কিন্তু বহুশত বছরের অভ্যস্ত ব্যাপক ধর্মবিশ্বাসের কারণে তাদের যে সার্বিক ঐক্য রয়েছে তাকে উপেক্ষা করার কোন কারণ নেই, বিশেষত নবীন ও তুলনায় অনভিজ্ঞ বামপন্থার সাম্প্রতিক অনৈক্য ও দিশেহারা অবস্থার কথা মাথায় রাখলে। তাই বিশেষ ধর্মের প্রসঙ্গে একই ধর্মের কিন্তু বিচ্ছিন্ন সব মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিই বিশেষ অবস্থায় অনৈক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আন্তর্জাতিকভাবে যেমন হয়েছিল ইসলামী মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পরে।
এখনকার বিশেষ বিশেষ ধর্মের মৌলবাদীরা নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতা দখলের লড়াই চালাচ্ছে। ভিন্ন ধর্মের মৌলবাদীরা এই এলাকায় যতক্ষণ না অনুপ্রবেশ করে, ততক্ষণ ভিন্ন ধর্মের হলেও, এইসব মৌলবাদীদের মধ্যেও ঐক্য রয়েছে—এই ঐক্যের ভিত্তি ধৰ্মরক্ষার তাড়না; হিন্দু হোক, ইসলাম হোক বা খৃস্ট হোক, সাধারণভাবে ধর্মের উপর আঘাত রুখতে তারা এক কাট্টা!! তাই বির্বতনবাদ বা মার্কসীয় দর্শনের উপর এরা সবাই খাপ্পা। পাকিস্থানে বা বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদীরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেও কিংবা ভারতের বুকে বসে হিন্দু মৌলবাদীরা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বল্লেও মূলগতভাবে হিন্দু-মুসলিম মৌলবাদীরা ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা পরস্পরের শুভাকাঙ্খী ও সুহৃদ।
তাই দেখা যায় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের কিছু আগে জামাতে ইসলামী প্রকাশিত পুস্তিকায় (জামাতে ইসলাম কি দাওয়াৎ’) মওদুদীর বন্ধুত্বপূর্ণ আবেদন, ‘ভারতের একটি অংশ দেওয়া হবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠদের এবং অন্য একটি অংশ নিয়ন্ত্রিত হবে অমুসলমানদের দ্বারা। প্রথম অংশে (পাকিস্থানে)। আমরা জনমত সংগঠিত করবো যাতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ইসলামী আইনের উপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়। অন্য অংশে আমরা হব সংখ্যালঘু এবং আপনারা (হিন্দুরা) হবেন সংখ্যাগুরু। আমরা আপনাদের অনুরোধ করব রামচন্দ্ৰ, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, গুরু নানক ও অন্যান্য সাধুসন্তদের জীবন ও শিক্ষা অধ্যয়ন করতে। দয়া করে বেদ, পুরাণ, শাস্ত্র ও অন্যান্য বই পাঠ করুন। এইসব থেকে যদি আপনারা কোন ঐশ্বরিক দিগনির্দেশ পান তাহলে তার ভিত্তিতেই আপনারা নিজেদের শাসনতন্ত্র তৈরী করুন। আপনাদের ধর্মের নীতি অনুযায়ী আপনারা আমাদের সঙ্গে আচরণ করুন। এ অনুরোধ আপনাদের করবো এবং এ নিয়ে আমরা কোন আপত্তি করব না।’ ১৯৫৩-তে দাঙ্গা শুরু করে এবং বহু কাদিয়ানীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দাঙ্গার পর পাকিস্থান সরকার যে তদন্ত কমিশন করে তাতে সাক্ষ্য দিতে গিয়েও মওদুদী জানিয়েছিলেন, ‘ভারতের মুসলমানরা ঐ ধরনের সরকারে যদি ম্লেচ্ছ ও শূদ্র হিসেবেও বিবেচিত হয় ও সেখানে মনুর আইন জারি হয় এবং তারা সরকারে অংশগ্রহণের ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলেও আমি তাতে আপত্তি করব না।’
এটি অন্তত কিছুটা সুখের ব্যাপার ছিল যে, ১৯৪৭-এর পরে ভারত ধর্মীয় (হিন্দু) রাষ্ট্র হয় নি। কিন্তু এখনকার হিন্দু মৌলবাদীরা হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে খোয়াব দেখছে, তাতে মুসলমানদের প্রতি এদের বৈরি আচরণকেও যে মুসলিম মৌলবাদীরা সমর্থন করবে তাতে মনে হয় কোন সন্দেহ নেই। অর্থাৎ ধর্মবিশ্বাসী জনগণের সঙ্গে নয়, মৌলবাদীরা একাত্ম মৌলবাদীদের সঙ্গেই। তাই দেখা যায়, ১৯৯২-এর ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার অব্যবহিত আগে বাংলাদেশের জামাতেইসলামীর প্রতিনিধিরা অর্থাৎ মুসলিম মৌলবাদীরা, দিল্লিতে হিন্দু মৌলবাদীদের রাজনৈতিক মুখপাত্র ভারতীয় জনতাপার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করে গেছে এবং ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক দৃঢ়তর করে এসেছে। আসলে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার কাজটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় মৌলবাদীরই আকাঙ্খিত ছিল। হিন্দু মৌলবাদীরা এর ফলে হিন্দুদের সংগঠিত করতে পেরেছে; মুসলিম মৌলবাদীরা হিন্দুত্বের বা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের খেপিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়াতে পেরেছে। ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বা তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইকে শক্তিশালী করার জন্য নয়, ধর্মের মত একটি কৃত্রিম পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে এবং ধর্মবিশ্বাসকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে নামিয়ে রাষ্ট্ৰীয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে সব ধরনের মৌলবাদীরাই কাজ করে। এইভাবে সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের চরিত্রই হচ্ছে জনবিরোধী,–এমন কি তারা নিজ ধর্মের জনসাধারণেরও স্বাৰ্থ দেখায় ততটা উৎসুক নয়, যতটা উৎসুক ধর্মকে রক্ষা করার অজুহাত সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্ষমতা অর্জন করার জন্য তথা শাসক ও শোষক হিসেবে আপন শ্রেণীস্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মুসলিম মৌলবাদীরা হিন্দু রাষ্ট্রে সাধারণ মুসলিমদের নাগরিক অধিকার না থাকলেও তেমন দুঃখিত হবে না। তেমনি হিন্দু মৌলবাদীরাও জন্মসূত্রে হিন্দু, এমনকি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু পরমতসহিষ্ণু, উদারনৈতিক ব্যক্তিদেরও ‘মেকি ধর্ম-নিরপেক্ষ বা ‘মুসলিম তোষণকারী’ হিসেবে ছাপ মেরে অনায়াসে শত্রুর পর্যায়ে ফেলে দিচ্ছে। তাই প্রকৃত অর্থে ধর্ম ও জনসাধারণের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ধান্দাবাজি ও শ্রেণী:স্বার্থটিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরাও অন্যান্য খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করেছে। মৌলবাদীরা একসময় এমন সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন হলেও ধর্ম তাদের কাজের একটি প্রাথমিক ভিত্তি। ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির সমগ্ৰতা জুড়ে ধর্মবিশ্বাস ছড়িয়ে থাকে। তার কাছে ধর্মের স্থান এবং মানুষের স্থান নিজের স্বার্থের উপরে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা ধর্মের ছাঁই গায়ে মাখে, তার আড়ালে লুকিয়ে রাখে। নিজের শ্রেণীস্বার্থ ও প্রকৃত ধান্দাগুলিকে। মানুষকে প্রতারণা করার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এখনকার ধর্মীয় মৌলবাদীদের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
