এরই প্রতিফলন ঘটে ঐ আওয়ামী লীগের আমলে অবৈজ্ঞানিক ধর্মীয় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বাড়বাড়ন্তের মধ্যে; তাদের সংখ্যা বাড়ানো হয়, মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে ব্যয়বৃদ্ধিও করা হয়। এবং আরো ভয়াবহ হল, আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭১এর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও ঘাতক দালালদের প্রতি নমনীয় নীতিও গ্ৰহণ করে; পাশাপাশি বামপন্থী কর্মীদের উপর নিপীড়ন নামায়, তাদের হত্যাও করতে থাকে লালবাহিনী, রক্ষী বাহিনী ইত্যাদির মাধ্যমে। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শুরুর দিকে বলা হলেও, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নতুন করে টেলিভিশন রেডিওতে ‘খোদা হাফেজ’ বলা চালু হয়, সরকারীভাবে গণভবনে ধর্মীয় মিলাদ অনুষ্ঠানও করা হয়। তবু আওয়ামী লীগ বিভিন্ন ধর্মীয় দলসহ জামাতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করেছিল।
কিন্তু পরবর্তীকালে সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৭৮) জামাতে ইসলামীর উপর এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের প্রকাশ্যে ও আইনসঙ্গতভাবে একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হল। ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক লড়াই নয়, তাদের রাজনৈতিকভাবে মর্যাদা দেওয়া ও প্রতিষ্ঠিত করার কাজই করা হল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি এন পি) এই জিয়াউর রহমানেরই রাজনৈতিক সংগঠন। আওয়ামী লীগ সদ্যপ্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করে ধর্মীয়া (ইসলামী) প্রভাব যেমন ঢোকানো শুরু করেছিল, এই জিয়াউর রহমানের আমলে তারই ধারাবাহিকতায় সংবিধানেই ‘বিসমিল্লাহ রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করা হল। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে ধর্মকে এইভাবে রাষ্ট্ৰীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত করার পরোক্ষ ফলাফলই হোল ধর্মীয় মৌলবাদীদের নৈতিক জয় ঘোষণা করা এবং তাদের উৎসাহিত করা।
আর এর পরে এরশাদের আমলে তো বামপন্থীরাও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে পরোক্ষভাবে উঠে পড়ে লেগে যায় মৌলবাদী জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্ৰতিষ্ঠাকে শক্তিশালী করতে। একইভাবে পশ্চিমবাংলাতেও বামপন্থীরা ১৯৮৫ সালে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের পর ত্রিশঙ্কু ফলাফলের সময় বিজেপি-র সমর্থন নিয়ে (অর্থাৎ তাদের সহযোগী বা বন্ধু হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে) পুরসভা গঠন করে। তবে বাংলাদেশের বামপন্থীদের সঙ্গে পশ্চিমবাংলার বামপন্থীদের একটি বড় তফাৎ হচ্ছে–এখানকার তথাকথিত বামপন্থীদের বিপুল অংশ আদৌ ধর্মমোহমুক্ত না হলেও,-প্রকাশ্যে বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকদের মত নির্বাচনী পোস্টারে (১৯৯১) ‘আল্লাহো আকবর’-এর সমগোত্রীয় (‘জয়শ্ৰীরাম’ কিংবা ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, কারণ তিনি সত্য’?) শ্লোগান কখনোই দেন নি। তাঁদের নেতার মৃত্যুতে পার্টি অফিসে ধর্মীয় শ্ৰাদ্ধানুষ্ঠান করার কথাও তারা ভাবতে পারেন না, যেমন বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টি অফিসে মিলাদ অনুষ্ঠানের কথা জানা আছে। এছাড়া অস্তুত বর্তমানে পশ্চিমবাংলার বামপন্থীরা বিজেপি-র মত হিন্দু মৌলবাদীদের থেকে শত হাত দূরে থাকার চেষ্টা করেন। যেমন ১৯৯৫-এ কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের পর, ১০ বছর আগেকার ঐ ত্রিশঙ্কু ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও তারা (এবং কংগ্রেসীরাও) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, আর যাই হোক নির্বাচিত দুই বিজেপি সদস্যার সমর্থন র্তারা পুরসভা গঠন করতে আদৌ গ্ৰহণ করবেন না। স্বস্তিকর ও সুস্থ এই ব্যাপারটির মধ্যে আন্তরিকতা কতটা, আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদ কতটা তার বিচার করা মুস্কিল,-বিশেষত যখন মুসলিম লীগ ও বিজেপিদের সঙ্গে তাদের রাতনৈতিক আঁততের পূর্ব ইতিহাস অজানা নয়।
ধর্মের সঙ্গে, ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন এবং ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে এই ধরনের সুবিধাবাদী আঁতীতের পেছনে নিছক সুবিধাবাদ ছাড়াও ধর্মের প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ, ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা, নিজেদের সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণীভিত্তি ইত্যাদিও কাজ করে।
ধর্মীয় মৌলবাদীদের এখানে এই একটি বড় সুবিধা। বামপন্থীদের স্রোতের বিরুদ্ধে হাঁটতে হয়, বহু শত বছরের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের জনবিরোধী চরিত্রটি উন্মোচিত করে বস্তুবাদী দর্শনকে তুলে ধরতে হয় এবং কোন অতিপ্রাকৃতিক ঐশ্বরিক শক্তির উপর নির্ভর করে নয়, মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আত্মনির্ভরতায় বলিষ্ঠ করতে হয়। একাজে এখনো সঙ্গী যেমন কম, তেমনি নিজেদের সহযোগী হিসেবে মনে করা ব্যক্তিদের মধ্যে দোদুল্যমানতাও বেশি। অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদীরা হাঁটে স্রোতের দিকেই। যে অলীক ঐশ্বরিক কল্পনা ও মায়াময় ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে রেখে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিত্তিহীন সাহসের সন্ধান করে, সেই কল্পনা ও বিশ্বাসকে আরো তীব্র হিংস্রভাবে সুসংহত করে মৌলবাদীরা। আর প্রচলিত এই স্রোতের গাড ধরে এগোেনর পথে তারা কখনো কখনো সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যায় বামপন্থী বা কম্যুনিষ্ট, গণতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত ও প্রচারিত এবং মৌলবাদের ছাপ্লামুক্ত মানুষদেরও,-মূলত তাদের অন্তর্নিহিত ধর্মবিশ্বাসের কারণে।
বামপন্থী বা কম্যুনিষ্টসহ এ ধরনের মানুষেরা নানা জটিল সময়ে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সাহায্য করলেও, কম্যুনিজমকে সামান্য সাহায্য করা দূরের কথা ধর্মীয় মৌলবাদীরা কিন্তু তীব্রভাবে এই কম্যুনিজমের বিরোধী। কি আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিস্টরা, কি হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদীরা সবার ক্ষেত্রেই এটি অন্যতম সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও ধর্মের অন্তঃসলিলা চোরাস্রোতের কারণে তারা অমৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত আবামপন্থীদের থেকে তো বটেই, এমনকি? বামপন্থীদের থেকেও বা তার আপাত শত্রুদের কাছ থেকেও সহযোগিতা আদায় করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
