মানসিকতা ও কিছু কাজকর্মে একনায়কতন্ত্র বা ম্বৈরতান্ত্রিক আচরণ মৌলবাদের আরেকটি বিশেষ চারিত্রিক দিক হিসেবে প্রতিফলিত হয়। এটির উৎস আসলে বিশেষ একটি ধারণার প্রতি দ্বিধাহীন বিশ্বাস থাকার কারণে। বাইবেল, কোরান বা বেদ ঐগুলি ঐশ্বরিক ও সর্বোত্তম, এদের সামান্য পরিবর্তন করা বা অবমাননা, সমালোচনা করাও ধর্মবিরোধী–এ ধরনের বিশ্বাস থাকলে নিজের কাজের ক্ষেত্রেও এমন গোঁড়ামির বহিঃপ্রকাশ ঘটতে বাধ্য এবং তার ফলশ্রুতিতে নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের পরিবেশও সৃষ্টি হয়। মূলগত ঐ গোঁড়ামির কারণে নেতৃত্বেরও সামান্য সমালোচনা করার মানসিকতাই ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। নেতা তখন ঈশ্বরের এবং তার কথা (বাণী!) ধর্মগ্রন্থের সমগোত্রীয় হয়ে দাঁড়ায়।
হিটলার-গোয়েবলসরাও নিজেদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশুদ্ধ আর্যরক্তের তত্ত্বে গভীরভাবে বিশ্বাস করত। তাদের নীতিই ছিল—একটি মিথ্যাকে বারবার বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলা। এই বিশ্বাস ও এই মিথ্যার স্বার্থে তারা কি পাশবিক ক্রিয়াকাণ্ড করেছে তা আজ কারোর অজানা নয়।
ধর্মীয় মৌলবাদীরাও ফ্যাসীবাদীদের মত প্রায় একই ঢঙে কাজ করে। আর কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যেও একই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিকতা ও অগণতান্ত্রিকতা কাজ করতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে রাজনৈতিক দলের মধ্যে বা অন্য কোন গণতান্ত্রিক সংগঠনের মধ্যে এই প্রবণতা সংগঠনের অসুস্থতা ও ক্ষয়ের লক্ষণ। কিন্তু রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক মৌলবাদী সংগঠনের ক্ষেত্রে এটি তার অবধারিত বৈশিষ্ট্য। এবং এ কারণে হিটলারীয় দর্শন থেকে শিক্ষালাভ করার কথা দ্বিধাহীনভাবে উচ্চারণ করে তারা। যেমন করেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের এস এম গোলওয়ালকর তার ‘উই আর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ (১৯৩৮) গ্রন্থে – ‘জার্মানদের জাতিত্বের গর্ব আজ মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়ে পড়েছে। নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতিকে কলুষমুক্ত করতে জার্মানি গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে সেমেটিক জাতি-ইহুদিদের দেশ থেকে বিতাড়ন করেছে। জাতিত্বের গর্ব এখানে তার সর্বোচ্চ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। জার্মানি এটাও প্রমাণ করেছে যে, নিজস্ব ভিন্ন শিকড় আছে এমন জাতি বা সংস্কৃতির একসঙ্গে মিশে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা তৈরী করা অসম্ভব। এই শিক্ষা হিন্দুস্তানে আমাদের গ্রহণ করা এবং তার থেকে আমাদের উপকৃত হওয়া প্রয়োজন।’
মুসলিম মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িকতাবাদীরাও একই কথা বলে; যেমন, ১৯৪১এর মার্চ মাসে সিন্ধু-র মুসলিম লীগ নেতা এম. এইচ. গজদর করাচীর সভায় বলেছিলেন, ‘হিন্দুরা যদি ঠিকমত ব্যবহার না করে তবে জার্মানী থেকে ইহুদিদের যেমন দূর করে দেওয়া হয়েছে, তাদেরও তাই করতে হবে।’ ফ্যাসিবাদ মৌলবাদের গুরুদেব!
গোলওয়ালকর অন্যত্র আরো বলেছিলেন,–‘আমাদের দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এই কথাই বলে যে সমস্ত কিছু করেছে একমাত্র হিন্দুরা। এর অর্থ এই যে কেবল হিন্দুরাই এই মাটির সন্তান হিসেবে বসবাস করেছে।’
এবং তাই— ‘…হিন্দুস্থানের সমস্ত অহিন্দু মানুষ হয়। হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি গ্ৰহণ করবে, হিন্দু ধর্মকে শ্ৰদ্ধা করবে ও পবিত্র বলে জ্ঞান করবে, হিন্দু জাতির গৌরব গাথা ভিন্ন অন্য কোন ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে না, অর্থাৎ তারা শুধু তাদের অসহিষ্ণুতার মনোভাব এবং এই সুপ্রাচীন দেশ ও তার ঐতিহ্যের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাবই ত্যাগ করবে না, এর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তির মনোভাব তৈরী করবে। এক কথায় তারা হয়। আর বিদেশী হয়ে থাকবে না, না হলে সম্পূর্ণভাবে হিন্দু জাতির এই দেশে তারা থাকবে অধীনস্থ হয়ে, কোনও দাবি ছাড়া, কোনও সুবিধা ছাড়া এবং কোনও রকমের পক্ষপাতমূলক ব্যবহার ছাড়া। এমনকি নাগরিক অধিকারও তাদের থাকবে না।’’
নামাজ না পড়া, মদ্যপানে অভ্যস্ত মহম্মদ আলি জিন্না-ও আসলে কতটা ইসলামে আস্থা রাখতেন, ঐ বিতর্ক থাকলেও, রাজনৈতিক শ্রেণী স্বার্থে তিনিও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করতে গিয়ে ১৯৪১ সালে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মুসলিমদের ব্যাপক অংশ এখন সহস্ৰাধিক বছর ধরে একটি ভিন্ন জগত, একটি ভিন্ন সমাজ, একটি ভিন্ন দর্শন ও একটি ভিন্ন অবস্থায় জীবন নির্বাহ করছে।’ সব শেয়ালের একই রা!
বর্তমানের হিন্দু মৌলবাদী সমস্ত সংগঠনেরও মূলকথা এইই।** এই সংকীর্ণতম, অগণতান্ত্রিক, অনৈতিহাসিক মিথ্যাচারকে বারংবার বলে বলেই তারা দেশের বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও ইসলাম ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করেছে। এবং করছেও, যেমন করেছিল হিটলার ও তার সঙ্গীসাথীরা।
এবং তাদেরই মত এরাও কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় কর্মীদের শিক্ষিত ও অভ্যস্ত করে। যেমন আর এস এস-এর নতুন সদস্য এলে তাদের নিয়মিত এই প্রশ্ন করা হয়,-’যদি তোমার অধিকারী’ তোমাকে কুঁয়োয় ঝাপ দিতে বলে, তুমি কি করবো?’ প্রত্যাশিত উত্তর হল, ‘আমি তক্ষুণি ঝাপ দেব।’ কোন প্রশ্ন নয়, কোন অজুহাত নয়। কেউ উত্তর দিতে দ্বিধা করলে তাকে বিদ্রুপে জর্জরিত করা হয়। অন্যদিকে আর এস এস-এর নিয়মিত অনুষ্ঠানের একটি হচ্ছে সেপ্টেম্বরের ব্যাসপূজা। এই সময় গেরুয়া পতাকার পূজা করা হয় এবং সদস্যরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে অর্থ দান করেন। এই দান থেকেই সংগঠনের ভাণ্ডার পরিপুষ্ট হয়, কিন্তু তার কোন রসিদ দেওয়া হয় না, কোনও নথিও রাখা হয় না। সব মিলিয়ে কি সাংগঠনিক, কি আর্থিক সমস্ত দিক থেকেই নেতৃত্বের চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়। নেতৃত্বকে কোনভাবে প্রশ্ন করা, বিচার করা, সন্দেহ করার মানসিকতাটিকেই ধ্বংস করা হয়। এই মানসিকতা না থাকাটাই মূল ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে অন্ধভাবে মেনে চলার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। হিটলারের নাৎসিবাহিনীও একইভাবে পরিচালিত হত। পাকিস্তানে জামাতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীও একই হিটলারীয় কায়দার কথা বলেছেন। তাঁর মতে ইসলামী রাষ্ট্রে থাকবে শুধু একটিমাত্র দল, হিজাব-ই-আল্লা (অর্থাৎ the party of God)। কোরান শরীফেও বলা হয়েছে, ‘তারা কি জানে না যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করে তার জন্য আছে জাহান্নামের আগুন, সেথায় সে স্থায়ী হবে, উহা ভীষণ লাঞ্ছনা।’ (সূরা ৯ আয়াত ৬৩) কিংবা ‘এবং যারা অবিশ্বাস করে ও আমার নিদর্শন সমূহে মিথ্যারোপ করে, তারাই নরকের অধিবাসী, সেখানে সর্বদা অবস্থান করবে।’ (সূরা ২, আয়াত ৩৯) অর্থাৎ অবিশ্বাস করার কোন উপায় নেই। সব মিলিয়ে প্রতিটি ধর্মীয় মৌলবাদী ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যে একনায়কতন্ত্রী প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছেই।
