ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা এইভাবে শোষিত শ্রেণীর মধ্যকারী সংগ্ৰামী ঐক্যকে ও ঐক্যের সম্ভাবনাকে ভেঙ্গে চুরমার করতে থাকে। ধৰ্মীয় রাষ্ট্রের শাসককুল এই উদ্দেশ্যেই বহু লড়াই’ (অর্থাৎ ধান্দাবাজি) করে দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে তোলে। এবং সবচেয়ে করুণ, নির্মম দিক হল তাদের এই লড়াইতে তারা গাধার সামনে গাজর ঝোলানোর মত শোষিত মানুষের সামনের ধর্মের গাজর ঝুলিয়ে রেখে ধর্মবিশ্বাসী বা ধর্মের প্রতি মোহগ্ৰস্ত অজস্ৰ সাধারণ মানুষকেও সহযোদ্ধা’ হিসেবে জোগাড় করে নেয়। এই ‘যোদ্ধারা’ধর্মকে রক্ষণ করার মহান ব্রত পালন করছে ভেবে শহিদ হতেও পিছপা হয় না। (এই ভাবেই তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়)। আসলে তারা শহিদ হয়, তাদেরই সিংহাসনে বসানোর জন্য যারা ভবিষ্যতে তাদেরই শাসন ও শোষণ করবে।
এই সিংহাসনে বসতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা যে আলাদা একটি শ্রেণী আর যাদের ঘাড়ে পা দিয়ে তারা এই লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে তারা যে ভিন্ন আরেকটি শ্রেণী, ধর্মীয় মৌলবাদী আন্দোলন এই সত্যটিকে ভুলিয়ে দেয়। নিছক একই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্যই শোষিত মানুষেরা শাসকশ্রেণীকে নিজেদের মিত্র বলে ভাবতে শেখে। এটি ঠিকই যে আদর্শ শ্রেণীবিভাজন। এখন আর নেই এবং শাসকশোষিত বিভাজন এখন অনেক জটিল। এই বিভাজন অনেক ক্ষেত্রেই আপেক্ষিক এবং শাসক শ্রেণীর নিম্নস্তরের সদস্যরা উচ্চ অবস্থানের শাসকদের দ্বারা শাসিত ও শোষিত হয়। তাই শাসক-শাসিত বা শোষক-শোষিতের বিভিন্ন স্তরবিন্যাস রয়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদ এ ধরনের স্তরবিভাজনকেও অস্বীকার করে এবং তাদের লক্ষ্য থাকে। এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন না হতে দেওয়া। তাই দেখা যায়,–
‘আর এস এস-কর্মীদের ছোটোবেলা থেকেই শিক্ষা দেওয়া হয় যুক্তিতর্কের ধার না ধারতে এবং হিন্দুসমন্বিত সমাজ সম্পর্কে তাদের যে ধারণা গড়ে তোলা হয় তাতে স্পষ্টতই সমাজে শ্রেণী, জাতপাত এবং পুরুষ-নারী বিরোধ–এসব এড়িয়ে যায় এবং পুরোপুরি পুরুষ শাসিত, উচ্চবর্ণের এবং মধ্য এবং নিম্নমধ্য শ্রেণীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত সমাজের ধারণার সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়।’ (খাকি প্যান্ট, গেরুয়া ঝান্ডা)
এবং ব্যাপারটি অন্যান্যদের ক্ষেত্ৰেও সত্য। আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরা প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল বিবর্তনবাদ, কম্যুনিজম, বাইবেলের সমালোচনা, ইত্যাদিকে, কিন্তু কোন বিশেষ শ্রেণীকে নয়। বরং তারা উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে (কম্যুনিজমবিরোধী বৈদেশিক নীতি, সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি) শাসকশ্রেণীর হাত শক্ত করতেই চেয়েছিল এবং এখনো চায়। পাকিস্থান-এ বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদীদের প্রতিনিধি ঐ জামাতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীও পাকিস্থানে ও ভারতে যথাক্রমে ইসলাম ও হিন্দুধর্মের উপর ভিত্তি করে শাসনতন্ত্র গড়ে তোলার প্রেসক্রিপশান করেছেন, কোন জনস্বার্থবাহী জনগণতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করে নয়। এবং তিনি আরো স্পষ্টভাবে শ্রেণীবৈষম্যকে অস্বীকার করে পুঁজিপতি ও শ্রমিকদের, জমিদার ও কৃষকদের, শাসক ও শাসিতকে একাকার করে দিয়েছেন (‘…in an Islamic country there is no conflict between capitalist and workers, landlords and peasants, rulers and the ruled.’) মওদুদীর বদলে ঠাকরে-আদবানিদের বসালে এবং ইসলামিক দেশের বদলে হিন্দু রাষ্ট্রের কথা বল্লেও ভাষা ও ভাব হুবহু একই।
ধর্মীয় মৌলবাদের এই শ্রেণী সমন্বয় বা শ্রেণী বিভাজনকে অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তাদের নারীবিদ্বেষী চরিত্র। ধর্মীয় মৌলবাদ মূলগতভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নারী-পুরুষের সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকেও সে অস্বীকার করে। নারী তার কাছে অনুগত একটি বিশেষ গোষ্ঠী মাত্র। ধর্ম এবং ধর্মীয় মৌলবাদের মায়ায় আচ্ছন্ন নারীরাও এই নারীবিদ্বেষী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের শিকার। যেভাবে আজীবন অবহেলিত এক শাশুড়ি সুযোগ পেয়ে পুত্রবধুর উপর অত্যাচার চালায়, তেমনি ধর্মমোহে আচ্ছন্ন এই সব নারীরাও তাদের-অপমানিত-অবদমিত সামাজিক অবস্থানের মধ্যে, আপাত তৎপরতার বা কর্তৃত্বের আস্বাদ পেয়ে নারীসমাজকে নিষ্পেষিত করতে পুরুষ শাসিত মৌলবাদকে সাহায্য করে যায়। হিন্দু মৌলবাদের উস্কানিতে তারা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গতে দলে দলে এগিয়ে যায়, মুসলিম মৌলবাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তারা বোরখার স্বপক্ষে ও শরীয়তী আইনের স্বার্থে মিছিল বের করে। এমন নারীর সংখ্যা তুলনায় সীমিত হলেও, তাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। যে কৌশলে ধর্মীয় মৌলবাদ সরল ধর্মবিশ্বাসী জনসাধারণের ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের প্রতারণা করে এবং নেতৃত্বের শ্রেণীস্বর্ধকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ঐ একই নির্মম কৌশলে তারা ধর্মবিশ্বাসী নারীদেরও ব্যবহার করে। বেদ বাইবেল কোরান মনুসংহিতা হাদিস বা অর্থশাস্ত্রের ছত্ৰে ছত্ৰে নারী অবদমনের কথাবার্তা ছড়িয়ে রয়েছে। কোরানে নারীর সম্পত্তির অধিকার জাতীয় কিছু কিছু মানবিক নির্দেশ থাকলেও নারীর স্থান যে পুরুষের নীচে, অবাধ্য নারীকে যে গৃহে আবদ্ধ করে রাখা যায় ইত্যাদি ধরনের কথাও দ্বিধাহীনভাবে বলা হয়েছে। ইসলামী আইনে ব্যভিচারে অভিযুক্ত নারীকেই নিজের নির্দোষিতার প্রমাণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নারীর সাক্ষ্যের মূল্য যে পুরুষের সাক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম তাও বলা হয়েছে দ্বিধাহীনভাবে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থে (শীতপথ ব্রাহ্মাণে) ‘কুকুর ও শূদ্রের’ মত নারীরাও যে ‘অসত্য, পাপ ও অন্ধকার’ তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং এ ধরনের উদাহরণ অসংখ্য। আর এসব বক্তব্যের মর্মবস্তু যে পুরুষশাসিত সমাজ, তাকে গ্ৰহণ করেই ধর্মীয় মৌলবাদের চরিত্র পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।
