উপায় মাত্র। তাই হিন্দুধর্মের তথা ধর্মের পিতৃতান্ত্রিকতার কোন সমালোচনামূলক কথাবার্তা তাদের মাথাতেও আসে না। গোলওয়ালকারের নারীস্বার্থবিরোধী সংকীর্ণতাকে অস্বীকার করে, হিন্দু মৌলবাদের খপ্পরে থাকা নারীদেরও কেউ কেউ সম্প্রতি নারীর আর্থিক স্বাধীনতা’-র কথা বলছেন। কিন্তু এমন কথাবার্তা এত নীচ সুরে বাঁধা যে, ধৰ্মরক্ষার (অর্থাৎ নারীবিদ্বেষী পুরুষশাসিত সমাজের স্বৰ্থবাহী বিশেষ প্রতিষ্ঠানিক ধর্মকে রক্ষার) তীব্রতার কাছে তা মূল্যহীন হয়ে ওঠে।
মৌলবাদের এ জাতীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হলেও, এটিও সত্য যে অমৌলবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলি যে এ ধরনের সমস্ত বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত তা নয়। মৌলবাদী না হওয়া মানেই শ্রেণী সচেতন, জনস্বার্থবাহী, শাসক শ্রেণীবিরোধী ও শ্রেণী সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা হয়ে ওঠা তাও নয়। ধর্মীয় মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক না হওয়ার অর্থ কম্যুনিস্ট হয়ে যাওয়া বা বস্তুবাদী দর্শনের ছাত্র হয়ে যাওয়া-সেটিও আদৌ নয়। এটি অতি সুস্পষ্ট একটি সত্য। মহাত্মা গান্ধীও কম্যুনিজমবিরোধী ছিলেন, পুঁজিবাদের তথা পুঁজিপতিদের কোন ধরনের ক্ষতি হোক তা তারও কাম্য ছিল না, ঈশ্বর ও ধর্মে ছিল তার অচলা আনুগত্য ইত্যাদি। কিন্তু তাকে ধর্মীয় মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক বলা যায় না। বড়জোর এটি বলা যায় যে, তার মানসিকতা ও কাজকর্ম ধর্মীয় মৌলবাদের সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এবং এ ধরনের ব্যক্তিত্বের উদাহরণ। অসংখ্য রয়েছে। সাধারণভাবে ধর্মবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রেও তা সত্য।
