ব্যাপারটিকে ফ্যাসিস্ট কায়দার সঙ্গে তুলনা করা যায়। কঠোরভাবে কম্যুনিজম বিরোধী, হিংস্র জাতীয়তাবাদী এই ফ্যাসিস্টদের মতই ধর্মীয় মৌলবাদীরাও বিশেষ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, কাজেকর্মে হিংস্র এবং মূলগতভাবে কম্যুনিজম বিরোধী। কিন্তু স্পষ্টতই আগেকার ঐ ফ্যাসিস্টদের থেকে এখনকার ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রধান ও বীভৎস পার্থক্য হল, দ্বিতীয়রা ফ্যাসিস্ট কায়দার সঙ্গে ধর্মের ও ধর্মীয় বিভাজনের মত একটি কৃত্রিম ও নিছক বিশ্বাসগত দিকের সম্পূক্ত সংমিশ্রণ ঘটায়। এই চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ইরানের মুসলিম মৌলবাদীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে,
‘এই ব্যবস্থার ও মুসলমানদের ন্যায়পরায়ণ ইমাম (খোমেনি)-র বিরোধিতা যে করে, তার উপযুক্ত শাস্তি মৃত্যু। তেমন কোন লোক গ্রেপ্তার হলে তাকে হত্যা করতে হবে। সে আহত হলে তাকে আরো আহত করতে হবে, যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। যে বর্তমান ব্যবস্থা ও ন্যায়বান ইমামের বিরুদ্ধে, তার একমাত্র দণ্ড মৃত্যু।’ (১৯৮১ তে জুম্মাবারে ইরানের পাবলিক প্রসিকিউটার আয়াতোল্লা মুসাভি তাবরিজির নামাজ-কালীন বক্তৃতার অংশ।) ১৯৯০-এর অক্টোবরে অযোধ্যা ও ফৈজাবাদের বাড়ী ও মন্দিরগুলির দেওয়াল লিপিতে ‘হিন্দুদের বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কাজ যারা গোহিত্যা করে তাদের হত্যা করা’ ধরনের নির্দেশও ওই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
ফ্যাসিস্টদের মত এদের দ্বিধাহীন নিরলস কম্যুনিজমবিরোধিতার কথা সর্বজনবিদিত। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর ৪ঠা ফেব্রুয়ারী, আর এস এস নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। তাদের উপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে গোলওয়ালকার নেহেরু ও প্যাটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কাছে লেখা ২৪শে সেপ্টেম্বর এর চিঠিতে তিনি এ ব্যাপারে সব চেয়ে জোর দেন যে,–দেশে কম্যুনিজম-এর প্রসার আটকাতে গেলে আর.এস.এস.কে খোলাখুলি কাজ করতে দেওয়া উচিত। বাম, জাভা, ইন্দোচীন ইত্যাদি। পার্শ্ববতী দেশের বিপজ্জনক ঘটনাবলীর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনার সরকারি ক্ষমতা এবং আমাদের সংগঠিত সাংস্কৃতিক শক্তি এক হলে আমরা এই বিপদের (কমিউনিজমের প্রসারের) অবসান করতে পারব।’ নেহরুরা অবশ্য এই যুক্তিতে টলেননি, কিন্তু কম্যুনিজম বিরোধিতায় আর এস এস চক্রের চরম আগ্রহ ও নীতিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে কোন সন্দেহ থাকে না। বাংলাদেশেও মুসলিম মৌলবাদী জামাতে ইসলামীরা হিন্দুদের থেকে কম্যুনিষ্টদের ও বামপন্থা তথা মার্কসীয় দর্শনকে অনেক বেশি আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। আমেরিকার ফান্ডামেন্ডালিস্টদের থেকেই এই ধারা চলছে। আসলে আদর্শ হিসেবে কমিউনিজমের তথা বস্তুবাদী দর্শনের তীব্র কঠোর ও নিরলস বিরোধিতা না করলে এই মৌলবাদী মানসিকতাকে টিকিয়ে রাখা ও তার প্রসার করা যাবে না। ফ্যাসিস্টদের হিংস্র কম্যুনিজম বিরোধিতার সঙ্গে মৌলবাদীদের কিছু সাযুজ্যও তাই চোখে পড়ে।
মৌলবাদ-মৌলবাদী প্রসঙ্গে আরেকটি কথাও বলা দরকার। মৌলবাদ একটি সাধারণ দৃষ্টিঙ্গিী হলেও এবং খৃস্ট বা হিন্দু বা ইসলামী মৌলবাদী বলে উচ্চারণ করলেও, একই ধর্মের মৌলবাদীরা যে গভীরভাবে ঐক্যবদ্ধ তা নয়। ধর্মের প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য থাকলেও এবং একই ধর্মের মৌলবাদীদের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র থাকলেও, নানা স্বার্থের সংঘাতের কারণে এবং ধর্মের মূল কোনটি তা নিয়ে বিতর্কের কারণে তাদের মধ্যে অনৈক্যও থাকে। আমেরিকার খৃস্টীয় ফান্ডামেন্ডালিস্টরা বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সংস্থা কিভাবে গড়ে তুলেছিল তা আমরা আগেই দেখেছি। ইরান ও পাকিস্থানে ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হলেও দু’দেশের মৌলবাদীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে কিছু তফাৎ আছে। ইরানে মৌলবাদের একটি বড় ভূমিকা ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায়। পাকিস্থানে আবার মৌলবাদীরা সাম্রাজ্যবাদনির্ভর। আরবে ইসলামী মৌলবাদের মধ্যে রাজার মৌলবাদ’ ও ‘র্যাডিক্যাল মৌলবাদী হিসেবে দুটি পৃথক ধারা লক্ষ্য করা যায় এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষও ঘটে অর্থাৎ ইসলামী মৌলবাদের সঙ্গে ইসলামী মৌলবাদের সংঘর্ষ। র্যাডিক্যাল ইসলামী মৌলবাদীরা কয়েক বছর আগে এই ধরনের একটি সংঘর্ষের ফলশ্রুতিতে কিছুক্ষণের জন্য কাবা দখলও করে নিয়েছিল। হিন্দু মৌলবাদীদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসঙ্ঘ (আর.এস এস) সাংগঠনিক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভি এইচ পি) সামাজিক ও এককালের ভারতীয় জনসংঘ (বি জে এস)-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী ভারতীয় জনতাপার্টি (বি জে পি) ‘রাজনৈতিক দিকগুলি প্ৰধানত দেখাশুনা করে এবং বিজেপি-র প্রাক্তন সহ সভাপতি সুন্দরসিং ভাণ্ডারির মতে তিনটিই স্বক্ষেত্রে স্বাধীন, তিনটিই জাতীয় সংগঠন, কিন্তু একই হিন্দুত্বের সংস্কৃতি দ্বারা পরিচালিত। এদের সঙ্গে শিবসেনা সহ আরো বহু সংগঠন (যেমন অখিল ভারত বিদ্যাখী পরিষদ, রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি, দুর্গ বাহিনী, ভারতীয় মজদুর সংঘ বা বি এম এস, নানা সাইজের সাধুদের হরেক রকম সংস্থা ইত্যাদি) এদের সহযোগী। কিন্তু এদের মধ্যে নানা বিরোধও মাঝেমাঝেই মাথা চাড়া দেয়। মহারাষ্ট্রে আমেরিকান সংস্থা এনরন প্রসঙ্গে শিবসেনা ও বিজেপির মতবিরোধ। আপাত ও সাময়িক হলেও গোপন নেই। গুজরাতে বিজেপি নেতৃত্বের ক্ষমতার লড়াই নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তাদের মেয়েরাও গোলওয়ালকরের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীকে অস্বীকার করতে চাইছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের দাবী ‘নারীর সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য নারীর আর্থিক স্বাধীনতা অত্যাবশ্যক। সুতরাং এই আর্থিক স্বাধীনতার প্রয়াসে চাকুরিরত মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ প্রয়োজন এবং এ সম্পর্কিত মামলার নিম্পত্তির জন্য মহিলা বিচারক আবশ্যক।’ (রাষ্ট্র সেবিকা। সমিতির পত্রিকা ‘জাগৃতি-তে প্রকাশিত; এখানে ‘খাকি প্যান্ট গেরুয়া ঝাণ্ডা’ থেকে সংগৃহীত) ভারতের চার পীঠের শঙ্করাচার্যদের সঙ্গে বজরঙ্গ দল বা বিশ্ব হিন্দুপরিষদ ইত্যাদির মতানৈক্য অজানা নয়। মুসলিম মৌলবাদীদের অসংখ্য সংগঠন রয়েছে। এবং ধর্মরক্ষার প্রশ্নে কে সাচ্চা তা নিয়ে বিরোধও আছে। সব মিলিয়ে অন্তত একই ধর্মের মৌলবাদীরা এক কাট্টা হয়ে, অতি সুসংহত ভাবে ভিন্ন ধর্মকে আক্রমণ করছে বা সমগ্ৰ দেশকে গ্ৰাস করতে চাইছে-এমন ভাবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পশ্চাদপদ মানসিকতাই শুধু তাদের প্রধান দুর্বলতা নয়, তাদের নিজেদের মধ্যে অনৈক্যও যে আছে সেটিও জেনে রাখা ভাল।
