শ্ৰেণীবিভাজিত সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, ঐ ব্যবস্থায় ধর্মীয় মৌলবাদীরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের উর্বর বিচরণক্ষেত্র খুঁজে পায়। এই ধরনের রাষ্ট্র নিজ স্বার্থে ধর্ম ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সহ সমস্ত ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাদপদ। চিস্তাকে সযত্নে লালিত করে। এমন কি কোন রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর’ হলেও তার অনুরূপ মানসিকতার গরিষ্ঠ সংখ্যক জনগোষ্ঠীর দ্বারা নির্বাচিত প্ৰতিনিধির মাধ্যমে সে এমনকি মৌলবাদকেও উৎসাহিত করে যায়।
তাই দেখা যায় আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রধানদের গভীর বন্ধুত্ব একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এ ব্যাপারে পূর্বোক্ত বিলি গ্রাহাম (Billy Graham; জন্ম ১৯১৮)-এর কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫০এর মধ্যে ইনি ফান্ডামেন্টালিস্টদের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৪৯এ-আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যাঁরি এস. ট্রম্যান একে হোয়াইট হাউসে প্রথম আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন। এবং সেই শুরু। হোয়াইট হাউসে। তঁর যাতায়াত এর পর অতি নিয়মিতই ঘটতে থাকে। বিলি গ্রাহাম পরবর্তী প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার, জনসন ও নিক্সনের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গলফ খেলার সঙ্গী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। রেগনের স্ত্রীর মত আমেরিকার ফাস্ট লেডিসহ বহু উচ্চশ্রেণীর বিশিষ্ট ব্যক্তিই জ্যোতিষীরও শরণাপন্ন হতেন বা হন। ফ্রান্সে রেজিস্টর্ড জ্যোতিষীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইংল্যান্ডে রাজা বা রানী গীজাঁর অধিকর্তা এবং রাষ্ট্র থেকেই গীর্জার খরচ মেটানো হয়। আমেরিকার ধর্মীয় দক্ষিণপন্থীরা (religious rights) প্ৰবল ক্ষমতার অধিকারী এবং আগের নির্বাচনে রিপাবলিকান সাফল্যের পেছনে ‘বাইবেল বেল্ট (ফান্ডামেন্টালিস্ট)-দের ভূমিকা কম ছিল না। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট এদের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন।
আর ভারতের মত দেশে তো কথাই নেই। বামপন্থী-দক্ষিণপন্থী সবাই জাতপাত ধর্মের রাজনীতি করে। তারা জনগণের মধ্যেকার এমন অমানবিক ও কৃত্রিম বিভাজনকে ব্যবহার করে নির্বাচনী কৌশল স্থির করে এবং এইভাবে এমন বিভাজনকে শক্তিশালী করে। আর্থিক প্রয়োজন নয়, জাত-পাতিভিত্তিক এই বিভাজন অনুযায়ী তারা শিক্ষা ও চাকরী সংরক্ষণ থেকে ব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়া-নানাবিধ সুবিধা দিয়ে মানুষকে ভোলানোর চেষ্টা করে। বাম-ডান উভয় রাজনৈতিক নেতাই এটা ভুলে যান যে বা ভুলে থাকার ভান করেন যে, তথাকথিত মুচি, তাঁতী, চামার কিংবা সাঁওতাল-মুন্ড ইত্যাদি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-এর মধ্যেও শ্রেণীবিভাজন রয়েছে এবং ঐ সব অনুন্নত গোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষই নিজেদেরই গোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী মানুষের দ্বারাও শোষিত হন। এদের সবাইকে একই চোখে দেখে ঢালাও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্যেকার শ্রেণীবিভাজনকে যেমন অস্বীকার করা হয়, তেমনি ঐ মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের হাতই বেশি শক্ত করা হয়; আর মূল সমাজ থেকে তাদের চিহ্নিত করা ও বিচ্ছিন্ন করা তো হয়ই। পাশাপাশি তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের দরিদ্রতম অংশকেও বঞ্চিত করা হয়। এই ধরনের জাত-পাতি-ধর্ম ভিত্তিক, তথাকথিত জনদরদী সংরক্ষণ-নীতির পাশাপাশি ভারতের মত দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীরা চন্দ্ৰস্বামী বা সাইবাবার মত গুরুদের তথা ধান্দাবাজ ধৰ্মজীবীদের পেছনে ঘুরঘুর করেন, মসজিদ-গীর্জামন্দিরে ভক্তির প্রদর্শন করেন, জ্যোতিষীদের অবাধ পরামর্শ গ্রহণ করেন। এঁদের এই সব কান্ড করার পেছনে একটি বড় যে মানসিকতা কাজ করে, তা হয়তো ভোলতেয়ার-এরও ছিল এবং তাই তিনি বলেছিলেন–
‘আমি চাই যে আমার চাকর-বাকরেরা ধর্মে বিশ্বাস করুক, তাহলে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব।’
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসী ঐতিহাসিক তোকভিল মন্তব্য করেছিলেন, ‘ফরাসী বিপ্লবের আগে দেশের অভিজাতশ্রেণী খুবই ধর্মবিরোধী ছিল। বিপ্লবের পর বিপদ বুঝে তারা আবার ধর্মের দিকে মুখ ফেরায়। তারপর এল। বুর্জেয়াদের পালা। তারাও বিপদ দেখে ধর্মের শরণ নিল।’
এই সব অভিজাত বা বুর্জোয়ারা যে সবসময় ধর্মীয় মৌলবাদী হবে তা অবশ্যই নয়। কিন্তু টুম্যান-আইনেহাওয়ার-জনসন-নিক্সনই হন বা ইন্দিরা-মুজিব-রাজীবনরসিমহা রাওরাই হন, —এঁরা প্রকাশ্যে ধর্মকে উৎসাহিত করতে, ধর্মের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ব্যবহার করতে এবং এমন কি নানা সময়ে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গী হতে পিছপা হন না। এই অবস্থায় ধর্মীয় মৌলবাদীরা উৎসাহ বোধ করে, শক্তি অর্জন করে এবং শত্রু হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদীদের চিহ্নিত করার ব্যাপারটি এর ফলে অনেক দুরূহ হয়ে ওঠে। অমৌলবাদী, গণতান্ত্রিক ও উদারপন্থী হিসেবে চিহিন্ত ঐ সব ব্যক্তিদেরই এক ধরনের সঙ্গী হিসেবে মৌলবাদীরা প্রতিষ্ঠিত হয়, হয়তো বা তাদের কাজটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় লালিত ধর্মীয় মৌলবাদের যথাসম্ভব সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হল শ্রেণী-সমন্বয়ের মানসিকতা। বাস্তব অর্থনৈতিক শ্রেণীবিভাজনকে অস্বীকার করে, অলীক ও কৃত্রিম ধর্মীয় বিভাজন তথা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি করেই তার সৃষ্টি ও টিকে থাকা। মার্কসীয় দর্শনকে সামনে রেখে যে সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে মৌলবাদী সংকীর্ণতা ও অসহিষ্ণুতা থাকে, তাদের সঙ্গে এটি একটি গুণগত বড় তফাৎ—এঁরা অন্তত মুখে শ্রেণীসংগ্রামের কথা বলেন। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাছে এই শ্রেণীবিভাজনই মূল্যহীন। হিন্দু, ইসলাম বা খৃস্ট-যে ধর্মেরই হোক না কেন ঐ ধর্মাবলম্বী সবার স্বার্থ যে এক নয় তা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ অস্বীকার করে। একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শাসকশাসিত বিভাজন আছে। হিন্দু শাসক ও শোষক হিন্দুদের মৃদুভাবে শাসন করে ও কম শোষণ করে তা নয়। হিন্দু জমিদার হিন্দুপ্রজাদের উপর অত্যাচার করে না তা-ও নয়। হিন্দু পুঁজিবাদীরা হিন্দু জনসাধারণের কাছে থেকে কম মুনাফার চেষ্টা করে সেটিও নয়। এবং ব্যাপারটি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সত্য। পাকিস্থান বা বাংলাদেশের মত যে সব দেশে ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্ম, নেপালের মত যে দেশ সরকারী ভাবে হিন্দু রাষ্ট্র, বলিভিয়া-আর্জেন্টিনা-অ্যান্ডোরার যে সব দেশ সরকারীভাবে খৃস্টধর্মাবলম্বী—সেই সব দেশে অন্তত একই ধর্মের সব মানুষ আর্থিক ও সামাজিকভাবে সমানাধিকার ভোগ করে, ধনী-দরিদ্র বিভাজন নেই, বিপুল সংখ্যক মানুষ নিকৃষ্ট জীবন যাপন করে না-তা আদৌ নয়। বিশেষ ধর্মকে বিশেষ দেশের রাষ্ট্ৰীয় ধর্ম করলেই আর যাই হোক বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান আদৌ হয়নি, হবেও না। বরং তার জন্য মানুষের বেঁচে থাকার যে আন্দোলন তা বিপথগামী ও বিলম্বিত হবে। কারণ ধর্ম ও ধর্মীয় মৌলবাদ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদকেই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিভেদ বলে গ্রহণ করতে শেখায়। এর ফলে এক হতদরিদ্র হিন্দু বা মুসলিম কৃষক কিংবা বেকার ও হতাশ এক তরুণ ভিন্ন ধর্মের মানুষকে, যে হয়তো তারই মত দরিদ্র ও হতাশাগ্ৰস্ত, তাকে শত্রু বলে ভাবতে থাকে-আর আড়ালে থেকে নিশ্চিন্ত উল্লাসে ঠাকরে-আদবানি-ঋতম্ভরামওদুদী-গোলাম আজমরা পরস্পরের পিঠে সুড়সুড়ি দেয়।
